রাত্রিহর্ষক : অভিজ্ঞতার শিল্প

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৩, ১৮:২৭
রাত্রিহর্ষক রাহেল রাজিব প্রচ্ছদ :তৌহিন হাসান প্রকাশক :কথাপ্রকাশ, ঢাকা প্রকাশকাল : অমর একুশে বইমেলা ২০১৩ মূল্য: ১০০ টাকা। শিল্পের পরিভ্রমণ শিল্পীর নিজস্ব অভিজ্ঞতাজাত পূরক-সম্পূরক একটি প্রক্রিয়া। এতে মিশ্রিত যাবতীয় অনুভূতিশীলতা কবিতার অর্থকে মুক্ত করে দেয় নির্বিশেষ অবগাহনের জন্যই। রাহেল রাজিবের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ রাত্রিহর্ষক অভিজ্ঞতার আগাগোড়া নির্মাণ। রাত্রিহর্ষক-এর কবি একজন নিরন্তর কথক ও দর্শক যিনি দ্বৈতভাবে তাঁর প্রাত্যহিকতায় আচ্ছন্ন ঘরে ও বাইরে, অতীতে ও বর্তমানে, প্রেমে ও বিচ্ছেদে, আত্ম ও অপরে, কেন্দ্র ও পারিপার্শ্বিকতায়। কাব্যগ্রন্থটির কবিতাগুলো পাঠেই মনে হবে কবি দীর্ঘ এক অভিজ্ঞতা থেকে কবিতা লিখতে বসেছেন। ব্যক্তিগত বিভ্রমকে প্রকাশ করতে কোনো সংকোচ হচ্ছে না তাঁর ‘লোকমুখে বেশ কিছুদিন ধরেই শুনছি / আমার উচ্ছন্নে যাওয়ার গল্প’। অনুভব তাঁকে ভেতরে ভেতরে শাসন করেছে এবং রাত্রিহর্ষক সত্তায় সেই অনুভূতি আত্ম-উন্মোচন ও সমালোচনার চারিত্র্য পেয়ে যাচ্ছে। কবিতার বোধে নিজস্বতা দিয়েই শুরু হয় কাব্যগ্রন্থটি। রাহেল রাজিব মননে মধ্যবিত্ত তাই ‘মধ্যবিত্তের কাদা-জলে আটক আমার দায়’—এ কথায় স্বীকারোক্তি জানান এবং এই মধ্যবিত্ত মানস অনেককে জানবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে। সামপ্রতিক অভিজ্ঞতার পাশে ‘এপিটাফে অবনি’-র স্মৃতিও মধ্যবিত্তের জটিলতাকে জানায়। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘অবনি’ হয়ে যায় আত্মউন্মোচনের উপাদান। পাশাপাশি এ উন্মোচনে ইতিহাস বা ঐতিহ্যকেও দায়বদ্ধ অভিজ্ঞতায় নেন কুন্তী, মুনি, সীতাদের মাধ্যমে। দীর্ঘ মানস পরিভ্রমণে বাঙালির আলকাতরা খাওয়ার ফ্রি অভ্যাস, ঘৃণা ও বারুদের যন্ত্রকৌশল এবং মানসিকতার ঈর্ষা, মধ্যবিত্তের ওষুধের দোকানে কানাকানির লুকোচুরি সব লক্ষ করেন। রাহেল রাজিব আশ্চর্যভাবে বাস্তবতা দেখান দেশবিভাগ হয়েছে গত শতকের সাতচল্লিশে আর ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের দেশভাগ যেন এখনো বিদ্যমান মানচিত্রের পাশাপাশি রাজনীতি, কূটনীতি, বাণিজ্য ও শোষণের মানসিকতায়। তাই ‘ভানুমতি’ কবিতাটিতে ‘সময়ের কাঁটাতার দুটি ভূখন্ডের জ্যোত্স্না করে ভাগ’—এ সত্যকে স্পষ্টই স্পর্শ করে। পাঠক যখন পড়বেন ‘জল বলেছে জলের কথা/ জলকেই কাছে টানি/ স্রোতে আমি ভাসবো বলেই/ নীল আকাশকে জানি’— তখন পাল্টে যাওয়ার কথাই মনে হবে। ভাষা নান্দনিক হয়ে যাচ্ছে এবং জল, স্রোত, আকাশ এসব ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতায় বড় ভূমিকা রাখছে। বাহ্যিক অভিজ্ঞতা ও অন্তর্মুখী অভিজ্ঞতা দুইয়ে মিলে নতুন কবিতা ‘সাত পাকে বাঁধা’। রাহেল রাজিব অভিজ্ঞতা যেমন পরিবেশ থেকে নিয়েছেন তেমনি কবিতার বক্তব্যে নিজস্ব বোধজাত করে তাঁর বক্তব্য অন্যের মধ্যে দীর্ঘ চেতনায় রাখবার কিছু অবলোকনকে দেখান। যেমন- ‘কোনোও নারীই পর নয়/ কোনো মৃত্যুই নয় আপন’; ‘নিজেকে আড়াল করার অক্ষম বাসনা থাকে সবার মনে’; ‘জানি, পরিণত বিশ্রাম সতেজ করে পুরুষকে’; ‘ব-দ্বীপে ব-ফলা ব’য়ে বাংলাদেশ’; ‘ভাবি পাখির পালক যদি একবার জলে ভাসে/ তুলে নেব মর্গে’। দ্বন্দ্ব বা তুলনা প্রতিতুলনাতে ‘বাবা হয়ে যায় সাক্ষাত্ রাবণ’ আর ‘মা পরম লুকোবার আশ্রয়’ পাশাপাশি ‘জলে পড়েছিস বলেই কি ভুল করেছিস’- এভাবে জন্ম ও তার প্রবহমান সত্তায় এক ভুল থেকে অভ্যাস অনুযায়ী অন্য ভুলে যাওয়ার অবকাশকে বাইনারি হলেও মানতে হয় ভেতরের সত্যকে উপলব্ধির জন্য। রাহেল রাজিবের অভিজ্ঞতায় রাত্রিহর্ষক নানা অভিজ্ঞতার শিল্প। রাত্রিহর্ষক থেকে শেষ কবিতা ‘সাত পাকে বাধা’ পর্যন্ত সে অভিজ্ঞতার বিস্তৃতি। পাঠক রাহেল রাজিবের প্রবন্ধ ও গল্পসত্তার সঙ্গে পরিচিত এবং প্রথম কাব্য থেকে দ্বিতীয় কাব্যের পরিণত নতুন অভিজ্ঞতাকে কবিতার পাঠেই নিবিড়ভাবে পাবেন। বইটির উত্সর্গপত্র এবং প্রচ্ছদ পাঠকের নজর কাড়তে পারদর্শী ভূমিকা রাখবে।