পুরান ঢাকার বাহারি ইফতার

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৩, ২২:৪০
বাহারি ইফতারের শত শত বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে পুরান ঢাকা। ঐতিহাসিকদের মতে, মোগল আমল থেকেই ঢাকায় বাহারি ইফতারের প্রচলন ঘটে। কালক্রমে এর জৌলুস ছড়িয়ে পড়ে পুরো রাজধানীজুড়ে। বিশেষ করে বাহারি ইফতারের আলোচনা এলেই সবার আগে চলে আসে পুরান ঢাকার চকবাজার-এর কথা। যাতায়াত সুবিধার জন্য চকবাজার ছাপিয়ে এখন ইফতার বাজার ছড়িয়ে পড়েছে পুরান ঢাকার বিস্তৃত এলাকায়। বিশেষ করে বাংলাবাজার, সদরঘাট, নবাবপুর, বংশাল, সিদ্দিকবাজার, গুলিস্তান, কোর্ট-কাচারী এলাকা, ওয়ারী, লক্ষ্মীবাজার, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, আরমানিটোলা, সুরিটোলা, কাপ্তান বাজার, চানখাঁরপুল, আজিমপুর, টিপুসুলতান রোর্ড, ধোলাইখালসহ নানাস্থানে এখন বাহারি ইফতার পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে ইফতার বাজারে এ বছর শাহী ইফতার নিয়ে এসেছে ডিসেন্ট বেকারি, আনন্দ বেকারি, ইউসুফ বেকারি, রস, আল-রাজ্জাক, ঢাকা বিরিয়ানী হাউজ-এর মতো প্রতিষ্ঠান। এছাড়া মোগল ফুডস ইফতার বাজারে এনেছে নতুন বৈচিত্র্য। আল-রাজ্জাক হোটেল কর্তৃপক্ষ ইফতার বাজারে আস্ত খাসির রোস্ট উপহার দিচ্ছে রোজাদারদের। সব মিলিয়ে পুরান ঢাকার ইফতার বাজার এখন জমজমাট। দুপুর একটার পর পরই ইফতার বাজার বসছে রাস্তার ধারে। আছর নামাজের আগেই হাজার হাজার ক্রেতা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন ইফতার বাজারে। প্রতিদিন পুরান ঢাকার ইফতার বাজারে কোটি টাকার ইফতার সামগ্রী বিকিকিনি হচ্ছে বলে জানান মোগল ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. পিন্টু বাবুর্চি। তিনি বলেন, আস্ত খাসি থেকে মুরগির রোস্ট সবই মিলবে এখানে। তিনি গত বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা ৬ পর্যন্ত পৌনে দুই লাখ টাকার ইফতার বিক্রি করেছেন বলে জানান। চক বাজারে ৫ শতাধিক ইফতারির দোকান চকবাজারে গিয়ে দেখা যায়, দুপুর বারোটা থেকেই শাহী মসজিদের সামনের রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। রাস্তার মাঝখানেই সারি সারি দোকান। শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে ইফতারের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। এতো বেশি ইফতার সামগ্রী নিয়ে আর কোথাও বাজার বসে না। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চক বাজারের চারদিকে ৫ শতাধিক ইফতারির দোকান বসে। বাজার ঘুরে দেখা গেলো বিশাল শিকের সঙ্গে জড়ানো সুতি কাবাব, জালি কাবাব, শাকপুলি, টিকা কাবাব, ডিম চপ, কাচ্চি, তেহারি, মোরগ পোলাও, কবুতর ও কোয়েলের রোস্ট, খাসির রানের রোস্ট, দইবড়া, মোল্লার হালিম, নূরানি লাচ্ছি, পনির, বিভিন্ন ধরনের কাটলেট, পেস্তা বাদামের শরবত, লাবাং, ছানামাঠা, কিমা পরটা, ছোলা, মুড়ি, ঘুগনি, বেগুনি, আলুর চপ, জালি কাবাব, পিঁয়াজু, আধাকেজি থেকে ৫ কেজি ওজনের জাম্বো সাইজ শাহী জিলাপিসহ নানা