ব্রিটেনে বাংলাদেশি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো বিপাকে

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৩, ২৩:১৭
বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বৈতনীতির কারণে যুক্তরাজ্যে এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলা স্থানীয় ব্যাংকগুলো বিপাকে পড়েছে। যুক্তরাজ্যে এক্সচেঞ্জ হাউজ খুলতে উত্সাহ দিলেও শেষ পর্যন্ত কোন রকম সহযোগিতাই করছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে, বিপুল অংকের বিনিয়োগ আটকা পড়েছে। একই সঙ্গে প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে রেমিটেন্স পাঠানোর বিষয়টিও নিরুত্সাহিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির জন্য রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়াতে ব্যাংকগুলোকে এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলার অনুমতি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান সবাইকে এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলার পরামর্শ দেন। সেই আলোকে ১৪টি ব্যাংক সেখানে এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলে। কিন্তু ব্যবসায়িক ঝুঁকি ও সাফল্য বিবেচনায় এনে বাংলাদেশের এসব এক্সচেঞ্জ হাউজের সঙ্গে ব্যবসা চালাতে পারবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয় বার্কলেস ব্যাংক। প্রসঙ্গত, ব্যাংকিং চ্যানেলে এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে রেমিটেন্স সেবা দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে হয়। এজন্য বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এক্সচেঞ্জ হাউজের অ্যাকাউন্ট রয়েছে বার্কলেস ব্যাংকে। বার্কলেস ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের ফলে এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বার্কলেস ব্যাংক বেশ আগে থেকেই রেমিটেন্সের ক্ষেত্রে সেবা দিয়ে আসছে। গত মে মাসে হঠাত্ করে এক্সচেঞ্জ হাউস রয়েছে এমন সব ব্যাংকে তারা চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়, ১০ জুলাই থেকে তারা আর এ ধরনের সেবা দেবে না। এরপর ওই ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট থাকা বাংলাদেশি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা দেশটিতে গিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালাতে থাকেন। নানা পর্যায়ে আলোচনার পরও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় তারা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি রুশনারা আলীর কাছে যান। তিনিও বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। কিন্তু কাজটি করার যথাযথ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই সমস্যার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কোন উদ্যোগই নিচ্ছে না। বরং এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোতে কর্মরতদের বেতন ও অফিস ভাড়ার অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়াও বন্ধ করে দিয়েছে। এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর বিনিয়োগ নিয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোন মাথাব্যথা নেই। বরং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বিকল্প ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যুক্তরাজ্যের যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিষয়টির সহজ সুরাহা হত। এদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠান সোনালী এক্সচেঞ্জ ইউকে’ও সেখানে কাজ করছে। উদ্ভূত সমস্যা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হলে সেখানে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোনালী এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে কাজ করার পরামর্শ দেন। পরে যোগাযোগ করা হলে সোনালী এক্সচেঞ্জ ইউকে থেকে বলা হয় সেটিও সম্ভব নয়। বরং সোনালী এক্সচেঞ্জে অ্যাকাউন্ট খোলার মাধ্যমে ব্যবসা করতে পারে অন্য এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো। কিন্তু এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো প্রতিটি আলাদা এবং স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। তারা এভাবে অন্য একটি স্থানীয় ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে ব্যবসা চালাতে পারে না। উপরন্তু তাদের সেখানে বিশাল বিনিয়োগ, স্থাপনা ও কর্মী বাহিনীও রয়েছে। সোনালী এক্সচেঞ্জ হাউজের কার্যক্রমও সেখানে প্রশ্নবিদ্ধ। এর আগে যুক্তরাজ্যের ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস অথরিটি (এফএসএ) সোনালী এক্সচেঞ্জের লাইসেন্স বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে তত্কালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান দেনদরবার করেই তা অব্যাহত রাখেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য থেকে রেমিটেন্স আহরণে ভাটা পড়বে বলে মনে করছেন খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, এ ধরনের সংকটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতে পারে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সে ধরনের কোন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশের ১৭টি ব্যাংকের যুক্তরাজ্যে এক্সচেঞ্জ হাউজ খোলার অনুমতি রয়েছে। বর্তমানে ১৩টি ব্যাংক এক্সচেঞ্জ হাউজ এবং সোনালী ব্যাংক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জানা যায়, যুক্তরাজ্য থেকে প্রবাসীরা ২০১১-১২ সালে রেমিটেন্স পাঠিয়েছিল ৯৮ কোটি ৭০ হাজার ডলার। আর গেল অর্থবছরের মে পর্যন্ত পাঠিয়েছে ৯১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের দিক দিয়ে শীর্ষ ৫ দেশের মধ্যে যুক্তরাজ্য অন্যতম। তাই এসব এক্সচেঞ্জ হাউজ বন্ধ হয়ে গেলে রেমিটেন্স পাঠাতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নানা বিপত্তিতে পড়তে হবে। এতে হুন্ডি উত্সাহিত হবে। রেমিটেন্স কমে যাবে। যেসব ব্যাংক এক্সচেঞ্জ হাউজ খুলে বিনিয়োগ করেছে, তাদের বিরাট অংকের অর্থ লোকসান গুনতে হবে। এদিকে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র ম. মাহফুজ বলেন, শুনেছি বার্কলেস ব্যাংক আগে যে ঘোষণা দিয়েছিল- সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে একমাস সময় বাড়িয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো বিকল্প উপায় খোঁজার চেষ্টা করছে। এছাড়া ওইদেশে নিয়োজিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতও বিষয়টা সমাধানের চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরই অপর একটি সূত্র জানায়, রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য যথাযথ ফোরাম নয়। রাষ্ট্রদূত বিষয়টি উত্থাপন করলেও তা সেখানে আমলে নেয়া হয়নি।