বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট সংক্ষেপে ‘বিএনএফ’ নামের নতুন একটি রাজনৈতিক সংগঠনকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে বিএনপি। নবগঠিত সংগঠনটির মূল নাম, সংক্ষিপ্ত নাম, লোগো ও দলীয় পতাকা হুবহু না হলেও দেখতে অনেকটাই বিএনপির কাছাকাছি বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলের নেতারা। এমনকি বিএনএফ তাদের গঠনতন্ত্রে জিয়াউর রহমানের ছবি ও তার ১৯ দফা কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত করেছে বলে তারা অভিযোগ তুলেছেন। বিরোধীদলের অভিযোগ আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিকে ভাঙার ষড়যন্ত্র হিসেবে এর সমান্তরালে বিএনএফ গঠনের চেষ্টা চলছে। বিএনএফকে নিবন্ধন দেয়া হলে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে আন্দোলন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিএনপি।
বিএনএফ-এর ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম। তিনি বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। ২০০৬ সালে বিএনপি ছেড়ে তিনি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের সঙ্গে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে (এলডিপি) যোগ দেন। পরে এলডিপির মহাসচিবও হন। গতবছর এলডিপি ছেড়ে বিএনএফ-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হন জাহানারা বেগম। আর সংগঠনটির প্রধান সমন্বয়কারী হিসেবে রয়েছেন আবুল কালাম আজাদ, যিনি একসময় বর্তমান ১৮ দলীয় জোট শরিক মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব ছিলেন। এছাড়া বিএনএফ-এর সদস্য সচিব হচ্ছেন আরিফ মইনুদ্দীন, তিনিও একসময় কল্যাণ পার্টিতে ছিলেন।
বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, বিএনএফ নামের সংগঠনটি তাদের নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে ‘গমের শীষ’ বরাদ্দ চাচ্ছে যা দেখতে প্রায় বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ‘ধানের শীষ’-এর মত। সারাদেশে এই সংগঠনের কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও তাদের নিবন্ধন দিতে নির্বাচন কমিশন সরকারের চক্রান্তের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেছে। বিএনপিকে নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে বিএনএফ নামের একটি ‘ভুঁইফোঁড়’ সংগঠনকে নিবন্ধন দিতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন উঠে পড়ে লেগেছে বলেও অভিযোগ করেন রিজভী।
বিএনপির অভিযোগ সম্পর্কে অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়, তারা দেশের সম্পদ। তাছাড়া বিএনএফ সম্পর্কে আমি তেমন কিছু জানিও না। এটা সৃষ্টি করেছেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা, তিনি উল্টাপাল্টা কথা বলেন দেখে পরে তাকে বাদ দেয়া হয়েছে। আর বিএনপি যেসব অভিযোগ করছে সেগুলোও সত্য নয়। তাদের কোনো কিছুর সঙ্গে আমাদের কিছুর মিল নেই।’
বিএনএফ-এর প্রধান সমন্বয়কারী আবুল কালাম আজাদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘গমের শীষ’ কেন, এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচনী প্রতীকের জন্য আমরা নির্বাচন কমিশনে আবেদনই করিনি। তারা (বিএনপি) তথ্য না জেনে রাজনীতি করছেন, তাদের এই রাজনীতি আর বেশিদিন টিকবে না।
রিজভীর অভিযোগ খণ্ডন করে বিএনএফ নেতা আবুল কালাম আজাদ বলেন, জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ২ মে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট গঠন করেন। তার ১৯-দফা কর্মসূচি ছিল ঐ ফ্রন্টের কর্মসূচি। যেহেতু জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাতা, সেই কারণে বিএনএফ তার ছবি ও ১৯-দফা কর্মসূচি ব্যবহার করছে। এক প্রশ্নের জবাবে আজাদ দাবি করেন, বিএনপির সঙ্গে বিএনএফ-এর লোগো, দলীয় পতাকা কিংবা কোনো কিছুর সঙ্গেই হুবহু মিল নেই, বিএনএফ-এর সবকিছুই স্বতন্ত্র।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ারের নেতৃত্বে দলটির একটি প্রতিনিধিদলও গত ১১ জুলাই নির্বাচন কমিশনে গিয়ে বিএনএফ-এর নিবন্ধনের বিষয়ে আপত্তি জানান। এম কে আনোয়ার বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে সবকিছু মিল রেখে বিএনএফ দেশের মানুষকে ধোঁকা দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে।
যেভাবে বিএনএফ-এর জন্ম
বিএনএফ নামটিকে সামনে নিয়ে আসেন বিএনপির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রাক্তন মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। বিএনপি থেকে পদত্যাগের পর ২০১২ সালের ১০ আগস্ট রাজধানীর হোটেল ইম্পেরিয়ালে এক ইফতার পার্টির মাধ্যমে এই সংগঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন তিনি। তখন ব্যারিস্টার হুদা জানিয়েছিলেন, তার সঙ্গে বিএনপির অনেকেই রয়েছেন, আগামী নির্বাচনে বিএনএফ তিনশ আসনেই প্রার্থী দেবে। তিনি সংগঠনটির আহ্বায়ক বলে ঘোষণা দেন, আর কো-আহ্বায়ক হন অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম। তবে মতবিরোধের কারণ গত ১০ মার্চ সংগঠন থেকে নাজমুল হুদাকে বহিষ্কার করা হয়। তার স্থলে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক হন অধ্যাপিকা জাহানারা। রাজধানীর ২৭/১১/২, তোপখানা রোডে বর্তমানে বিএনএফ-এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়।
আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘জিয়াউর রহমানই এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। পরে আমিসহ কয়েকজন মিলে ২০১১ সালের ৭ নভেম্বর সংগঠনটির পুনর্জন্ম দিই। অফিসিয়ালি এর কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয় ২০১২ সালের ২ মে। পরে ২০১২ সালের ১০ আগস্ট নাজমুল হুদা আমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।’
বিএনএফ-এর প্রধান কে?
বিএনএফ-এর প্রধান কে? এর উত্তর জানেন না খোদ অধ্যাপিকা জাহানারা বেগমও। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি পত্র-পত্রিকায় দেখি কখনো আমি চেয়ারম্যান, কখনো আমি ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক। আবার কখনো দেখছি আবুল কালাম আজাদ নিজেকে দলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। আসলে কে যে এ দলের কি, আমিও ঠিকভাবে জানি না।’
এর জবাবে আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘আমি দলের প্রধান সমন্বয়কারী, আমিই দলের প্রেসিডেন্ট, আবার দলের মুখপাত্রও আমি। জাহানারা বেগমকে আমরা ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক করেছি মাত্র।’
