মৃত্যুবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

সহজ কথার কথাশিল্পী

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৩, ১৮:১৯
এদেশের প্রায় সব লেখকই জীবনে একবার হলেও বাংলাদেশের উত্তাল সংগ্রামের সময় পর্বগুলোকে ফ্রেমবন্দি করতে সচেষ্ট থেকেছেন কলমের ফটোগ্রাফিতে। বায়ান্ন, ঊনসত্তুর কিংবা একাত্তর সালগুলো তাদের লেখার বিষয়বস্তু হিসেবে স্থান পেয়েছে ভিন্ন আঙ্গিক ও উপস্থাপনায়। তবে সবার ইতিহাসভিত্তিক লেখা সব ধরনের পাঠককে স্পর্শ করে না। ইতিহাস শুনে কিংবা পড়ে ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্যসৃষ্টি এক বিষয়, আর সেই সংঘটিত ইতিহাসের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে সাহিত্য রচনা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। হুমায়ূন আহমেদ ছেষট্টি, ঊনসত্তুর, সত্তর, একাত্তরের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। সংঘটিত ঘটনার তিনি নিজেরও ছিলেন একজন অন্যতম চরিত্র, এক অর্থে ইতিহাস। ফলে সেইসময় পর্বগুলো নিয়ে হুমায়ূনের যেকোনো লেখাই আমাদের কাছে এক গভীর মনোযোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেন হুমায়ূনের ইতিহাসভিত্তিক লেখাগুলোকে আমরা সবাই এত গুরুত্ব দিই? এর প্রধানতম কারণ লেখক নিজেই। তিনি গোটা বিশ্বসাহিত্যে সেই লেখক, যাঁর লেখাকে অনেকে আখাদ্য বলে ছুড়ে দিতে পারে, আবার প্রগাঢ় কৌতূহলে হাজার লেখকের ভিড়ে খুঁজে নেয় গভীর ভালোবাসায়। বাংলা ছোটগল্পের যে তরি রবীন্দ্রনাথের হাতে সচল হয়েছিল, বিগত প্রায় এক দেড়শ বছরে; সে তরির বাঁকবদল ঘটেছে অনেকের হাতে। কিন্তু বাংলা ছোটগল্পকে সম্পূর্ণ নতুন বন্দরে পৌঁছে দেন হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূনের গল্পের আঙ্গিক বাংলা সাহিত্যের আর কোনো গল্পকারের সাথে মেলে না বলেই তাঁর গল্প অসাধারণ। কী আছে তাঁর গল্পে, যার কারণে তাঁর গল্প সবার থেকে আলাদা? কোনো কোনো পণ্ডিত বলেন, হুমায়ূনের গল্পে তেমন কিছুই নেই, আছে শুধু নিটোল সারল্য। এই সারল্য রবীন্দ্রনাথের কাছে অধরা ছিল বলেই তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’। আর হুমায়ূন সবার মন জয় করেছেন সহজ কথা সহজভাবে বলতে পেরেই। তাই তো তিনি বিশেষ গোষ্ঠীর লেখক নন; বরং তিনি সবার লেখক। হুমায়ূন আহমেদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পগুলো এক কথায় ব্যতিক্রম। কি বক্তব্যের সারল্যে, কি বিষয়ের অভিনবত্বে, কি উপস্থাপন সৌকর্যে প্রায় সব দিক থেকেই তাঁর গল্পে থাকে ভিন্ন আস্বাদ। তাঁর যেসকল মুক্তিযুদ্ধের গল্প বিশেষভবে পরিচিত, তার মধ্যে অন্যতম হলো—উনিশ শ’ একাত্তর, অসুখ, জলিল সাহেবের পিটিশন, জনক, পাপ, শীত, শ্যামল ছায়া, নন্দিনী ইত্যাদি। ‘উনিশ শ’ একাত্তর’ গল্পটির নামকরণের মধ্য দিয়ে একাত্তর সালের দাহ আমাদের চেতনায় প্রতিভাসিত হয়। গল্পটি শুরুই হয়েছে এভাবে—‘তারা এসে পড়ল সন্ধ্যার আগে আগে। বিরাট একটা দল। মার্চ টার্চ কিছু না। এলোমেলোভাবে হেঁটে আসা। সম্ভবত, বহুদূর