টানা চারদিনের হরতালে দেশের ব্যবসা বাণিজ্যে ভয়াবহ ধস নেমেছে। সোমবার থেকে শুরু হওয়া এ হরতালের কারণে রপ্তানি বাণিজ্যের সাথে সংশ্লিষ্টরা বন্দরে তাদের পণ্য পাঠাতে পারেননি। এজন্য অনেক বিদেশি জাহাজ জায়গা খালি রেখেই চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগ করেছে। আবার দিনের বেলা দূরপাল্লার যানবাহন না চলার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারেও পণ্য পরিবহনে মারাত্মক বিঘ্নের সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস না হওয়ার কারণে উদ্যোক্তারা প্রতিদিন লোকসান গুনছেন। এছাড়া চারদিন হরতালের পর শুক্র ও শনিবার বন্ধ থাকায় অনেকের উত্পাদনও বন্ধ থাকবে। এজন্য মাস শেষে বেতন-ভাতাসহ ব্যাংকঋণ এবং অন্যান্য খরচ মেটাতে উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, হরতালের কারণে অনেক ব্যবসায়ীর আমদানি করা পণ্য পড়ে থাকে বন্দরে। আবার অনেকের রপ্তানি পণ্যের স্তূপ পড়ে আছে কারখানায়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কাঁচামাল আনতে না পারায় ঢাকা এবং এর আশপাশের কারখানাগুলোর উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। বন্দরে পণ্য খালাসে বিলম্ব হচ্ছে বলে বিদেশি জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে আসতে চাইছে না। গতকাল হরতালের পর যেসব ব্যবসায়ী দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে তাদের পণ্য ঢাকায় আনতে বা ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পাঠাতে চেয়েছেন তারাও হতাশ হয়ে পড়েছেন রাস্তার অবস্থা দেখে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের কারণে পণ্যবাহী ট্রাকের সারি আটকে গেছে পথেই।
ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, হরতালের কারণে দৈনিক সর্বোচ্চ ৬শ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে দেশের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা এবং শপিং মলগুলোর। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফেরাতে শুরু করেছে। এই খাতে ক্ষতির পরিমাণ দৈনিক ৩৬০ কোটি টাকা। আর অন্যান্য শিল্প-উত্পাদনে দৈনিক ক্ষতি শতকোটি টাকার বেশি।
অপরদিকে, সমুদ্রপথে যেসব পণ্য ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পৌঁছানোর কথা ছিলো সড়ক পরিবহন বন্ধ থাকায় অনেক উদ্যোক্তা সেগুলো পাঠাতে জাহাজের সময়সূচি ধরতে পারেননি। বাধ্য হয়ে রপ্তানিকারকরা আকাশ পথে পণ্য পাঠাচ্ছেন। রপ্তানিকারকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ১৫ থেকে ২০ গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে আকাশ পথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। গতকাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজের সামনে বিভিন্ন কার্টনের বড় বড় স্তূপ দেখা যায়। খোলা আকাশের নিচে এসব রাখা হয়েছে রপ্তানির জন্য। এছাড়া কার্গো ভিলেজের বাইরে আরো অন্তত আড়াইশ থেকে তিনশ কাভার্ড ভ্যান অপেক্ষা করছে পণ্য খালাসের জন্য।
বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদি বলেন, হরতাল আমাদের জন্য ক্যান্সারের মতো। হরতাল হলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়। তিনি জানান, তৈরি পোশাক শিল্পের সাথে অনেক লিংকেজ কারখানা আছে। অনেক খুচরা পণ্য একসাথে করে পোশাক প্রস্তুত করা হয়। হরতালের কারণে একটি পণ্য পাওয়া না গেলে উত্পাদন ব্যাহত হয়। এতে জাহাজীকরণের সময়সীমা ধরা যায় না। বিজিএমইএর সাবেক এ সভাপতি আরো বলেন, বড় বড় কারখানাগুলো কোনমতে এখনো পর্যন্ত সামাল দিয়েছে। কিন্তু ছোট এবং মাঝারি শিল্পগুলোর অবস্থা ভয়াবহ। ক্রেতারা একবার অর্ডার বাতিল করলে এসব কারখানা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়।
চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, যেসব বিদেশি জাহাজ আমদানি রপ্তানির পণ্য পরিবহনের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে আসে তার অনেকগুলোই গত চারদিনে খালি গেছে। হরতালের কারণে আমদানি করা পণ্য খালাস না করতে পারায় অলস সময় কাটিয়েছে অনেকে। কাউকে কাউকে জরিমানাও গুনতে হয়েছে।