পদের খাবার সাজিয়ে বসে পড়েছেন বিক্রেতারা। এছাড়া আতা-আনারস-বিলেতি গাব থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ফল, পিঠা-পায়েস, মিষ্টিসহ ইফতারের নানা সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে এ বাজারে। বড় বাপের পোলায় খায় ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙ্গায় ভইরা লইয়া যায়, ধনী-গরীব সবায় খায়, মজা পাইয়া লইয়া যায়’—এমন হাঁক-ডাক আর অচেনা নেই কারো কাছে। এমন ডাক শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী চক বাজারের রকমারি মুখরোচক ইফতারের পসরা। চকের ইফতার বাজারের একটি জনপ্রিয় আইটেম ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। যার হাত দিয়ে এ আইটেমটির উত্পত্তি তিনি হলেন পুরান ঢাকার বাসিন্দা দাতা মোহাম্মদ কামাল মাহমুদ। যিনি কামেল মিয়া নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি বরাবরই ছিলেন একজন ভোজনরসিক মানুষ। তিনি নানা ধরনের মুখরোচক খাবার তৈরি করতে জানতেন। ৭০ থেকে ৭৫ বছর আগে তিনিই প্রথম খাবারটি তৈরি করে এখানে বিক্রি শুরু করেন। বটপাতার ডালায় করে তিনি বিক্রি করতেন ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। বংশানুক্রমে তার ছেলে জানে আলম থেকে সালেকিন মিয়ার হাত পেরিয়ে এখন চলছে সেন্টু মিয়ার যুগ। সেন্টু মিয়া বলেন, ‘এটা পুরান ঢাকার ঐতিহ্য। তা ধরে রাখতেই আমরা চেষ্টা করছি। আমি এ কাজ করছি প্রায় ৩২ বছর ধরে। পাকিস্তান আমলে এর নাম ছিল—শিক চূড়ার ভর্তা। স্বাধীন বাংলাদেশে এর নাম হয়—বড় বাপের পোলায় খায়।’ তিনি বলেন, এটি তৈরিতে ডিম, গরুর মগজ, আলু, ঘি, কাঁচা ও শুকনা মরিচ, গরুর কলিজা, মুরগির মাংসের কুচি, মুরগির গিলা-কলিজা, সুতি কাবাব, মাংসের কিমা, চিড়া, ডাবলি, বুটের ডাল, মিষ্টি কুমড়াসহ ১৫ পদের খাবার আইটেম ও ২৪ ধরনের মসলা প্রয়োজন। একটি পিতলের বড় থালে সব কিছু দুই হাতে ভালোভাবে মাখিয়ে তারপর ঠোঙ্গায় করে বিক্রি করা হয়। সেন্টু বলেন, তিনি ছোট থাকতে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’-এর দাম ছিল প্রতি কেজি ৩২ টাকা। এ বছর দাম ধরা হয়েছে ৩৬০ টাকায়। গত বছর ছিল ৩০০ টাকা। বাজারে সবকিছুর দাম বেশি। তাই ইফতারির দামও বেশি। তবে এ পরিবার ছাড়াও অনেকে তৈরি করছে এখন ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। তেমনি একজন সেকেন্দার আলী (৭০)। তার ছেলে ও ভাইপোদের নিয়ে দুটি দোকানে বিক্রি শুরু করেছেন ইফতারি। তিনি বলেন, ছেলেরা এখন আর কষ্ট করতে চায় না। বৃদ্ধ বয়সেও ঐতিহ্যের টানে তিনি ছাড়তে পারছেন না এ কাজ। বাবুর্চি হাজী শহীদও এ পণ্যের একচেটিয়া ব্যবসায়ী বলে জানা গেছে। তার দোকান থেকে ভেসে আসছিল চিত্কার। দোকানিরা সুর করে বলছেন, ‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙ্গা ভইরা লইয়া যায়, ধনী-গরীব সবায় খায়, মজা পাইয়া নিয়া যায়’। তার দোকানের অবস্থান একেবারে শাহী মসজিদের সামনে। এখানেও প্রচণ্ড ভিড়। শখের বশে ক্রেতারা হুড়োহুড়ি করে