গত ১০ জুন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে খুজিস্তা নূর-ই-নাহরীন পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনিই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রথম নির্বাচিত নারী পরিচালক এবং হোসনে আরা বেগম ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রথম নারী সদস্য। শেয়ার বাজারের এই দুর্দিনেও তারা সফলতার সাথে তাদের ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। খুজিস্তা নূর-ই-নাহরীন এবং হোসনে আরা বেগমকে নিয়ে আমাদের এই প্রতিবেদনটি লিখেছেন— রাবেয়া বেবী এবং মেহেদী হাসান
খুজিস্তা নূর-ই-নাহরীন
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রথম নির্বাচিত নারী পরিচালক
আমাদের নির্বাচনটা একটু ভিন্ন রকম। এখানে কেউ কাউকে প্রভাবিত করতে পারে না। প্রতি বছর চারজন পরিচালক নির্বাচিত হন। সাধারণত ছেলেরাই নির্বাচনে অংশ নেন আর পরিচালক নির্বাচিত হন। এবার আমি সাহস করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি এবং নির্বাচিত হলাম । নিজের সাহসের কথা এভাবেই বর্ণনা করলেন গত ১০ জুন ভোটে নির্বাচিত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রথম নারী পরিচালক খুজিস্তা নূর-ই-নাহরীন। খুজিস্তা জামালপুরের মেয়ে। শৈশবটা কেটেছে জামালপুরেই। বাবা মোজ্জামেল হক ব্যবসা করতেন আর মা সেলিমা হক গৃহিণী। তিন ভাইয়ের এক বোন খুজিস্তাকে ছোটবেলা থেকে নিজেকে নারী না ভেবে মানুষ ভাবতে শিখিয়েছেন বাবা। ছেলেবেলা থেকেই তাই একটা নেতৃত্বের গুণ চ্যালেঞ্জ গ্রহণে আনন্দ ছিল তার। তাই জামালপুর থেকে পড়াশুনা শেষ করে ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। পড়া শেষ করে কিছুদিন বারডেমে কাজ করলেও বিয়ের পর তা আর চালিয়ে নিতে পারেননি পরপর দুটি সন্তানের জন্য। তবে ঘরে বসে এমন কিছু করার সুযোগ সন্ধান ছিল তার সব সময়। তিনি বলেন, আমার স্বামী শেয়ার বাজারে সামান্য বিনিয়োগ ছিল। এক সময় শেয়ার বাজারে ধস নামে। সেটা ১৯৯৬ সালের কথা। আমি ভাবতে শুরু করলাম কেন মানুষের টাকা হারালো? কেমন করে এই ব্যবসা হয়? এমন নানা প্রশ্নের জবাব খুঁজতে বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করি। তারপর থেকে খুজিস্তা লেগে থাকেন শেয়ার বাজারে নানা তথ্য উপাত্ত সংগ্রহে। একসময় তিনি ব্যবসাটা বুঝে যান আর সাথে কিছু টাকা জমে যায় তার। তখন তিনি ঠিক করেন ব্রোকারেজ হাউজ কিনবেন। স্বামী তাকে বাধা না দিয়ে বরং সহযোগিতা করেন। ব্যস নেমে যান এক চ্যালেঞ্জিং ব্যবসায়। খুজিস্তা বলেন, আমি একজন মানুষ এটা ভাবতে আমার ভালো লাগে। আর খারাপ লাগে আমাদের দেশের নারীদের দুরবস্থা দেখতে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে বঞ্চিত করে নারী নিগৃহিত হয় নানাভাবে। এই নিগৃহের থেকে বের হতে প্রয়োজন অর্থনৈতিক মুক্তি। যোগ্যতার সাথে পেশা গ্রহণ আর নিজের অধিকার সচেতন হওয়া। খুজিস্তা স্বপ্ন দেখেন দেশটা সুন্দর হবে আর মানুষরা হবে আরও সুন্দর। সুন্দর হওয়ার এই যাত্রায় পরিবার থেকে শিক্ষা নেবে শিশুরা। সবাইকে মানুষ ভাবার শিক্ষা।
হোসনে আরা বেগম
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রথম নারী সদস্য
হোসনে আরা বেগমের জন্ম বরিশালে। এইচএসসি পাস করার পরপরই বিয়ে হয়ে যায় শফিকুল আলমের সাথে। পড়াশুনা করেছেন বরিশালেই। ইঞ্জিনিয়ার স্বামী শফিকুল আলম থাকতেন তার কর্মক্ষেত্র ঢাকাতে। তাই বিয়ের পরই স্বামীর সাথে ঢাকা চলে আসেন হোসনে আরা বেগম। এরপর আর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা করা হয়নি। কিন্তু সেই সময় তার স্বামী জড়িত ছিলেন শেয়ার ব্যবসার সাথে। ছিলেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের একজন সদস্য। পরে শফিকুল আলম ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। স্বামী যেহেতু শেয়ার ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন তাই নিজে ঘরের কাজের পাশাপাশি আগ্রহ নিয়ে স্বামীর কাজ দেখতেন। সেই সময়েই শেয়ার ব্যবসায় নিয়েছেন হাতেখড়ি। ১৯৯১ সালে স্বামী মারা যাওয়ার পর স্বামীর প্রতিষ্ঠা করে যাওয়া ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে নেন নিজ কাঁধে। মেয়ে ফারাহ আলমকে পড়িয়েছেন অষ্ট্রেলিয়াতে। পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরে মেয়ে মায়ের কাজের ভার কমিয়েছেন। মা-মেয়ে দু’জনে চালাচ্ছেন তাদের প্রতিষ্ঠানটি। ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মেয়ে ফারাহ আলম আর হোসনে আরা বেগম ম্যানেজিং ডিরেক্টর। ১৯৯২ সালে হোসনে আরা বেগম যখন শেয়ার ব্যবসায় নামেন তখন প্রাতিষ্ঠানিক কোনো জ্ঞান না থাকায় আগে স্বামীর থেকে যা শিখেছিলেন তা দিয়ে শুরু করেন আর ধীরে ধীরে পড়াশুনা করে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে এগিয়ে নিতে থাকেন নিজেদের প্রতিষ্ঠানটিকে। এরপর ১৯৯৬ সালে তিনি ঢাকা স্টক একচেঞ্জের সদস্য নির্বাচিত হন। শুরুর দিকে হোসনে আরা বেগমই ছিলেন একমাত্র নারী যিনি শেয়ার ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেটে মাঝেমধ্যে অপ্রত্যাশিত ধস নামে, নিঃস্ব করে দেয় বিনিয়োগকারীদের। এই অবস্থার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে এই ব্যবসায় নামার আগে ভালমতো পড়াশুনা করে নেয়া খুবই জরুরি। প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব, অনিয়মসহ বিভিন্ন কারণে এহেন পরিস্থিতির সৃষ্টি বলে মত দেন তিনি। তরুণ প্রজন্মের যারা শেয়ার ব্যবসায় আসতে চান তাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আগে পড়াশুনা করে এই ব্যবসায় নামলে খুব একটা বিপদে পড়তে হয় না।
