আজ ১০ রমজান। রহমতের দশকের শেষ দিন। আগামীকাল থেকে শুরু হবে মাগফিরাতের দশক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সবসময় বান্দার প্রতি করুণাসিক্ত। কিন্তু রহমতের দশদিনে রোজাদার বান্দাদের প্রতি তাঁর রহমতের দৃষ্টি দেন। আর সকল সময় তিনি বান্দার গুনাহ মাফ করলেও মাগফেরাতের দশকে তাঁর ক্ষমা অবারিতভাবে দুনিয়াবাসীর প্রতি বর্ষিত হয়। এই রমজানে জামায়াতবদ্ধভাবে তারাবীহের নামাজ আদায়কারী নিষ্পাপরূপে পরিগণিত হন। যেমন-রসূল (স.) বলেছেন, এই পবিত্র মোবারক মাসে যে ব্যক্তি ঈমান অবস্থায় সওয়াবের আশায় রাত জেগে তারাবীহের নামাজ আদায় করে তাঁর অতীত সকল গোনাহ মাফ হয়ে যায় (বুখারী ও মুসলিম)।
আয়শা (রা.) বলেন, এক রাতে রসূলুল্লাহ (স.) আমাকে আমার হুজরার দরজায় একটি চাটাই বা পর্দা টাঙ্গিয়ে দিতে বললেন, আমি তাই করলাম। অতঃপর রসূলুল্লাহ (স.) এশার নামাজ পড়ার পর ঘর থেকে বের হলেন। যারা মসজিদে ছিলেন তারা তার কাছে একত্রিত হলো। ফলে তিনি তাদেরকে নিয়ে দীর্ঘ রাত পর্যন্ত (তারাবীহর) নামাজ পড়লেন (মুসনাদে আহমাদ ৫ খণ্ড, ৭-৮ পৃঃ)।
আয়শা (রা.) বলেন, রসূলুল্লাহ (স.) একদা রমজানে অর্ধেক রাতে বের হলেন, অতঃপর মসজিদে নববীতে সালাত পড়লেন এবং কিছু লোকও তাঁর সাথে নামাজ পড়লেন। অতঃপর সকালে তারা আলোচনা করায় দ্বিতীয় রাতে আরো লোক একত্রিত হলো। ফলে তিনি নামাজ পড়লেন। সমবেত সাহাবীরাও তাঁর সাথে নামাজ পড়লেন। অতঃপর সকাল বেলায় আলোচনা হওয়ায় তৃতীয় রাতে আরো বেশী লোক একত্রিত হলো। তাই রসূলুল্লাহ (স.) ঘর থেকে বের হলেন এবং সবাইকে নিয়ে নামাজ পড়লেন। তারপর চতুর্থ রাতে এতো লোক জড়ো হলো যে, মসজিদে জায়গা হলো না। ফলে রসূলুল্লাহ (স.) রাতে ঘর থেকে বের না হয়ে ফজরের সময় বের হলেন এবং ফজরের নামাজ পড়ে বললেন, তোমাদের রাতের অবস্থা আমার অজানা ছিল না। কিন্তু আমি ভয় পেলাম যে, (তারাবীহের) নামাজ যদি তোমাদের ওপর ফরজ হয়ে যায় তখন তোমরা যদি তা আদায় করতে অক্ষম হয়ে পড়। অতঃপর রসূলুল্লাহ (স.) এর মৃত্যু পর্যন্ত ঐরূপ চলতে থাকে (বুখারী ১ম খণ্ড ২৬৯ পৃঃ)।
আবদুর রহমান ইবনে ক্বারী (রা.) বলেন, একদা (১৪ হিজরীর রমজান মাসের রাতে) আমি ওমর ইবনে খাত্তাবের (রা.) সাথে মসজিদে (নববীতে) গেলাম। অতঃপর মুসল্লিদের বিক্ষিপ্তভাবে দেখলাম। কেউ একা নামাজ পড়ছে, কারো সাথে জামায়াত করছে। এ বিশৃঙ্খল ভাব দেখে ওমর (রা.) বললেন, আমি যদি সবাইকে এক ক্বারী ইমামের পেছনে জমায়েত করে দেই তাহলে খুব সুন্দর হয়।
তারপর তিনি দৃঢ় পদক্ষেপ নিলেন এবং সবাইকে ওবায় ইবনে কা’ব (রা.)-এর পেছনে জামায়াত করালেন। পরের রাতে তিনি আবার মসজিদে এলেন এবং সাবইকে এক ক্বারী ইমামের পিছনে জামায়াতে সালাত পড়তে দেখে বললেন, কী সুন্দর নতুন নিয়মটি! তখন থেকে জামায়াত সহকারে প্রথম রাতে তারাবীহ পড়া শুরু হয় (বুখারী, মেশকাত ১৫৫ পৃঃ)।
উক্ত সমস্ত বর্ণনায় প্রমাণিত হয় যে, তিন খোলাফায়ে রাশেদীন ও অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরামের ঐকমত্যে পুরা মাস রমজানে জামায়াতে তারাবীহ পড়া সুন্নাত। কারণ নবীর ইন্তেকাল ও আবু বকর (রা.)-এর মৃত্যুর পরও ওমর (রা.) যখন খলীফা হন তখন তারাবীহ ফরজ হবার আশংকা না থাকায় তিনি ১৪ হিজরীতে ছোট ছোট তারাবীহর জামায়াতগুলোকে একটি বিরাট জামায়াতে পরিণত করেন (আওনুল বারী, ৪র্থ খণ্ড ৩৬ ৯পৃঃ)। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত সারা জাহানে এ নিয়মই চলে আসছে।
সুতরাং আত্মশুদ্ধি, পারস্পরিক সহানুভূতি ও সহমর্মিতার সঙ্গে এই পবিত্র ‘শাহরুন আজীম’ বা সুমহান মাসে নিজকে পাপ মুক্ত করার লক্ষ্যে আমরা সাধনা করে যাই। সাথে সাথে রমজানের শেষ পর্যন্ত জামায়াতে তারাবীহর নামাজ আদায় করে জীবনের পূর্বের গুনাহ থেকে পরিত্রাণ লাভ করি। তাছাড়া অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগীর প্রতিও যত্নবান হই। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দান করুন, আমীন।
ই-মেইল ঃ [email protected]
