২০০৫ সাল থেকে শুরু করে ২০১০ সাল পর্যন্ত দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য আমাদের জাতীয় অর্জন। এটা কোন সরকারের একক সাফল্য নয়। এসময়কালে তিনটি সরকার ক্ষমতায় ছিল। তাই দারিদ্র্য বিমোচনের সংখ্যা নিয়ে যাতে রাজনীতি না হয় সেদিকে সকলের নজর রাখতে হবে। বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ২০০০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্যের কথা উঠে এসেছে। যদিও দারিদ্র্য বিমোচন নির্ধারণ পদ্ধতির বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গতকাল শনিবার এক গোলটেবিল আলোচনায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য একথা বলেন।
জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম: বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন প্রতিবেদনের একটি পর্যালোচনা’ শীর্ষক গোলটেবিলের আয়োজন করে দি হাঙ্গার প্রজেক্ট। অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে এতে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক এমএম আকাশ, বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি ড. ইফফাত শরীফ এবং হাঙ্গার প্রজেক্টের বাংলাদেশ প্রধান বদিউল আলম মজুমদার।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে কৃষিক্ষেত্রে অগ্রগতি মূলত দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা রেখেছে। এ সময়ে কৃষক কি দামে উপকরণ কিনেছে এবং ফসল কি দামে বিক্রি করেছে সে বিষয়টার দিকে নজর দিলে বোঝা যাবে দারিদ্র্য বিমোচনে কোন বিষয়টা সবচেয়ে সহায়তা করেছে। আলোচ্য সময়ে আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থার কারণে এটা হয়েছে। শ্রমের মজুরি বৃদ্ধির জন্য নয়। অনাবাসী আয় (রেমিট্যান্স) সম্পর্কে আমরা যেরকম উচ্চ ধারণা রাখি রিপোর্টে বিষয়টা সেভাবে আসেনি। এসব বিষয়ের পরেও গত দশ বছরে মানুষের আয় যেভাবে বেড়েছে তা ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়বে না-কি অন্যকোন সমস্যা হবে সেটাই দেখার বিষয়। আয় বৈষম্য, সঞ্চয়ের হার ও আঞ্চলিক বৈষম্য কমেছে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েও এটা কতটা কমেছে সে বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। দেশের দারিদ্র্য বিমোচনে কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য শিল্পায়নকে সামনে আনতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
বিশ্বব্যাংক যে প্রতিবেদন দিয়েছে তা দিয়ে অর্থমন্ত্রী তথা দেশের কতটা উপকার হবে সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। এ ধরনের প্রতিবেদন দেয়ার সাথে সাথে বিশ্ব ও জাতীয় প্রেক্ষাপটে যেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব এমন সুপারিশ দেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে এমএম আকাশ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরেই নেতিবাচক প্রচারণা চলছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নোবেল বিজয়ী অমর্ত্যসেনসহ কয়েকজন অর্থনীতিবিদের মন্তব্য ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের মাধ্যমে সে অবস্থার পরিবর্তন হয়ে ইতিবাচক ধারা দেখা যাচ্ছে। ২০০৫-০৬ সালে যে অর্থনৈতিক ধারা ছিল ২০১৩ সালেও সে একই ধারা আছে। তবে এ অবস্থার পরও নির্বাচনে সরকারের পরাজয় কেন? তিনি বলেন, এ সময়ে শহরের চেয়ে গ্রামে দারিদ্র্য বিমোচনসহ উন্নয়ন হয়েছে। এজন্য গ্রাম অঞ্চলের নির্বাচন হলে এটা বোঝা যাবে। এছাড়া নির্বাচনে ধর্ম ও দুর্নীতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, বিগত ১০ বছরে শ্রমবাজারে গতিশীলতার কারণে দারিদ্র্যের হার কমেছে। কৃষি ও অকৃষি খাতের মধ্যে একটা ইতিবাচক ধারা সৃষ্টি হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে এটা কতটা থাকে সেটাই দেখার বিষয়। দুর্নীতি ও বৈষম্য দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ দুটি কমাতে না পারলে দারিদ্র্য বিমোচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দারিদ্র্য বহুমাত্রিক হলেও একমাত্রিক সূচক ধরে দারিদ্র্যের পরিমাপ করায় সঠিক চিত্র ফুটে উঠে না বলেও মনে করেন তিনি।
মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ প্রতিবেদন দেশের অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন প্রকৃতির সঙ্গে এটি ঘনিষ্টভাবে জড়িত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো স্বাধীনভাবে এটা করতে পারলে এবং পরিসংখ্যান সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারলে তা গবেষকসহ সবার জন্য উপকার হত। তিনি বলেন, চার ধরনের পদ্ধতিতে দারিদ্র্য বিমোচন হার নির্ধারণ করা যায়। ভিন্নভিন্ন এ পদ্ধতিতে ফলাফলও আসে ভিন্ন। এজন্য কোন পদ্ধতিতে এটা করা হবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রফতানি আয় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করলেও বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলা হয়েছে কৃষিক্ষেত্রের অবদানের কারণে দারিদ্র্যের হার কমেছে যা দেশের অর্থনৈতিক চিত্রের সঙ্গে মেলে না। দারিদ্র্য বিমোচনের হার নির্ধারণ দেশীয় প্রেক্ষিতে না করে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে করার সুপারিশ করেন তিনি।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে দারিদ্র্যের পরিমাণ করা হয়েছে ‘কস্ট অব বেসিক নিড্স’ বা ন্যূনতম চাহিদা মূল্যের পদ্ধতি ব্যবহার করে। এ পরিমাপকের ভিত্তি মানুষের জৈবিক চাহিদা। এ পদ্ধতি সঠিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব মৌলিক চাহিদা নীচ প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। ড. আনিসুর এ পদ্ধতিকে গবাদিপশুর দারিদ্র্যের পরিমাপক হিসেবে উল্লেখ করেছেন বলেন জানান তিনি।
ড. ইফফাত শরীফ বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ধর্মের যেমন প্রভাব রয়েছে দারিদ্র্য বিমোচনেও তেমনি ভূমিকা রয়েছে। যদিও এটা অন্যান্য উপাদানের চেয়ে কম প্রভাব বিস্তার করে। তিনি বলেন, নারীদের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় দরিদ্র্যের সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে বর্তমানে কর্মহীন তরুণদের সংখ্যা বাড়ছে। তাই দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য তরুণ সমাজকে কর্মে নিয়োজিত করার বিকল্প নেই।
গত ২০ জুন ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিষয়ে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। যাতে দেশের দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। এতে দাবি করা হয় নির্ধারিত সময় অর্থাত্ ২০১৫ সালের আগেই দারিদ্র্যের সংখ্যা অর্ধেক করা সম্পর্কিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জন সম্ভব।