কিনছেন। শহীদ বাবুর্চি জানান, ৪০ রকমের অধিক আইটেম এবং ৪২ প্রকার মসল্লা দিয়ে তৈরি হয় এ খাবার। দাম প্রতিকেজি ৩৬০ টাকা। কেবল এ আইটেমটির জন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা ছুটে যান চক বাজারে। এখনো পুরান ঢাকার এমন অনেক পরিবার আছে, যাদের এটি ছাড়া ইফতার যেন পূর্ণতা পায় না। নতুন ঢাকার বাসিন্দারাও দিন দিন এ খাবারটির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। প্রতিদিনের ভিড় দেখে বিক্রেতারা আশা করছেন, এবারো তাদের বেচাবিক্রি ভালোই হবে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, গত বছরের চেয়ে এবার ইফতার সামগ্রীর দাম বেশি। দোকান ঘুরে দেখা গেছে, সুতি কাবাব ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি, কবুতরের রোস্ট ১১০ থেকে ১৩০ টাকা, কোয়েলের রোস্ট ৬০ থেকে ৭০ টাকা, আস্ত মুরগির রোস্ট ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, খাসির রানের রোস্ট ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, শিক কাবাব ৩০ টাকা, কিমা পরটা প্রতিটি ২০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া এক কেজি ওজনের একেকটি শাহী জিলাপি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। দেড় কেজি ওজনের শাহী জিলাপির দাম ১৮০ টাকা, দইবড়া ২০০ টাকা কেজি, চিকেন কাটলেট ১৫০ টাকা এবং ১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে দুধ থেকে তৈরি পানীয় লাবাং। ফলের মধ্যে পেঁপে ও বাঙ্গি ১০০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি, দেশি আতা ৩০ থেকে ৫০ টাকা প্রতিটি, আনারস ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে চক বাজারে। এছাড়া শশা, ধনেপাতা, ছোলা, বুট, সিঙ্গারা, সমুচা, নিমকি, আলুর চপ, ঘুগনি, মুড়ি, চানাচুরসহ মিষ্টি জাতীয় বিভিন্ন মুখরোচক খাবার তো আছেই। চক বাজারের ইফতার বিক্রেতা মো. রমিজ উদ্দীন জানান, উত্তরাধিকার সূত্রে এ ব্যবসা করে আসছে তার পরিবার। তিনি নিজে চকবাজারে ইফতার বিক্রি করছেন ৩৫ বছর ধরে। অন্যবারের মতো এবারো ভালো বিক্রি হবে বলেই তার আশা। ঐতিহ্যবাহী ইফতার কিনতে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কেরানীগঞ্জ থেকে চক বাজারে আসেন মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, সত্যিই এখানকার ইফতার সামগ্রীর মধ্যে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ অন্য রকম। যে খায়নি সে বুঝবে না। ছোট ছেলেকে নিয়ে বাবুবাজার থেকে ইফতার কিনতে এসেছেন সাইফুল ইসলাম। ছেলের আবদার মেটাতে এক কেজি ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ কিনলেন ৭২০ টাকা দিয়ে। তিনি বলেন, এবার ইফতারের দাম বেশি। আবার বিক্রেতা কবীরের দাবি, অন্যান্য সামগ্রীর দাম বাড়ায় ইফতারের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুনতাসির মামুন ইত্তেফাককে বলেন, পুরান ঢাকা শত শত বছর ধরে ইফতারের জৌলুস ধরে রেখেছে। মূলত মোগল আমল থেকেই এখানে ঐতিহ্যবাহী ইফতারের প্রচলন শুরু।