খুলনার লাখোহাটি গ্রামের ঘরে ঘরে লাখোপতি

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০১৩, ২২:৪৩
খুলনা মহানগরীর উত্তর দিকে ভৈরব নদী পার হলেই দিঘলিয়া উপজেলা। এ উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রাম লাখোহাটি। লাখোহাটি গ্রামের অধিকাংশ মানুষই একসময় খুবই দারিদ্র্য ছিলো। অভাব আর অনটনে দিন কাটতো তাদের। কিন্তু এখন অভাব শব্দটি ভুলে গেছে লাখোহাটি গ্রামের মানুষ। সাদা মাছের পোনা বদলে দিয়েছে তাদের জীবনযাত্রা। লাখোহাটি গ্রামের ঘরে ঘরে এখন লাখোপতি। বছরে এই গ্রামে একশ’ কোটি টাকারও বেশি সাদা মাছের পোনা উত্পাদিত হচ্ছে। ব্যাংক ঋণ ও মত্স্য অধিদপ্তরের পরামর্শ ছাড়াই গ্রামের ক্ষুদে ব্যবসায়ীরা এ সাফল্য অর্জন করেছেন। লাখোহাটি গ্রামে নারী-পুরুষ মিলে নয় হাজার মানুষের বসবাস। তার মধ্যে পাঁচ হাজারের মত নারী-পুরুষ সাদা মাছের পোনা উত্পাদন ও পরিচর্যা কাজে জড়িয়ে আছেন। তারা একে মাছের ব্যবসা বলেন। উত্পাদনের সঙ্গে সঙ্গে মাছের খাবার বিক্রি ও পোনা পরিবহনও এই ব্যবসার অংশ। নভেম্বর থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে এ ব্যবসা। পাকিস্তান আমলেই এখানে সাদা মাছের পোনা নার্সিংয়ের ব্যবসা শুরু হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ব্যবসা আরো বিস্তৃতি লাভ করে। এ গ্রাম থেকে নড়াইল, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালি, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাদা মাছের পোনা সরবরাহ করা হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, নভেম্বরের শেষ থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এ ব্যবসার মৌসুম। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ট্রাক ভর্তি পোনা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রির জন্য পাঠানো হয়। তবে হরতালের কারণে পোনা পরিবহনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। তখন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পোনা পাঠানো সম্ভব হয় না। পোনা ব্যবসায়ী গোলাম শেখ জানান, খুলনার শিরোমনি, ফুলতলা ও যশোরের হ্যাচারী থেকে কার্প জাতীয় মাছের পোনা কেনেন তিনি। এক একরের বেশি জমির পুকুরে দেড় লাখ টাকা খরচে ২০ মণ পোনা নার্সিং করেন। ছয় মাস পর পুকুর থেকে তিনি একশ’ মণ পোনা বিক্রি করেন পাঁচ লাখ টাকায়। তিনি বলেন, পোনা যদি ব্যাকটেরিয়ার কবলে না পড়ত তবে লাভের পরিমাণ আরো বাড়ত। পোনা পরিচর্যা ও উত্পাদনে মত্স্য অধিদপ্তরের কাছে তেমন সহায়তা পাওয়া যায় না। তাছাড়া উপজেলার একমাত্র ফেরিটি (নগর ঘাট) সার্বক্ষণিক সচল রাখার দাবি তোলেন এই ব্যবসায়ী। আরেক ব্যবসায়ী মুরাদ হোসেন বাবু জানান, নিজের মালিকানাধীন চারটি ও লিজ নেয়া তিনটি পুকুরে তিনি পোনার ব্যবসা করেন। বছরে পোনা বিক্রি করে তার প্রায় ৩০ লাখ টাকা আয় হয়। পোনা পরিবহন গাড়ি হরতালমুক্ত করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি রাখেন। তার মতে, সরকারি উদ্যোগে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এ ব্যবসা আরও প্রসার লাভ করবে। বারাকপুর ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শেখ কামরুল ইসলামও একজন পোনা ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, এই গ্রামের বৃহত্ জনগোষ্ঠী ও পার্শ্ববর্তী কামারগাতি গ্রামের ২৫ ভাগ মানুষ পোনা ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। লাখোহাটি গ্রামে অর্ধ শতাধিক বড় এবং প্রায় দুইশ’ মাঝারি শ্রেণীর ব্যবসায়ী রয়েছে। মাঝারি ব্যবসায়ীরা বছরে ৩০-৩৫ লাখ এবং বড় ব্যবসায়ীরা ৫০-৬০ লাখ টাকা লাভ করে থাকে। তিনি আরও বলেন, মত্স্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে ব্যবসায়ীদের কোন ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় না। এমনকি ব্যাংক থেকে ব্যবসায়ীদের কোন ধরনের সাহায্যও করা হয় না। বারাকপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি গাজী আব্দুর রউফ জানান, ব্যাংক ঋণ দেয়া হয়, তবে সবার জন্য নয়। সারা বছর উপজেলা মত্স্য অফিসের কোন তত্পরতা এ এলাকায় দেখা যায় না। পোনা পরিবহন সহজতর করতে নগরঘাট, বারাকপুর অথবা দিঘলিয়ায় ভৈরব নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবি করেন তিনি। দিঘলিয়া মত্স্য কর্মকর্তা বিপুল কুমার বসাক জানান, সাদা মাছের পোনা পরিচর্যা বিষয়ে প্রশিক্ষণের সরকারের বরাদ্দ নেই। তবে পোনা ব্যবসায়ীরা তার কাছে কোন কারণে সাহায্য চাইলে তিনি তাদের সর্বাত্মক সহায়তা করেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিশ্বাস রাসেল হোসেন জানান, গত তিন মাসে কার্প জাতীয় মাছের পোনার পরিচর্যা সংক্রান্ত কোন প্রশিক্ষণ হয়নি। ইতিপূর্বে হয়েছে কি না এ ব্যাপারে তিনি অবগত নন।