চিনুয়া আচেবের গল্প

আকুউকে

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৩, ১৮:২৮
আকুউকে ও তার ভাইদের মধ্যে হঠাত্ তৈরি হওয়া বৈরিতার দেয়ালের একপাশে রোগশয্যায় শুয়ে আছে আকুউকে। ভাইদের বিড়বিড় কথা শুনছে আকুউকে, কিছুটা আতঙ্কিত। তারা এখনো বলেনি কী করা হবে, যদিও সে জানে। সে তাদের বলতে চেয়েছিল, তাকে যেন তার মায়ের বাবাব কাছে ইজিতে দিয়ে আসা হয়। আকস্মিকভাবে জন্মানো শত্রুতা এতই ব্যাপক ছিল যে, তাদের সাথে কথা বলতে তার আত্মসম্মানে লাগত। দেখা যাক তাদের স্পর্ধাটুকু। সবচেয়ে বড় অফোডিলে কথা বলতে চেয়েছিল, কিন্তু শুধু কান্নাভরা চোখে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করল না। সে কার জন্য কাঁদছে? চলে গিয়ে বরং গাঁজা খাক। এলোমেলো আধো ঘুম নিয়ে আকুউকে গেল তার নানার উঠোনে, ইজিতে; যেন অসুখের চিহ্ন নেই। সে আবারও গ্রামের সৌন্দর্য হয়ে উঠল। আকুউকে, মায়ের সবচেয়ে ছোট সন্তান এবং একমাত্র মেয়ে। ছয় ভাই রেখে তার বাবা যখন মারা যায়, তখন সে একদমই ছোট। পিতা বিত্তশালী হওয়াতে তাঁর মৃত্যুর পরও পরিবারের কাউকেই প্রকৃত অভাব-অনটন অনুভব করতে হয়নি, যেখানে ছেলেরা এরই মধ্যে নিজের খামার শুরু করেছে। আকুউকের মা বছরের কয়েকবার সন্তানদের নিয়ে উমৌফিয়া থেকে ইজিতে অত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যেতেন। তা সবচেয়ে ছোট সন্তানের হাঁটায় পুরো একদিনের পথ। আকুউকো কখনো মায়ের কোলে, কখনো পায়ে হাঁটত। সূর্য উঠলে মা রাস্তার পাশের খামারে জন্মানো কাসাভা গাছের ছোট ডাল দিয়ে মাথা ঢেকে দিত। আকুউকে এই-সেই ভ্রমণগুলোর প্রতীক্ষায় থাকত। তার নানা সাদা চুল-দাড়িসহ বিশালদেহী একজন মানুষ। কখনো বুড়ো তাঁর দাড়িকে দড়ির মতো বিনুনি পাকিয়ে রাখতেন। আর যখন তিনি তাড়ি পান করতেন, তখন সেই বিনুনি বেয়ে তাড়ি ফোঁটায় ফোঁটায় মাটিতে পড়ত। সেই দৃশ্য আকুউকে আনন্দ দেওয়া থেকে বিরত রাখত না। বৃদ্ধ এটি জানতেন বিধায় তিনি তাড়ির চুমুক দাঁত দিয়ে কড়মড় করে আনন্দ আরও বাড়িয়ে তুলতেন। তিনি তাঁর নাতনির খুবই প্রিয় ছিলেন। কারণ, অনেকের মতে, তিনি যেন তার নিজের মায়ের প্রতিচ্ছবি। তিনি কদাচিত্ আকুউকেকে নাম ধরে ডাকতেন; সবসময় মা ডাকতেন। তাঁর মতে, প্রকৃতপক্ষে আকুউকে হলো সেই বৃদ্ধা, যিনি জীবন-পরম্পরায় ফিরে এসেছেন। ইজিতে বেড়ানোর সময়, আকুউকে জানত, সে অন্যায় করেও পার পেয়ে যাবে। নানা সবসময় তার রক্ষাকবজ হিসেবে কাজ করতেন। দেয়ালের ওপাশের কণ্ঠস্বর ক্রমেই বাড়তে থাকল। সম্ভবত, প্রতিবেশীরা ভাইদেরকে প্রতিবাদ করছিলেন। সুতরাং, তারা এখন সবই জানে। গোল্লায় যাক সবাই। সে যদি উঠতে পারত, তাহলে তাদের বিছানার পাশে রাখা পুরোনো ঝাড়ু দিয়ে দৌড়াত। ইস, তার মা যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে এমন হতো না। দুই বছর আগে আকুউকের মা মারা যান। ইজিতে নিজ আত্মীয়দের সাথে তাঁকে সমাহিত করা হয়। জীবনে অনেক বিষাদ দেখা বৃদ্ধের আত্মজিজ্ঞাসা ‘তাঁরা কেন আমাকে একা রেখে আমার সন্তানদের নিয়ে যান।’ কিছুদিন পর যারা তাঁকে সান্তনা দিতে এল, তাদের তিনি বললেন, ‘আমরা হলাম বিধাতার মুরগির ছানা। তিনি খাওয়ার জন্য মাঝে মাঝে তরতাজা কমবয়সী ছানা পছন্দ করেন, মাঝে মাঝে বয়স্ক কোনোটিকে।’ এসব দৃশ্য আকুউকের কাছে খুবই স্পষ্ট ও উজ্জ্বল, সেগুলো মনে করে তাঁর কান্নাই চলে এল। এই বৃদ্ধ কী করতেন, যখন শুনতেন তিনি মারা গেছেন উদরফোলা রোগে। মায়ের মৃত্যুর পরপরই আকুউকের সমবয়সীরা শুকনো মৌসুমের তাদের প্রথম আসর-নাচ বের করল। আকুউকের নাচ এমনই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করল যে, তার পাণিপ্রার্থীর সংখ্যা দশগুণ বেড়ে যায়। এবং বিভিন্ন জায়গায় লোকেরা তার ভাইদের তাড়ি কিনে খাওয়াতে লাগল। কিন্তু আকুউকে সবাইকে প্রত্যাখ্যান করল। ভাইয়েরা চিন্তায় পড়ে গেল। তারা সবাই তাদের একমাত্র বোনকে ভালোবাসত, যেহেতু তাদের মা মারা গিয়েছেন। তারা বোনকে খুশি করার জন্য একে অপরের সাথে পাল্লা দিত। এখন তারা চিন্তিত। কারণ, সে ভালো বিয়ের সুযোগগুলোকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। তার বড় ভাই আফোডিলে, যতটুকু সম্ভব কঠোরভাবে বলল, অহংকারী মেয়েরা যারা সব পাণিপ্রার্থীকে ফিরিয়ে দেয়, তাদের কপালে দুঃখ আছে। এটি গল্পের সেই অনুউরোর মতোই, যে প্রত্যেক পুরুষকে ফিরিয়ে দিলেও তিনটি তরুণ সুদর্শন পুরুষের বেশধারী মাছের পেছনে ছুটেছিল, যেগুলো তার ধ্বংস চায়। আকেউকে কারও কথাই শুনল না। যার কারণে এখন সুদেবতা হতাশ হয়ে তার ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে, ফলে সে অসুস্থ হয়ে পড়ল। প্রথমে লোকেরা এমন ভান করল যে, উদররোগ নিয়ে তারা জানেই না। বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক কবিরাজ, বৈদ্য আনা হলো। কিন্তু তাদের সকল লতা-পাতাই ব্যর্থ প্রমাণিত হলো। একটি আফা দৈববাণীতে বলা হলো আঙুরলতায় ঘেরা একটি তালগাছের কথা। তিনি বললেন, গাছটিকে পেলে জড়ানো লাতা একটি ম্যাশেটি দিয়ে কেটে ফেলো। যে অশুভ শক্তি তোমার বোনকে আবদ্ধ রেখেছিল, সে তখন তাকে মুক্ত করে দেবে। উমৌফিয়া ও তার আশেপাশের গ্রাম তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো, তিন দিনের মাথায় তারা এ রকম একটা তালগাছ পেয়ে কাটল, কিন্তু বোনের মুক্তি ঘটল না। বরং পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গেল। সবশেষে পরামর্শ করে বিমর্ষ চিত্তে এই সিদ্ধান্তে এল যে আকুউকের পেটফোলো রোগ হয়েছে, যেটি এ অঞ্চলে দারুণ ঘৃণায় দেখা হয়। আকুউকে তার ভাইদের শলাপরামর্শের উদ্দেশ্য বুঝতে পারল। যখনই বড় ভাই জরা-ঘরে প্রবেশ করল, তখনই সে চেঁচাতে শুরু করল। বড় ভাই দৌড়ে বের হয়ে এল। এ রকম টানা সারা দিনই চলল। প্রকৃত ভয়ের কারণ হলো, এর ফলে সে যদি ঘরেই মারা যায়, তাহলে সেটি পুরো গ্রাম না হলেও পরিবারের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। প্রতিবেশীরা এসে ভাইদের সতর্ক করে গেল যে, তারা উমৌফির নয়টি গ্রামের জন্য গুরুতর বিপদ বয়ে আনছে। সন্ধ্যায় তাকে একটি দুর্গম ঘাসে ছাওয়া অরণ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হলো। একটি ক্ষণস্থায়ী ছাউনি তৈরি করে তাতে একটি খসখসে বিছানা তৈরি করা হলো। ক্লান্তি ও ঘৃণা নিয়ে সে নীরব থাকল। ভায়েরা তাকে ফেলে চলে গেল। সকালে তার তিনজন ভাই আবার দেখতে এল, সে বেঁচে আছে কি না। তারা অবাক হয়ে দেখল ছাউনিটি খালি। তারা দৌড়ে তাদের বাকি ভাইদের কাছে গেল এবং তারা সবাই একসাথে ফিরে খুঁজতে শুরু করল। কিন্তু তাদের বোনের কোনো চিহ্নই নেই। তাহলে অবশ্যই তাকে বন্য প্রাণীরা খেয়ে ফেলেছে—এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে এটা ঘটে থাকে। দুই কি তিন চাঁদের মাস চলে যাওয়ার পর তাদের নানা উমৌফিয়াতে একজন দূত পাঠাল আকুউকের মৃত্যুসংবাদ সত্য কি না সেটা নিশ্চিত হতে। ভাইদের হ্যাঁ-সূচক জবাব নিয়ে দূত ইজিতে ফিরে গেল। এক কি দুই সপ্তাহ পর বৃদ্ধ নানা ভাইদের দেখা করতে নির্দেশ পাঠালেন। তিনি তাঁর অবিতে অপেক্ষা করছিলেন যখন তাঁর নাতিরা এসে পৌঁছল। নীরব অভ্যর্থনার পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তাদের বোন কোথায়। সবচেয়ে বড় ভাই আকুউকের মৃত্যুর বর্ণনা দিল। ডান হাতের তালুর ওপর মাথা রেখে বৃদ্ধ শেষ পর্যন্ত শুনলেন । ‘তোমরা বলতে চাইছ আকুউকে মারা গেছে’, আধা জিজ্ঞাসা আধা বক্তব্য হিসেবে বললেন তিনি। ‘এবং তোমরা কেন আমাকে একটি খবর দিলে না?’ কোনো উত্তর নেই। বড়ভাই বলল, তারা পবিত্রকরণের সকল কৃত্য সম্পন্ন করতে চেয়েছিল। বুড়ো মানুষটির দাঁত কড়মড় করে উঠল। তিনি খুব কষ্ট করে আধখাড়া হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। খুড়িয়ে খুড়িয়ে চললেন তাঁর শোবার ঘরের দিকে। কাঠের খোদাই করা দরজা পেছনে ঠেলে দিলেন। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আকুউকের ভূত, হাসিহীন, কৃপাহীন। সবাই লাফ দিয়ে পেছনে সরে গেল, এক কি দুজন বাইরেই চলে গেল। ‘ফিরে এসো’ বৃদ্ধ করুণ হাসি দিয়ে বলল। ‘তোমরা কি জানো, এই নারী কে? আমি একটি জবাব চাই। এই অফুডিলে, তুমি সবার বড়, আমি চাই তুমিই বলো, সে কে?’ ‘সে আমদের বোন আকুউকে।’ ‘তোমাদের বোন আকুউকে? তুমি না এইমাত্র বললে, সে ফোলারোগে মারা গেছে? যে মারা গেল, সে এখানে কীভাবে।’ সবাই চুপ। ‘তোমরা যদি না-ই জানো ফোলারোগ কী, তাহলে কেন তাদের জিজ্ঞেস করোনি, যারা এ ব্যাপারে জানে।’ ‘আমরা উমৌফিয়া ও অবামের কবিরাজদের দেখিয়েছি।’ ‘তোমরা কেন এখানে আমার কাছে নিয়ে আসোনি?’ সবাই চুপ। বৃদ্ধ খুব অল্প কথায় তাদের বললেন যে, আকুউকে সেদিন থেকে ওনার মেয়ে এবং তার নাম রাখা হয়েছে মাটেফি। সে এখন ইজির কন্যা, উমৌফির নয়। তারা বস্ফািরিত চোখে তাকিয়ে থাকল। ‘যখন সে বিয়ে করবে’, বৃদ্ধ উপসংহার টানলেন, ‘তার দেন-মোহরানা আমার হবে, তোমাদের নয়। তোমরা তোমাদের পবিত্রকরণ কৃত্য চালিয়ে যেতে পারো, কারণ উমৌফিয়াতে আকুউকে সত্যিই মারা গেছে।’ ভাইদের প্রতি কোনো বিদায়সম্ভাষণ ছাড়াই মাটেফি তার নিজের ঘরে ফিরে গেল।