থেকে আসছে। ধূলিধূসরিত খাকি পোশাক’। সহজ-সরল এ বর্ণনা ভঙ্গিই মুহূর্তে পাঠককে গ্রাস করে এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতায়। পাঠক নিজের মনে এক ধরনের তাড়া অনুভব করে, কী ঘটাবে এই পাকিস্তানি বাহিনী নীলগঞ্জ নামের ছোট গ্রামটিতে? গ্রামের নারী-পুরুষ সকলে আশ্রয় নিয়েছে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে। পাঠককে হতাশ করে দিয়ে এই ইউনিটের মেজর ও তার দলের সদস্যরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে বিশ্রাম নিতে থাকে। এমন সময় তাদের সামনে গ্রামের বদি পাগলা হাজির হয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি করে। তার পরিচয় নিশ্চিত করে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে থাকা বাঙালি দোভাষী রফিকউদ্দীন। এ পর্যায়ে গল্পটির হাস্যরসের আবহ পাঠককে স্বস্তি দিতে থাকে। কিন্তু পরক্ষণেই পাকিস্তানি বাহিনীর সামনে গ্রামের সব থেকে ভীত ব্যক্তি আজিজ মাস্টারের উপস্থিতি মুহূর্তেই পাঠককে মনোযোগী করে তোলে। আজিজ মাস্টার এখানে প্রতিনিধিত্ব করে তত্কালীন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের। তাই গল্পেও দেখা যায়, শুধু বিনোদনের জন্য মেজরের নিদের্েশ আজিজ মাস্টারকে নগ্ন করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। কিন্তু বাঙালির দ্রোহ দাউদাউ করে জ্বলে লেখকের সত্তায়। তাই তো তিনি বাঙালির সাহস ও দ্রোহকে দেখালেন আজিজ মাস্টারের মধ্যদিয়ে এ গল্পের শেষাংশে। যুদ্ধ কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তার ভয়াবহ চিত্র হুমায়ূন দেখাতে সচেষ্ট হয়েছেন ‘পাপ’ গল্পে। যুদ্ধের ভয়াবহ হিংস্র রূপান্তরকে তিনি দেখিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের আলোয় অতি ছোট পরিসরে। যুদ্ধ যে মানুষের ভেতরের স্বভাবিক বুদ্ধি-বিবেচনাবোধের কবর রচনা করে, তারই আখ্যান মূলত গল্পটি। মুক্তিযুদ্ধ অর্থাত্ দেশ স্বাধীন করার অনুভূতি একজন মুক্তিযোদ্ধার কাছে স্বর্গ স্পর্শ করার মতো সাহস আর শৌর্যের জয়গান। সে-সঙ্গে জাতীয় চেতনার কাছে নিজস্ব অঙ্গীকার অমৃত সুধা পানের মতোই এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতাকে নিজের চেতনায় ধারণ করে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন ‘জনক’ গল্পটি। গল্পে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা মতি যুদ্ধের পর বিজয়ী হয়ে ফিরে আসে নিজের পরিবারে। মতি যুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সৌভাগ্যবান। সে যুদ্ধ শেষে ফিরে পায় নিজের স্ত্রীকে, সেই সাথে পায় তাঁর দুমাস বয়েসি পুত্র সন্তানকে, যার জন্ম যুদ্ধের অস্থিরতার মধ্যেই। তাই পুত্রের প্রতি মতির আবেগ অতি তীব্র। নিজের ছেলের মাঝে সে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র দেখে। রাতে যখন মতির শিশু সন্তান কেঁদে ওঠে তখন মতি সন্তান কোলে নিয়ে আদর করতে করতে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনায়। ‘... রাইফেল