বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, টক-শো, সংসদ আলোচনা এবং দেশি-বিদেশি মিডিয়ার সংবাদে জিএসপি ইস্যু ঘুরেফিরেই আসছে। কারণ, গত ২৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেয়া অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা বা জিএসপি স্থগিত করেছে। কারা এবং কি কি বিষয় এ দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার জন্য দায়ী তা-ই খোঁজা হচ্ছে। অনেকের ধারণা, এর মধ্য দিয়ে জিএসপি পুনরুদ্ধারের উপায় বেরিয়ে আসবে। জিএসপি স্থগিতের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্লাস্টিক, সিরামিকস, চশমার লেন্স, শতরঞ্জি, খেলার সামগ্রীসহ কিছু পণ্য প্রায় শুল্কমুক্তভাবে রপ্তানি করার সুযোগ বাংলাদেশ আপাততঃ হারিয়েছে। এসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে বছরে ১-২ কোটি ডলার আয় হয়। এদিকে জিএসপি স্থগিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে যাবে বলে আশঙ্কা করা হলেও বাস্তবে এর উল্টোটাই ঘটতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে আমদানি বাড়াতে ক্রেতারা এখানকার পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে পাঁচ বছর মেয়াদী একটি কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ১৭টি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে প্রায় ১৫ কোটি ডলার ব্যয় করবে। তারা শ্রমিকের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তামূলক মানদণ্ড তৈরি, কারখানা পরিদর্শন ও মালিকদের সহায়তা করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জিএসপি স্থগিত করবে না বলে আগেই ঘোষণা দিয়েছে। তাদের ক্রেতাদের কনসোর্টিয়াম নয় মাস ধরে পোশাক কারখানাগুলো পরিদর্শন করবে। পরিদর্শনের রিপোর্টের ভিত্তিতে কারখানার নিরাপত্তা উন্নয়নে তহবিল গঠন করবে এবং তা বাস্তবায়ন করবে।
যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি বাতিল করবে এমন একটি খবর চাউর হচ্ছিলো অনেকদিন ধরেই। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি বাতিল না করলেও স্থগিত করেছে। বাংলাদেশ শ্রমিকদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়াকে স্থগিতের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। ঠিক এই বিষয়টিই খসড়া টিকফা’র একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। মনে হচ্ছে, ওবামা প্রশাসন ধরে নিয়েছিল টিকফা হলে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করা বা চাপ দেয়া যাবে এবং বাংলাদেশকে শ্রম আইন ও ইপিজেড আইন সংশোধনে রাজি করানো যাবে। তারপর ধীরে ধীরে সংশোধিত আইন বাস্তবায়নে বাধ্য করা যাবে। তাই তারা কয়েক বছর ধরে টিকফা করার জন্য ভীষণ আগ্রহ দেখিয়েছে। বাংলাদেশ তাদের সেই ইচ্ছাটি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। পারলেও তা পাত্তা দেয়নি। যখন দিয়েছে, যা টিকফা’র খসড়া মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ওবামা প্রশাসন তার আগেই কঠোর বিকল্প হিসেবে জিএসপি স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়। শোনা যায়, ওবামা প্রশাসন এত কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে চায়নি। কিন্তু টিকফা না হওয়ায় তাদের হাতে বিকল্প ছিল না।
ওবামা প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত আর তাদের ঘোর সমর্থক শ্রমিক ফেডারেশন আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার এন্ড কংগ্রেস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশন (এএফএল-সিআইও) এর জিএসপি বাতিলের দাবির সাথে একটি যোগসূত্র আছে। তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষা ও কর্মপরিবেশের নিরাপত্তাজনিত শর্ত পূরণে ব্যর্থতার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনে ২০০৭ সালে। যদিও তখন ২০০৫ সালের স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ভবন ধসে ৬৪ জন মারা যাওয়া ছাড়া আর কোনো বড় দুর্ঘটনার নজির ছিল না। তখন তাদের প্রধান দাবি ছিল গার্মেন্টস শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালও অভিমত দিয়েছে যে, জিএসপি বাতিলের মধ্য দিয়ে ওবামা প্রশাসন এএফএল-সিআইও এবং কংগ্রেসে তাদের সমমনাদের খুশী করেছে। পত্রিকাটি বলেছে, এর মধ্য দিয়ে এএফএল-সিআইও’র পশ্চাত্মুখী চিন্তা-চেতনাকে প্রশ্রয় দেয়া হলো।
জিএসপি স্থগিতের এখন পর্যন্ত যেসব কারণ পাওয়া গেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ রেখে শ্রম আইনকে যুগোপযোগী না করা, উত্পাদন ব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় আরও আন্তরিক হতে মালিকপক্ষকে বাধ্য করতে সরকারের দৃঢ়তার অভাব, মনিটরিং এর ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতা, উভয় দেশের মধ্যে সুসম্পর্কে ঘাটতি, অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা, টেক্সটাইল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্য রক্ষার জন্য ১৯৮০’র দশক থেকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর অব্যাহত চাপ, ওবামা প্রশাসনের ওপর এএফএল-সিআইও’র মাত্রাতিরিক্ত প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর মনোভাব অনুধাবনে বাংলাদেশের ওয়াশিংটন মিশনের ব্যর্থতা, পররাষ্ট্র বিষয়ক কর্তাব্যক্তিদের উদাসীনতা ও সমস্যার গভীরে যেতে অপারগতা, টিকফা’র ব্যাপারে চুক্তির খুঁটিনাটি পর্যালোচনা ও গবেষণার পরিবর্তে সময়ক্ষেপণের লক্ষ্যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি, তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর অপতত্পরতার ব্যাপারে তীক্ষ নজর না রাখা এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা না নেয়া এবং পশ্চিমা বিশ্বের আস্থাভাজন ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে অপরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হওয়া।
গত ৩০ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারপাসনের ওয়াশিংটন টাইমস-এ লেখা নিবন্ধও ওবামা প্রশাসনকে উত্সাহিত করতে পারে। নিবন্ধে তিনি বাংলাদেশকে দেয়া জিএসপি বাতিল করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আহ্বান জানান। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ এবং সরকারি লোকজনকে উন্নত বিশ্বে প্রবেশ করতে না দেয়ারও আহ্বান জানান। সরকার ও জনগণকে শায়েস্তা করার এ আহ্বান তিনি ভেবে-চিন্তে করেছেন এমনটা মনে করা কষ্টকর। তিনি নিবন্ধে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার যুক্তি হিসেবে শ্রমিক নেতা আমিনুল হত্যার প্রতিবাদে এএফএল-সিআইও’র বাংলাদেশকে দেয়া বাণিজ্য সুবিধা বন্ধ করে দেয়ার দাবিটি উল্লেখ করেন। শোনা যায়, এএফএল-সিআইও মার্কিন সিনেটের শুনানিতে এ নিবন্ধটিও একটি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এ আগুনে ঘি ঢেলেছে গত এপ্রিলে রানা প্লাজা ধস। যুক্তরাষ্ট্র যেসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জিএসপি স্থগিত করেছে তার সবই গার্মেন্টস খাতকে ঘিরে। অথচ এক দশক ধরেই তৈরি পোশাক খাত জিএসপি’র আওতার বাইরে। যদিও এই সুবিধা পাওয়া স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকা, ক্যারিবিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গার্মেন্টস খাতে জিএসপি সুবিধা দিচ্ছে।
জিএসপি দেয়ার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল দ্বিতীয় আংটাড সম্মেলনে, ১৯৬৮ সালে। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একতরফাভাবে এ সুবিধা দেয়ার লক্ষ্য হচ্ছে, দেশগুলোর (ক) রপ্তানি আয় বাড়ানো; (খ) শিল্পায়নের প্রসার ঘটানো; এবং (গ) প্রবৃদ্ধি বাড়ানো। ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলো ১৯৭১ সাল থেকে জিএসপি দেয়া শুরু করলেও যুক্তরাষ্ট্র এ সংক্রান্ত আইন করে ১৯৭৪ সালে এবং বাস্তবায়ন শুরু করে ১৯৭৬ সাল থেকে। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা চুক্তির নবম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত রপ্তানি সুবিধা পাওয়ার অধিকার আছে। নব্বইয়ের দশকের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের রপ্তানি-সামর্থ্য তেমন ছিল না। তাই চিংড়ী, ফিনিশড চামড়াসহ কয়েকটি পণ্য ছাড়া জিএসপি সুবিধা অব্যবহূতই থেকে গেছে। এসব পণ্যেও উন্নত দেশের মান বজায় রেখে রপ্তানি করার সামর্থ্য খুব কম ছিল। তাও জিএসপি দেয়ার ক্ষেত্রে শিশুশ্রম, শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, কর্মনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য বিষয়ে কঠিন শর্ত প্রতিপালন করতে হয়।
নব্বইয়ের দশক থেকে আসে তৈরি পোশাক খাত। এ খাতের জন্য কাপড়, সুতা, জিপার, প্যাকেজিং সামগ্রী ইত্যাদি আমদানি করে শুধু দর্জির কাজটা দেশে হতো। তাই গুণগত মান বিবেচনার তেমন বিষয় ছিল না। বাংলাদেশ জিএসপি’র আওতায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়াতে থাকে। এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র তৈরি পোশাক খাতে জিএসপি বন্ধ করে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা করেই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। এখন পর্যন্ত সেভাবেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
১৯৯৬ এর আওয়ামী লীগ সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বকে ভালই বশে রাখতে পেরেছিল। বিকাশমান গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতের ওপর তখন বড় বড় বাধা এসেছিল। বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগী সংস্থা আইএফসি বলেছিল বাংলাদেশে টেক্সটাইল শিল্প লাভজনক হবে না। তাই প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে কাপড় আমদানি করে এখানে দর্জির কাজটা করাই যুক্তিযুক্ত হবে। শিশুশ্রম বন্ধ না করলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমদানি বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়েছিল। ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে দেশীয় সুতা দিয়ে পোশাক তৈরি করা হয়েছে এমন মিথ্যা সার্টিফিকেট দেয়ার অপরাধে ইইউ জিএসপি সুবিধা স্থগিত করেছিল। জিএসপি পাওয়ার শর্তে পরিবর্তন আনা হয়েছিল যাতে দেশে টেক্সটাইল শিল্প গড়ে না ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র রপ্তানির ক্ষেত্রে কঠোর মানের শর্ত আরোপ করে। সবুজ উত্পাদন কৌশল প্রয়োগ এবং আইএসও মান প্রতিপালনের শর্ত আরোপ করে। বাংলাদেশ তখন সব বাধা কাটিয়ে রপ্তানির চাকাকে আরও বেগবান করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক আমদানির ক্ষেত্রে নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়ে যাচ্ছে ২০০৫ সাল থেকে বা তারও আগে ১৯৯৮ সাল থেকে। তখন মূল টার্গেট ছিল শ্রমমান নিয়ে। আর এখন শ্রমঅধিকার প্রধান ইস্যু।
নব্বইয়ের দশকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত দেশগুলো স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিশুশ্রম বন্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। তারা শ্রমিকদের অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপন, ঝুঁকিপূর্ণ উত্পাদন পদ্ধতি ইত্যাদি নিয়েও প্রশ্ন তোলে। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত ডব্লিউটিও’র প্রথম সম্মেলনে তারা শ্রমমানকে বাণিজ্যের সাথে যুক্ত করে নীতি প্রণয়নের প্রচেষ্টা চালায়। বাংলাদেশের নেতৃত্বে স্বল্পোন্নত দেশগুলো এর বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানালে তারা পিছু হটে। সিদ্ধান্ত হয় আগের মতো আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাই শ্রমমানের বিষয়টি দেখভাল করবে। কিন্তু বাস্তবে উন্নত দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র তা মানেনি। নতুন নতুন শর্ত আরোপ করতে থাকে দেশটি। এক পর্যায়ে বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ রপ্তানি আয় অর্জনকারী তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে জিএসপি বন্ধ করে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কখনই উষ্ণ ছিল না। ডেমোক্রেট বা রিপাবলিকান যেই দলের প্রেসিডেন্টই ক্ষমতায় থাকুক না কেন ফল একই হয়েছে। দেশেও আওয়ামী লীগ বা বিএনপি যেই ক্ষমতায় থেকেছে কেউই যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সাথে খুব বেশি ঘনিষ্ঠ হতে পারেনি। এর একটি বড় কারণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা। তখনকার রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানকে সর্বান্তকরণে সমর্থন দেয়। চীন-ভারত ও ভারত-পাকিস্তান বৈরী সম্পর্ক এবং ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন সুসর্ম্পকের কারণে শত্রুর শত্রু পাকিস্তান ও চীনকে বন্ধু হিসেবে জোটবদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র। মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে যুদ্ধে সহায়তা করতে সপ্তম নৌবহরও পাঠাতে উদ্যত হয়েছিল। ১৯৭১ সালের পর থেকেই বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে একটি অনাস্থা সৃষ্টি হয়। এটি আরও তীব্র হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করে যে, এতে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের হাত ছিল। তাই দুই দেশের সম্পর্কে অবিশ্বাস আরও তীব্র হয়। তখন থেকেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোড়াতালি দিয়ে চলছে।
বাস্তবতা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সম্পদশালী দেশ। দেশটির অর্থনীতির আকার বিশ্ব জিডিপি’র এক-চতুর্থাংশ। তাই তারা বিশ্বের মোড়ল হিসেবে সর্বত্র তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের তথ্যপ্রবাহে আঁঁড়ি পাতে। চীনা কোম্পানিগুলোর তথ্য হ্যাকিং করে। কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করতে পারে না। বরং এ প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছেন, নিরাপত্তার প্রশ্নে এ ধরনের গোয়েন্দাগিরির প্রয়োজন আছে। চীন যখন একই কাজ করেছে তখন যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য ফাঁস করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক স্নোডেন এখন স্টেটলেস পারসন। তাকে রাশিয়াও আশ্রয় দিতে ভয় পাচ্ছে। এটাই বাস্তবতা।
বাংলাদেশ তা বুঝতে পারেনি বা বুঝতে চায়নি। যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সাধারণ আবেগকে প্রশ্রয় দিয়েছে। আশার বিষয় হচ্ছে, সরকার গত সপ্তাহে শিল্প-কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের বিধান রেখে শ্রম আইন সংশোধন করেছে। কোনো কারখানায় চাকরির মেয়াদ নয় মাস হলেই সেই শ্রমিক সেখানে সুবিধাভোগী হিসেবে বিবেচিত হবে। শ্রমিকদের গ্রুপবীমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। উত্পাদন নিরাপত্তা নিশ্চিতে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী কারখানায় মেশিন স্থাপন নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সরকার ওবামা প্রশাসন ও এএফএল-সিআইও’র চাহিদা পূরণের কাজ শুরু করেছে। শ্রমিক অধিকার রক্ষা ও উত্পাদন নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার, উদ্যোক্তা ও ক্রেতা সম্মিলিতভাবে কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করলে বরফ গলা শুরু হতে পারে। তাই সকল পক্ষেরই আন্তরিকতা বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও অবনতি ঘটাতে পারে এমন নাজুক বিষয়গুলো পররাষ্ট্র দপ্তরকে খতিয়ে দেখতে হবে। জেদ না করে কূটনৈতিক তত্পরতা বাড়াতে হবে। অর্থনীতির স্বার্থেই দ্রুত সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে।
