শেয়ারবাজারের কিছু কোম্পানি ঘিরে আবার কারসাজি শুরু হয়েছে। কোন সংবেদনশীল তথ্য না থাকলেও কয়েকদিনের ব্যবধানে কোম্পানিগুলোর প্রতি শেয়ারের দাম দুইশ’ থেকে তিনশ’ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অস্বাভাবিকভাবে কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বাড়তে থাকলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি’র (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন) পক্ষ থেকে তেমন কোনো তত্পরতা দেখা যাচ্ছে না। এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে ফের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বিনিয়োগকারীদের।
গত এপ্রিলে শেয়ারবাজারে তালিকা-ভুক্ত বিবিধ খাতের একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম ছিল ২০০ টাকা (ফেসভ্যালু-১০০ টাকা)। তিন মাসের ব্যবধানে দাম বেড়ে ওই শেয়ারের দাম ৭৩৬ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। গত ২৩ জুনও এর দাম ছিল চারশ’ টাকা। অব্যাহতভাবে শেয়ারের দাম বাড়ায় এর পিই রেশিও (দাম-আয় অনুপাত) ৩৬০-এ পৌঁছেছে। যেখানে পিই রেশিও ১৮-এর বেশি হলেই ওই কোম্পানির শেয়ারের দামকে অধিক বলে বিবেচনা করা হয়। কোম্পানির দাম বাড়ার কারণ খুঁজতে এর মুনাফা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৩১ মার্চ পর্যন্ত ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী কোম্পানির লোকসানের পরিমাণ ১৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ইপিএস (শেয়ার প্রতি আয়) ১৬.৩৩ টাকা (ক্ষতি)। অর্থাত্ কোম্পানির প্রতি শেয়ারের বিপরীতে লোকসান ১৬ টাকা ৩৩ পয়সা। আগের বছর একই সময়ে কোম্পানির মোট লোকসানের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এ বছর কোম্পানির লোকসানের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে বাড়ছে শেয়ারের দামও। তবে গেল বছরে শেয়ারহোল্ডারদেরকে ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেয়ায় (লোকসান করলেও সঞ্চিতি থেকে লভ্যাংশ দেয়া যায়) এ বছর জুন থেকে কোম্পানিটি ‘জেড’ ক্যাটাগরির পরিবর্তে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া কোম্পানিটিকে ৪০০ টাকা প্রিমিয়ামে টাকা উত্তোলনের অনুমতি দেয় বিএসইসি। তবে এ দুটি তথ্যের কারণে শেয়ারের দাম এভাবে বেড়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা।
ডিএসইতে তালিকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের একটি কোম্পানির শেয়ারের দাম গত এপ্রিলে ছিল ৯০ টাকা (ফেসভ্যালু- ১০ টাকা)। গত ১৬ জুন ছিল ৩২০ টাকা। আর গত ১১ জুলাই শেয়ারের দাম উঠে যায় ৪৪০ টাকায়। ফলে এর পিই রেশিও দাঁড়িয়েছে ১৬৫। শেয়ারের দর বৃদ্ধির কারণ জানতে গত ৩ জুন চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছিল। একইভাবে গত ১৮ এপ্রিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পক্ষ থেকেও চিঠি দেয়া হয়। দুই স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষকেই কোম্পানিটি জানিয়েছে, তাদের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই যাতে শেয়ারের দর বাড়বে। ২০১০ সালের বাজার উল্লম্ফনের সময় এই কোম্পানির শেয়ারের দর মাত্র ৩২ টাকা থেকে ৬ হাজার টাকায় উঠেছিল। তখন কোম্পানিটির নাম ছিল ভিন্ন এবং তখন শেয়ারের ফেসভ্যালু ছিল ১০০ টাকা। এদিকে গত ২৫ এপ্রিল প্রকাশিত ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস দেখানো হয়েছে ২৬ পয়সা। যা আগের বছরে একই সময়ে ছিল ৩৬ পয়সা। আয় কমলেও কোম্পানির শেয়ারের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ার পেছনে কারসাজি চক্রের হাত রয়েছে বলেই মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
