ভোটার তালিকা থেকেও বাদ পড়ছে যুদ্ধাপরাধীরা

ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্তরা নির্বাচনে অযোগ্য হচ্ছেন

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৩, ২৩:১৩
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) সাজাপ্রাপ্তদের নির্বাচনে অযোগ্য করতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ (আরপিও) এর সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধনের প্রস্তাব করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যদিও বিদ্যমান আইনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিতদের (ওয়ার ক্রাইম) নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সংশোধনীতে মানবতাবিরোধী যে কোন অপরাধকে ‘দি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) এ্যাক্ট, ১৯৭৩’ এর শাস্তির আওতায় আনার প্রস্তাব থাকছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ইসি কার্যালয়ে কমিশন সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এদিকে একাত্তরে বুদ্ধিজীবী নিধন, গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে আইন সংশোধনের প্রস্তাব করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। আরপিও সংশোধনের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাজাপ্রাপ্তদের নির্বাচনে অযোগ্য করে আরপিও সংশোধনীর প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। বর্তমান আরপিওতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিতদের (ওয়ার ক্রাইম) নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এখন এরসঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কথাও উল্লেখ করা হবে। এই টেকনিক্যাল বিষয়টির কারণে আরপিও সংশোধন করা হচ্ছে। তিনি আরো জানান, রায়ের কপি দেখার পরে জামায়াতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ইসি সচিবালয় সূত্রে জানায়, এর আগে আরপিও সংশোধনে ইসির প্রস্তাবে কিছু পর্যবেক্ষণ সহকারে আইন মন্ত্রণালয় থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল গত ২১ মে। এরপর কমিশন থেকে বলা হয়েছিল, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ থেকে বিরত থাকবে কমিশন। বিদ্যমান আইনেই অনুষ্ঠিত হবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু আবারও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে কমিশন আইন মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তাব পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। গত মাসেই এই প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও এতদিন তা ইসি সচিবালয়েই আটকে ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের রায়ের পরে আরপিও-র সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধনীর বিষয়টি কমিশনের নজরে আসে। কারণ মুজাহিদকে মানবতার বিরোধী অপরাধে দণ্ডিত করা হয়েছে। নির্বাচনে অযোগ্য হিসাবে বিদ্যমান আরপিও-র ১২ অনুচ্ছেদে (ও) উপ-ধারায় যুদ্ধাপরাধীর বিষয়ে উল্লেখ আছে, ‘হ্যাজ বিন কনভিক্টেট এ্যাজ এ ওয়ার ক্রিমিন্যাল বাই এ্যানি ন্যাশনাল অর ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অর ট্রাইব্যুনাল।’ অর্থাত্ যুদ্ধাপরাধী হিসাবে কোন দেশি বা আন্তর্জাতিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে এমন। তবে ইসির সংশোধনী প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আরপিও-র ১২ অনুচ্ছেদে (ও) উপ-ধারায় ‘এজ এ ওয়ার ক্রিমিন্যাল’ শব্দটির স্থলে ‘অফ এ্যানি ক্রাইম অর অফেন্স আনডার দ্যা দি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইবুন্যালস) অ্যাক্ট, ১৯৭৩’ প্রতিস্থাপিত হবে। অর্থাত্ যুদ্ধাপরাধী শব্দটির স্থলে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট-১৯৭৩-এর আওতায় যে কোন অপরাধ প্রতিস্থাপিত হবে। এই প্রস্তাবের ব্যাখ্যায় বলা হয়, ‘ওয়ার ক্রিমিনাল’ শব্দ দ্বারা আইসিটি অ্যাক্টের সকল অপরাধ বুঝায় না বিধায় উক্ত আইনের সকল অপরাধ অন্তর্ভুক্তকরণের লক্ষ্যে এই সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে। এই সংশোধনী প্রস্তাব পাস হলে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্তরা নির্বাচনে অযোগ্য হবেন। এমনকি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতের বর্তমান সংসদ সদস্য কক্সবাজার-২ থেকে নির্বাচিত এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদও আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ। হামিদুর রহমানকে সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধ ট্রইব্যুনাল থেকে ৩ মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি পলাতক রয়েছেন। জামায়াত নিয়ে সিদ্ধান্ত রায়ের কপি দেখে: ইসি প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ গতকাল বৃহস্পতিবার ইসি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালের রায় দেখে জামায়াতের নিবন্ধনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। রায়ের কপি হাতে পাওয়ার আগে কিছু বলা যাবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধকালীন জামায়াত আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে ‘ক্রিমিনাল দল’ হিসাবে উল্লেখ করে ট্রাইব্যুনাল। দেশের কোনো সংস্থার শীর্ষ পদে স্বাধীনতা বিরোধীদের থাকা উচিত নয় বলেও রায়ে মত দেয়া হয় এবং এ বিষয়ে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এর আগে ট্রাইব্যুনালের অন্য রায়গুলোতেও জামায়াতে ইসলামীর যুদ্ধাপরাধ সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উঠে আসে। গত ২১ জানুয়ারি জামায়াতের সাবেক রুকন আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী একাত্তরে ‘পাকিস্তান রক্ষার’ নামে ‘সশস্ত্র বাহিনী’ তৈরির মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতা করে। ভোটার তালিকা থেকেও বাদ পড়ছে যুদ্ধাপরাধীরা একাত্তরে বুদ্ধিজীবী নিধন, গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে আইনে সংশোধনের প্রস্তাব করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। বাদ পড়ছেন দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্তরাও। আইন সংশোধনের বিষয়টি কমিশনের বৈঠকে উত্থাপনের জন্য এরই মধ্যে যাবতীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। ভোটার তালিকা আইনের ১৩ ধারায় নাম কর্তনের বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। সেক্ষেত্রে এই ধারায়ই দালাল ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হবে।