‘ভিসি কেন্দ্রিক’ সংকটের ঘূর্ণাবর্ত থেকে মুক্ত হতে পারছে না জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনের পদত্যাগ দাবিতে শিক্ষক সমিতির চলমান আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও ক্লাস-পরীক্ষা অব্যাহত রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন একমাস যাবত্ অবরুদ্ধ। ফলে বিপাকে পড়েছেন প্রশাসনিক কাজে আসা শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টরা। বাতিল করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু সভাও। আবার এ আন্দোলনের যৌক্তিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। সংকট সমাধানে সবাই তাকিয়ে আছে সরকার আর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কি উদ্যোগ নেয় তার দিকে।
কেন আন্দোলন
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ব্যানারে চলমান আন্দোলনে শিক্ষকরা ভিসির বিরুদ্ধে বারোটি অভিযোগ এনে তার পদত্যাগ দাবি করেছেন। গত ১৯ জুন ভিসি অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে ২০ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি। তাদের অভিযোগগুলো হলো: ছাত্র-পুলিশ সংঘর্ষ ও শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় ক্যাম্পাসে ভাঙ্গচুরের নেপথ্য অপরাধীদের বিচার না করা, গণমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে মর্যাদাহানিকর বক্তব্য প্রদান, শিক্ষক সমিতির দাবির মুখে একবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে পুনরায় তা প্রত্যাহার, শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় প্রহসনের বিচার, শিক্ষকদের সম্পর্কে ‘অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ’ মন্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, অযোগ্য প্রার্থীকে পদোন্নতি দেয়ার প্রচেষ্টা, ভর্তি কার্যক্রমে অনিয়ম, একাডেমিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব না দেয়া, প্রক্টরিয়াল বডির সম্পূর্ণ পরিবর্তন না করা এবং সিন্ডিকেট সভায় নির্বাচিত সদস্যকে অপমানিত করা। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক অজিত কুমার মজুমদার বলেন, আনোয়ার হোসেন ভিসি পদে থাকবার নৈতিক অধিকার হারিয়েছেন।
অভিযোগের জবাব
এদিকে শিক্ষক সমিতির অভিযোগের জবাবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে জানানো হয়, শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনায় দায়ী ছাত্রকে শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া চিকিত্সা অবহেলায় ছাত্র মৃত্যুর অভিযোগে যে দু’জন শিক্ষকের গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তাদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে। প্রক্টরিয়াল বডি পুনর্গঠন করা হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষায় মানবিক বিবেচনায় দুজন ছাত্রকে ভর্তি করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার্থে বর্তমান প্রশাসন সর্বদা সচেষ্ট থেকেছে।
তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় আলোচনায় বসতে রাজি
সংকট নিরসনে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় আলোচনায় বসতে রাজি শিক্ষক সমিতি। এ ক্ষেত্রে তারা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা চ্যান্সেলরের মধ্যস্থতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভিসিদের সাথে এ বিষয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, শিক্ষক সমিতিকে আলোচনার জন্য বেশ কয়েকবার চিঠি দেয়া হলেও তারা কোন সাড়া দেননি।
শিক্ষকরা বিভক্ত
এদিকে ভিসির পদত্যাগ দাবিতে শিক্ষকদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় ভিসির পদত্যাগ বিষয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন সাধারণ শিক্ষক পর্ষদের ব্যানারে শিক্ষকদের একটি অংশ। ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক আহমেদ রেজা এ অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার স্বাক্ষর করা এক বিবৃতিতে জানানো হয় ভিসিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা অত্যন্ত অযৌক্তিক ও অশোভন বলে তারা এ ধরনের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। প্রশাসনিক ভবন অবরুদ্ধ রাখার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করার বিরোধিতা এবং একইসঙ্গে বিগত ১০ বছরের প্রশাসনিক এবং অর্থনৈতিক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য চ্যান্সেলরের নিকট অনুরোধ জানানো হয় বিবৃতিতে। এ বিষয়টিকে আবার শিক্ষকদের চলমান আন্দোলন বানচালের একটি কৌশল বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী ও প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের নেতা সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আমির হোসেন। তিনি বলেন, সুবিধাভোগী কিছু ব্যক্তিকে দিয়ে শিক্ষকদের একটি অংশ দাঁড় করানো হয়েছে। তবে এটা আমাদের আন্দোলনে কোন প্রভাব ফেলবে না। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে সাধারণ শিক্ষক পর্যদের অন্যতম নেতা ও সাবেক প্রক্টর ড.সোহেল আহমেদ বলেন, এ আন্দোলনের নৈতিক কোন যৌক্তিকতা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষার জন্য একজন ভিসির চলে যাওয়া কোন সমাধান নয়। বরং সমস্যা যেগুলো আছে তার সমাধান করতে হবে।
প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির
গত ২০ জুন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করে পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছে শিক্ষক সমিতি। এতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে প্রশাসনিক কার্যক্রম। বাতিল করতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সভাও। গত ২০ জুনের নির্ধারিত সিন্ডিকেট সভা, ২১ জুনের বার্ষিক সিনেট অধিবেশন সভা বাতিল করা হয় শিক্ষকদের অবরোধ কর্মসূচির কারণে। এছাড়া নিয়মিত একাডেমিক কাউন্সিলের সভা না হওয়ায় এমফিল, পিএইচডির ভর্তি আটকে আছে।
সংকট নিরসনে করণীয়
আন্দোলন করে বর্তমান সংকট নিরসন সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্টজনেরা। এক্ষেত্রে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে এটা একটা ভাল দিক। কিন্তু শিক্ষক সমিতির উচিত হবে আলোচনার মাধ্যমে এ সংকট নিরসন করা। সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইন বলেন,শিক্ষক সমিতির যে দাবিগুলো রয়েছে তার জন্য দুই মাস ক্লাস বন্ধ রাখার কোন দরকার হয় না। আলোচনার মাধ্যমে এ সংকট নিরসন সম্ভব। আবার ভিসিকে মিডিয়াতে কথা বলার সময় অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, এ আন্দোলনের পেছনে যৌক্তিক কোন কারণ নেই। প্রশাসনিক ভবন অবরোধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। আমি মনে করি শিক্ষক সমিতির বোধোদয় হবে এবং এই বেআইনি অবরোধ তারা তুলে নেবেন।