হাতে কাঁপতাছি আর দোয়া ইউনুস পড়তাছি তখন ডাইনপায়ে গুলি খাইলাম। আমার দুনিয়া আন্ধাইর হইয়া গেল। বুঝলি ব্যাটা, তখন মনু ভাই কী করল শুন, এই আমারে পিঠের মধ্যে নিয়া মনু ভাই পাক্কা তিন মাইল দৌড়াইল। আমার জীবন রক্ষা হইল। মনু ভাইয়ের ঋণ শোধ করতে পারি নাই। এর এক মাস পরে মুরাদখালী ফাইটে মনু ভাই মারা গেলেন। মনে হইলেই কইলজায় কামড়ায়। বুঝলিরে ব্যাটা, মনু ভাইয়ের নামে তোর নাম রাখছি মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন। নামের ইজ্জত রাখন চাই রে ব্যাটা। নামের ইজ্জত রাখন চাই।’ বলতে বলতে মতি মিয়ার চোখ জলে ভর্তি হয়ে আসে। সেই সাথে পাঠকের চোখেও গড়িয়ে পড়ে অশ্রুকণা। মুক্তিযোদ্ধা মতি তার সহযোদ্ধার প্রতি যে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে, তার সেই হূদয় নিঙড়ানো চেতনারই শিল্পিত প্রকাশ ‘জনক’ গল্পটি। হুমায়ূন আহমেদ শুধু মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাক্রম নিয়েই গল্প লিখেননি; বরং মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা পরবর্তীকালে বাঙালির জীবনে কোন ধরনের অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল, তারও স্বাক্ষর রেখেছেন গল্পে। যুদ্ধের ভয়াবহতা, প্রিয়জন হারানোর বেদনা একজন মায়ের মধ্যে যে ধরনের মনোবিকলন তৈরি করতে পারে, তার দুঃখবহ চিত্র বিধৃত হয়েছে ‘অসুখ’ গল্পে। হুমায়ূনের গল্পই প্রমাণ করে যুদ্ধ শেষ হলেই সব যন্ত্রণার অবসান হয় না। বরং প্রিয়জন হারানোর দাহ বহন করতে হয় আমৃত্যু। শুধু তা-ই নয় যুদ্ধে যারা শহিদ হয়েছে, তাদের অবর্তমানে একটি পরিবার কতটা অসহায়, নিঃস্ব ও সহায়সম্বলহীন হতে পারে, তারই বাস্তব চিত্র যেন ‘শীত’ গল্পটি। গল্পে মতি মিয়া একজন শহিদ মুক্তিযোদ্ধার পিতা। যে পিতা যুদ্ধশেষে স্বাধীন বাংলাদেশে বিধবা পুত্রবধু ও একমাত্র নাতিকে নিয়ে নিঃস্ব-রিক্ত জীবন যাপন করে। প্রচণ্ড শীতে ঠান্ডা ও খাবারের কষ্টে ভোগে বৃদ্ধ মতি মিয়া। তার মতো বৃদ্ধের জীবনে যুদ্ধে শহিদ পুত্রের উপস্থিতি কতটা জরুরি সে সম্পর্কে লেখক মতি মিয়ার প্রেক্ষণবিন্দু থেকে বলেছেন— ‘... মেছের আলি বেঁচে থাকলেও হত। একটা জোয়ান ছেলে আশেপাশে থাকলেও ঘরবাড়ি গরম থাকে। মতি মিয়ার বুক হুহু করতে থাকে। বুড়া বয়েসে আশেপাশে একটা জোয়ান ছেলে খুব দরকার।’ মতি মিয়ার এই আর্তি শুধু তার একলার নয়। এই আর্তি বাংলাদেশের অসংখ্য পিতামাতার। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরও যারা আজ তাদের হারানো সন্তানদের জন্য বুক ফাটা কান্নায় বাতাস ভারী করে তোলে। আর সরকার তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন করে সামান্য পরিমাণে গম কিংবা একটা কম্বল দানের মধ্য দিয়ে। যেমন এ গল্পে একজন শহিদ মুক্তিযোদ্ধার শেষ প্রাপ্তি পুত্রের জীবন উত্সর্গের বিনিময়ে একখানা কম্বল। যুদ্ধ শুধু প্রিয় মানুষকেই কেড়ে নেয় না। বরং যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতা একজন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার জীবনকে কীভাবে ধূসর ও স্বপ্নহীন করে তোলে, তারই জলছাপ যেন হুমায়ূনের ‘শ্যামল ছায়া’ গল্পটি। এ গল্পের ঘটনাংশ বিধৃত হয়েছে গল্পের নায়ক মজিদের মায়ের প্রেক্ষণবিন্দু থেকে। মজিদ ও তার বন্ধুরা যুদ্ধের আগে বামদলের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিল। যুদ্ধ এলে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবাই। যুদ্ধের পর মজিদ ফিরে আসে। কিন্তু মজিদের এভাবে ফিরে আসা মজিদের মায়ের বেদনাকে এক ভিন্ন অন্তর্দাহে উন্নীত করে, কারণ স্বপ্নভঙ্গ হয় মজিদের এবং সেই সাথে মজিদের মায়ের। মা ও পূত্রের অসুখী সত্তার বেদনাকে এ গল্পের শেষে লেখক দিয়েছেন ভিন্ন ব্যঞ্জনা। এবং সেইসাথে লেখক দেখিয়েছেন, যুদ্ধের নির্মোহ বাস্তবতা কীভাবে মানুষের স্বপ্নকে দীর্ঘশ্বাসে পরিণত করে। একই বাস্তবতার আর একটি দুঃখবহ গল্প ‘নন্দিনী’ গল্পটি। যেখানে একটি সুন্দরী হিন্দু মেয়েকে যুদ্ধের সময় বাধ্য হয়ে রাজাকারের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয় এবং সারাজীবন তার স্ত্রীর পরিচয়েই জীবন কাটাতে হয়। আজ যুদ্ধাপরাধীর বিচার হচ্ছে। কিন্তু সাহসাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা এত সহজ ছিল না—এই সত্য হুমায়ূন আহমেদ বুঝেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেই—এই বিশ্বাস তিনি কখনোই হারানটি। তাঁর এই চেতনার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ গল্প। এতে দেখা যায়, একজন পিতা মুক্তিযুদ্ধে শহিদ তার দুই সন্তানের হত্যার বিচার চেয়ে সরকারের কাছে পিটিশন দায়ের করে। তাদের হত্যার বিচার চায়। তার দৃঢ় এ দাবি সে ব্যক্ত করে গল্পকথকের কাছে—‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দশ লাখ ইহুদি মারা গিয়েছিল। সেই অপরাধের অপরাধীদের প্রত্যেকের বিচার করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। কিন্তু এদেশে ত্রিশ লক্ষ মানুষ মেরে অপরাধীরা কি পার পেয়ে গেল? কেন এ নিয়ে কেউ কথা বলছে না? ...আপনি কি মনে করছেন আমি ছেড়ে দেব? ছাড়ব না। আমার দুই ছেলে ফাইট দিয়েছে। আমিও দেব। মৃত্যু পর্যন্ত ফাইট দেব। দরকার হলে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের সিগনেচার জোগাড় করব...’ আজ হুমায়ূন আহমেদ নেই। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তিনি দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু তাঁর সৃষ্ট চরিত্র জলিল সাহেবের চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে শাহবাগ চত্বরে একত্রিত হয়েছে এদেশের মানুষ। যা ছিল নিছক গল্প। আজ গল্পের জলিল সাহেবের সেই দাবিই প্রতিটি বাঙালির দাবি হয়ে শাহবাগ চত্ব্বরে জমায়েত হয় এবং চিত্কার করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়। এভাবেই একজন লেখক শত বছরের সামনের ভবিষ্যত্ দেখতে পান। যেভাবে দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সেভাবেই ভবিষ্যতের জন্য স্বপ্ন দেখিয়েছেন আমাদের হুমায়ূন আহমেদ।