গত ১৯ জুন ডিএসইতে ফার্মাসিউটিক্যালস ও রাসায়নিক খাতের একটি কোম্পানি ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হয়। এর আগে সিএসইতে কোম্পানিটি তালিকাভুক্ত ছিল। সিএসইতে সারাবছর ধরে কোম্পানিটির শেয়ারের গড় দাম ছিল ২১ টাকা, কখনোই ২৭ টাকার উপরে লেনদেন হয়নি। একই কোম্পানি ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরই শেয়ারের দাম তর তর করে বাড়তে শুরু করে। ১৯ জুন কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ৩৫ টাকা। আর ১১ জুলাই এসে তার দাম উঠে যায় ১৪৫ টাকায়। ফলে কোম্পানির পিই উঠে যায় ১১৬.১৭তে। তথ্যে দেখা গেছে, কোম্পানির প্রথম প্রান্তিকের মুনাফা হয়েছে ৯ লাখ টাকা। আর শেয়ার প্রতি আয় ৮ পয়সা। যা আগের বছরের একইসময় ছিল ২১ পয়সা। এ বছর কোম্পানির আয় কমলেও শেয়ারের দাম বাড়ছে তর তর করে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের অপর একটি কোম্পানির দাম গত ২৬ জুন ছিল ২২০ টাকা। যা ৯ জুলাই ৩২০ টাকায় উঠে যায়। অথচ প্রথম প্রান্তিকশেষে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৬৬ পয়সা। যা আগের বছর একই প্রান্তিকে ছিল ৬৩ পয়সা। কোম্পানির ইপিএস ভালো না হলেও দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে কোম্পানির কোনো ইতিবাচক তথ্য রয়েছে কি-না তা জানতে চায় সিএসই কর্তৃপক্ষ। কোম্পানিটি জানিয়েছে, দাম বাড়ার মতো কোনো তথ্য বা কারণ কোম্পানির নেই। এরপরই কোম্পানির দাম কমতে থাকে। ফলে গত ১৬ জুলাই কোম্পানির দাম নেমে আসে ২৫৪ টাকায়। এতে ইতিমধ্যে অনেক বিনিয়োগকারীই ক্ষতির শিকার হতে শুরু করেছেন।
এভাবে বাজারে অনেকগুলো কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। প্রায়ই বাজারে গুজব ছড়িয়ে কোম্পানির শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হচ্ছে। এতে কোম্পানির মৌল ভিত্তি ও আয় ভালো না হলেও শেয়ারের দর বেড়ে যাচ্ছে অস্বাভাবিকভাবে। অথচ মৌলভিত্তিসম্পন্ন ও ভালো আয়সম্পন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম রয়ে গেছে তলানীতে। এরমধ্যে বেশকিছু দিন ধরেই ব্যাংকের শেয়ারের দাম অনেকটাই ফেসভ্যালুর কাছাকাছি চলে এসেছে।
কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়াতে কেউ অস্বাভাবিক লেনদেন করলে বিএসইসি’র নতুন চালু হওয়া সার্ভিলেন্স সফ্টওয়ারের মাধ্যমে তা ধরা পড়ে যায়। ২০১০-এ ঘটে যাওয়া কারসাজির সময় সার্ভিল্যান্স সফটওয়ার না থাকায় তখন কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে বিনিয়োগকারীদের টাকা হাতিয়ে নিলেও তা ধরা ছিল কঠিন। এবার এ সফ্টওয়্যার থাকায় কারসাজি করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই। তালিকাভুক্ত কোম্পানি জেএমআই সিরিঞ্জের দর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখতে বিএসইসি’র পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে অন্য কোম্পানিগুলোর ব্যাপারে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানা যায়নি।
