হুমায়ূন আহমেদ

নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৩, ১৮:২৭
কথায় কথায় বলছিলাম ক্রিকেট খেলার কথা। আমার বক্তব্য ছিল, কোনো কোনো সময় ক্রিজে টিকে থাকাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রান না পেলেও চলে। আপাতত টিকে যাওয়া নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। অনুষ্ঠানের শেষ দিকে হুমায়ূন ভাই তাঁর বক্তৃতায় ওই প্রসঙ্গটি উল্লেখ করলেন। স্পষ্ট বললেন, রান ছাড়া আমি একদিনও টিকে থাকতে চাই না। যদ্দিন আছি, ততদিন রান করে যাব। তিনি তাঁর কথা রেখেছেন। আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন—সেটা নিশ্চিন্তে বলা যায়। মরণব্যাধির ছোবলে ধুঁকতে ধুঁকতে যখন ক্ষয়ে আসছিল তাঁর জীবনীশক্তি, তখনো তাঁর কলম ছিল সক্রিয়, সচল মৃত্যুকে নিয়ে কৌতুক করতে পারে ক’জন? তাও আবার নিজের! তেমন বুকের পাটা আছে ক’জনারই বা? হাস্য-কৌতুক, রঙ্গ ব্যঙ্গ—তা যদি হয় নিজের মৃত্যুকে নিয়ে, সে তো আরও ভয়ঙ্কর। সেই বিরল দুঃসাহস হুমায়ূন আহমেদের মধ্যে ছিল। সেই দুঃসাহসের মাত্রা ও প্রখরতা কোনোমতেই মামুলি নয়। তাঁর ঘনিষ্ঠ স্বজনেরা, বন্ধুরা এই অধ্যায়টি সম্পর্কে কম বেশি জানেন। হুমায়ূন আহমেদের জীবনে, সৃষ্টিকর্মে মৃত্যুচিন্তা বড়ো একটি জায়গা দখল করে আছে। তাঁর মৃত্যুভাবনার সবটুকুই যে রচনাকর্মে প্রতিফলিত হয়েছে, এমনটা বলা যাবে না। হুমায়ূন আহমেদ যখন এলিফ্যান্ট রোডের অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন, সে সময়কার কথা মনে পড়ে। সেই বাড়িতে একটি কফিন ছিল তাঁর। বেশ দামি, বিদেশ থেকে আমদানি করা। বড়সড়ো সাইজ। লালচে বার্নিশের ডালা। ভেতরটা ধবধবে শাদা। খ্রিস্টানদের মরদেহ কফিনসমেত কবরস্থ করা হয়। হুমায়ূন ভাইয়ের কাছেই শুনেছি, ওই কফিনের ভেতরে তিনি মাঝে মাঝেই শুয়ে থাকতেন। বন্ধুদের তিনি এই কফিন দেখাতেন সাগ্রহে। এই অভিজ্ঞতা সবাইকে পুলকিত করত, এমনটা বলতে পারি না। কেউ কেউ নিশ্চয়ই ভয় পেতেন। ‘মরণ রে তুঁহুঁ মম শ্যামসমান’—বলে কফিনের ভেতর শায়িত হওয়ার ইচ্ছা সবারই জাগত না। মরমি কবি হাসন রাজার কথা অল্প-বিস্তর জানি। হাসন রাজার গানকে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল নন্দিত এই কথাশিল্পীর। হাসন রাজার বাড়িতে একবার এক বিদেশি ভদ্রলোক এসেছিলেন। সেই ভিনদেশি জানতে চেয়েছিলেন, তোমার বাড়ি কোনটা? হাসন রাজা ওই অতিথিকে নিয়ে গিয়েছিলেন বসতভিটার অদূরে। সেখানটায় হাসন রাজার কবর তৈরি করে রাখা হয়েছিল। আগাম প্রস্তুতি। হাসন রাজা বলেছিলেন, এই দ্যাখো এটাই আমার বাড়ি। আমরা দেখব অধ্যাত্মচিন্তা হুমায়ূন আহমেদকে আচ্ছন্ন করে ছিল বেশ ভালো রকমই। তাঁর কথাশিল্পে, নাটকে, গানে সেই ছাপ অতীব স্পষ্ট। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় তাঁর লেখা মর্মস্পর্শী সেই গানের কথা—‘ও কারিগর দয়ার সাগর ওগো দয়াময় / চান্নি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয়।’ জীবদ্দশায় স্বদেশে নিজের জন্মদিনের (২০১০ খ্রিস্টাব্দে) অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। তার পরের বছর চিকিত্সাধীন ছিলেন আমেরিকায়। লড়ছিলেন ক্যানসারের সঙ্গে। ঢাকায় অনুষ্ঠান হয়েছে যথারীতি। তবে লেখকের উপস্থিত থাকা সম্ভব হয়নি। ২০১০ সালের অনুষ্ঠানের একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করব এখানে। আমিও ছিলাম অল্পসংখ্যক বক্তার একজন। কথায় কথায় বলছিলাম ক্রিকেট খেলার কথা। আমার বক্তব্য ছিল, কোনো কোনো সময় ক্রিজে টিকে থাকাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রান না পেলেও চলে। আপাতত টিকে যাওয়া নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। অনুষ্ঠানের শেষ দিকে হুমায়ূন ভাই তাঁর বক্তৃতায় ওই প্রসঙ্গটি উল্লেখ করলেন। স্পষ্ট বললেন, রান ছাড়া আমি একদিনও টিকে থাকতে চাই না। যদ্দিন আছি, ততদিন রান করে যাব। তিনি তাঁর কথা রেখেছেন। আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন—সেটা নিশ্চিন্তে বলা যায়। মরণব্যাধির ছোবলে ধুঁকতে ধুঁকতে যখন ক্ষয়ে আসছিল তাঁর জীবনীশক্তি, তখনো তাঁর কলম ছিল সক্রিয়, সচল। আমেরিকায় রোগ নিরাময় প্রচেষ্টাকালীন তিনি রচনা করেছেন একাধিক গ্রন্থ। তিনি যা বিশ্বাস করতেন, তাই লিখতেন। কপটতা, ভণ্ডামি ছিল না তাঁর অভিধানে। হুমায়ূন আহমেদের জীবনের যে ইতিহাস, তাতে ৬৪ রান (৬৪ বছরের জীবন, বাংলাদেশিদের গড় আয়ুর চেয়ে এক বছরের কম)—বেশি কিছু না। তারপরও স্বর্ণপ্রসূ প্রতিটি বছর। ক্রিকেটে কোনো ব্যাটসম্যান গুরুতর আহত হলে, যখন তিনি দৌড়াতে পারেন না—তখন তাঁকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়। তিনি আউট হন না—তাকে বলা হয় রিটায়ার্ড হার্ট (Retired Hurt)। আমরা জননন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদকে বলতে পারি রিটায়ার্ড হার্ট। তাঁর শরীরী মৃত্যু ঘটেছে, একথা ঠিক। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর কাজ, স্বপ্ন, বিপুল সৃষ্টি সম্ভার। সুন্দর, গোছানো টেবিল থাকলেও তিনি লিখতে ভালোবাসেন মেঝেতে উপুড় হয়ে। কখনো ছোট টুলের ওপরে কাগজ রেখে, কখনো টুল ছাড়াই। সঙ্গে থাকে প্রচুর আঠা। সংশোধন যেখানে দরকার, শাদা কাগজ সেঁটে তার ওপর লেখেন নতুন করে। প্রতিদিন নিয়ম করে লিখতে বসেন না। মাঝে মাঝে যখন লেখার ইচ্ছে হয়, তখন লিখে যেতে পারেন অনর্গল। এই লেখকের নাম হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় কথাশিল্পী ও টিভি নাট্যকার। তাঁর পাঠক নানা বয়সের, তবে তরুণই অধিকাংশ। পাঠক সংখ্যা অনেক লেখকের জন্যই ঈর্ষণীয়। প্রকাশকরা হন্যে হয়ে ছোটেন তাঁর কাছে। তাঁর টিভি নাটক জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ’৯৩ সালে টিভি সিরিয়াল ‘কোথাও কেউ নেই’ দেশব্যাপী যে তোলপাড় তোলে, তা দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিটিভির ইতিহাসে নাটক নিয়ে দেশ কাঁপানো এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম। সহজ, সরল, ছোট বাক্যবিন্যাস, মানব মনস্তত্ত্বের জটিল সূক্ষ্ম দিক, মধ্যবিত্ত সমাজের হাসিকান্না, স্বপ্ন ও আবেগ দক্ষতা-নৈপুণ্যের সঙ্গে এই কথাশিল্পী ফুটিয়ে তুলতে পারেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ সাড়া জাগিয়েছিল পাঠকসমাজে। মূল্যবোধের শেকড় ধরে টান দিয়েছিল সাহসী সেই উপন্যাসটি। স্বভাবে লাজুক হলেও সূক্ষ্ম সহজাত শিল্পিত রসবোধ তাঁর লেখার অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য। জটিল ব্যাপারগুলো তিনি উপস্থাপন করতে সক্ষম অবলীলায়। তাঁর ভাষা তীব্রভাবে গতিশীল, স্বচ্ছন্দ-কাহিনি, ট্রিটমেন্টও আকর্ষণীয়। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, ভ্রমণ কাহিনি, রূপকথা, শিশুতোষ, কল্পবিজ্ঞান, আত্মজৈবনিক, কলাম, সাহিত্যের বহু শাখায় তাঁর বিচরণ ও সিদ্ধি। তাঁর জন্ম নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার শেখরবাড়িতে, মাতুলালয়ে। তারিখ ১৩ নভেম্তর ১৯৪৮। বাবার ছিল বদলির চাকরি। সুতরাং ছাত্র জীবন কেটেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। প্রাথমিক স্কুল জীবন কেটেছে সিলেটে। বগুড়া জেলা স্কুলের ছাত্র হুমায়ূন আহমেদ এসএসসি রাজশাহী বোর্ডে দ্বিতীয় হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। এইচএসসি পাস করেন স্টার মার্কসহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন রসায়নশাস্ত্রে। অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। এমএসসিতেও ফার্স্ট ক্লাস। পলিমার কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি করেছেন আমেরিকার নর্থ ডেকোটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করেছেন পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চও। হুমায়ূন আহমেদের বাবা ফয়েজুর রহমান আহমেদ ১৯৭১ সালে ছিলেন পিরোজপুরের এসডিপিও। ১৯৭১ সালের ৫ মে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে তিনি শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হুমায়ূন আহমেদ নিজেও নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে বেঁচে গিয়েছেন। ডিসেম্বরে ঢাকা ‘ফল’ করার আগে তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাক বাহিনী। তাঁর সহবন্দিদের পাক সৈন্যরা গুলি করে হত্যা করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রসায়ন বিভাগের তদানীন্তন চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দকার মোকাররম হোসেনের প্রচেষ্টায় তিনি সে সময় প্রাণে বেঁচে যান। মুক্তিযুদ্ধ তাঁর লেখায় বিভিন্নভাবে এসেছে। অবধারিত মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়ার কাহিনি লিখেছেন। বললেন, লোকে বিশ্বাস করতে চায় না। মনে করে, গল্প। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বড়ো ক্যানভাসের একটি উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। পটভূমি হবে মুক্তিযুদ্ধপর্ব। বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী বাংলাদেশ। এ নিয়ে পড়াশোনা চলছে। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম লেখা ছাপা হয় চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল ম্যাগাজিনে, ১৯৬৩ সালে। সেটা ছিল ছোটগল্প। লেখালেখির ভুবনে নিজে নিজেই প্রবেশ করেন, অন্য কারও কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে নয়। স্কুল ম্যাগাজিনে লেখকের ছবি ছাপা হতো। গল্প লেখার অন্যতম কারণ ছিল সেটাও। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকার সময় ছোট বোনের নামে পূর্বতন দৈনিক পাকিস্তানের মহিলা পাতায় কবিতা লেখেন। কবিতাটি উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’-এ ব্যবহূত। হুমায়ূন আহমেদ পেয়েছেন লেখক শিবির পুরস্কার, বাংলা একাডেমী পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, মধুসূদন সাহিত্য পুরস্কার, হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, লায়লা সামাদ স্মৃতি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার।