সাহেলী। এখন থেকে ২৩ বছর আগে ইডেন কলেজ থেকে পরিসংখ্যানে স্নাতক শেষ করেন। তখন ব্যক্তিগত কারণে স্নাতোকোত্তর ডিগ্রী না নিলেও বসে থাকেননি সাহেলী। ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের উপর এক বছরের কোর্স সম্পন্ন করে টুকটাক কাজ শুরু করেন এ পথে। পথ বন্ধুর। কাজ শেষে ৫০০ টাকা ছিল নিজের প্রথম উপার্জন। পরের দু’বছর ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন নিয়েই কাজ করেন নিজের ঘর থেকে বিভিন্ন কোম্পানিতে। এক বন্ধুর করা এ্যাপলিকের কাজ দেখে মন বসে যায় তাতে। কিছুদিন ভাবা তারপর সিদ্ধান্ত। পরিসংখ্যান আর ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন বিদ্যাটা কাজে লাগাতে থাকেন এ্যাপলিকে।। ছোট বেলা থেকেই আঁঁকা-আঁঁকির প্রতি টান, শখের বসে শাড়ি, চাঁদর, কুশন কভারে সূচসুতা দিয়ে এমব্রয়ডারি করে বন্ধুদের উপহার দেয়া, সৃজনশীল কিছু করার স্বপ্ন আর সেই সাথে চর্চাটা প্রতিফলিত হয় হাতের কাজে। সাহেলীর প্রিয় বিষয় এ্যাপলিক। একটি বেজ কাপড়ের উপর ছোট ছোট কাপড়ের টুকরো বসিয়ে চারিদিকে হেমস্টিচ ব্যবহার করে ফুটিয়ে তোলা হয় বিভিন্ন নকশা। সে নকশা করেন সাহেলী নিজ হাতে। তিনি এ মাধ্যমে কাজ করছেন সব মিলিয়ে প্রায় ৩০বছর। ২০০৩-এ নিজের নকশা করা মাত্র ৩০০ পটারী আর ২৭টি বেডকভার নিয়ে আয়োজন করেন প্রথম প্রদর্শনীর। তারপর আর থামেননি সাহেলী। সাহেলীর তিনটি শো-রুম আছে। দেশীয় বিক্রির সাথে সাথে সাহেলীর হাতের কাজের চাহিদা তৈরি হয়েছে বি-ভুঁইয়েও। জাপান, জার্মানী, আমেরিকা, ইন্ডিয়াতে তার স্বপ্নে গড়া কাজ যাচ্ছে কখনো স্বজন-পরিজনের হাত ধরে, কখনো সরাসরি ক্রেতার হাত ছুঁয়ে। প্রায় ত্রিশ বছর পরে এসেও দৈনিক সময় দেন ১২-১৪ঘন্টা।
সেই ৫০০ টাকা থেকে আজ এতদূর আসার প্রেরণা বা শক্তির কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরিশ্রম, পরিশ্রম আর পরিশ্রম, তার সাথে মেধা ও নিষ্ঠার যোগ। এর বাইরে অন্য কিছু না।’ দীর্ঘ পথ পাড়ির পর প্রাপ্তির কথা জানতে চাইলে সাহেলী বলেন, ‘পাওয়ার কিছু নেই, পাওয়ার জন্য এ পথে আসিনি, স্বপ্ন ছিল কিছু করার, চেষ্টা করছি কিছু করতে।’
ছোটবেলা থেকেই আঁকিবুকির শখ নাহিদা শারমিনের। শখ থেকেই পড়াশোনা আর পড়াশোনা অবস্থায়ই নিজের, পরিজনের, কাছের জনের শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া রাঙিয়ে দিতেন রঙের আঁঁচড়ে। প্রতিউত্তরে প্রশংসাও আসতো তার সৃজনশীল কাজের। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন আর্টস’এর ছাত্রী নাহিদা শারমিন পড়াশোনা শেষ করে গভ: আর্ট কলেজে অধ্যাপনা করেন ১২বছর। শিক্ষকতায় ১২বছর কাটলেও শারমিনের মন ডুবে থাকতো শাড়ির জমিনে, রঙ আর তুলিতে। একসাথে দুই কাজ হয় না। শেষতক তাই চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে মনোনিবেশ করেন শাড়ি রঙ তুলির মিশেলে। প্রথম উপার্জন একদিন একটি শাড়ি নকশা করে কলেজে নিয়ে আসলে তার সহকর্মীরা পছন্দ করেন এবং তা মাত্র ৬০০টাকায় বিক্রি করেন, যা তিনি তৈরি করেন ৪০০টাকায়। এ ভাবেই শুরু। প্রায় প্রতি বছরই আয়োজন করছেন প্রদর্শনীর। কাজের মান মেধার সাক্ষ্য পরিশ্রমের ফল মিলিয়ে হাতে পুরস্কারও উঠেছে বেশ কয়েকবার। এ কাজে প্রেরণার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যে কোনো কাজের প্রথম প্রেরণা নিজে, তারপর পরিবার-পরিজন ও চারপাশ, সাথে কঠিন পরিশ্রম করার মনোপ্রস্তুতি। লেগে থাকতে হয়, শ্রম দিতে হয়, মেধাকে কাজে লাগাতে হয়, তারপর দেখেশুনে পথ চলতে হয়। কিছু করার ইচ্ছে থাকলে এবং তার প্রতি নিষ্ঠা থাকলে কিছু করা যায়। আমার কাজই আমার প্রেরণা।’ এ ক্ষেত্রে প্রায় ২২ বছর কাটিয়ে দিলেও শারমিন এখনো এর পেছনে সময় দেন দৈনিক ১৪-১৬ঘন্টা। তার সহযোগী আছেন ১০০ থেকে ১৫০জন কর্মী। ছোট্ট বুননের সেই স্বপ্নের পথ পেরিয়ে এতদূর এসে তৃপ্তির কথা জানতে চাইলে শারমিন বলেন, ‘তৃপ্তি বা প্রাপ্তি বলতে কিছু নেই, নিজে কিছু করার ইচ্ছায় পা বাড়িয়েছি শূন্য মাঠে, এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে হেঁটেছি, দৌঁড়েছি, হোঁচট খেয়েছি, উঠে দাঁড়িয়েছি।’ একদিন মাত্র ৪০০টাকা দিয়ে শুরু করলেও আজ শারমিনের কাছে কাজ করেন অনেকে, কর্মহীন মানুষগুলো তার সাথে কাজ করে তাদের সংসার চালাতে পারছেন, তারাও স্বপ্ন দেখতে পারছেন-এটাই শারমিনের কাছে বড়ো পাওয়া, কিছু করতে পারা, এটাই তার স্বপ্নের ফসল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করে তৌহিদা তহু যোগ দিয়েছিলেন গতানুগতিক চাকরিতে। একুশে টেলিভিশনে ছিলেন প্রোগ্রাম প্রোডিউসার, ছিলেন উপস্থাপকও। এরপর পাড়ি জমান লন্ডনে। দেশে এসে ইউএনডিপি, ওয়ার্ল্ড ফুড, সিডিএসহ আবার কাজ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। কোথাও টেকেনি মন। ছোটবেলা থেকেই হাতেখড়ি ছিল আঁকাআঁকির। সে দক্ষতা কাজে লাগিয়েই শক্ত মনোবল নিয়ে নেমে পড়েন সময়ের উঁচুনিচু ময়দানে। নানান বিপরীত স্রোত ঠেলে এক বন্ধুর সহযোগিতায় প্রথম পেয়ে যান গ্রামীণের কিছু কাজ (বেবি-ও্যায়ার)। বিনিময়ে পান ৫০০০টাকা। নোনা ঘামে সেই প্রথম। গ্রামীণের র্যাংকিং-এ সেরা সাপ্লায়ার হিসেবে পেয়ে যান ‘এ’ গ্রেড। এরপর কাজ আসতে থাকে বিভিন্ন জায়গা থেকে। নিজের সৃজনশীলতার নাম দেন ‘তহু’স ক্রিয়েশনস’।
তৌহিদা তহু বলেন, ‘নিজেকে বাদ দিয়ে বলতে গেলে কিছু বন্ধু-বান্ধবের নাম ছাড়া আর কারো নাম বলার নেই। আমাদের দেশে আমাদের এ কাজকে এখনো শুরুতে দর্জির কাজই মনে করা হয়। ভদ্র সমাজ এ কাজকে শেলাইগিরি ছাড়া অন্য কিছু বলতে আগ্রহ দেখান না। বাবা-মাও অনেক ক্ষেত্রে অন্যদের মতোই আচরণ করেন। বাঁকা চোখে দেখেন।’ ১৯শে বিয়ে ২২ শে প্রায় একলা। সহযোগী শব্দটি তহুর কাছে অপরিচিত। একলা থেকেছেন, একলা হেঁটেছেন, একলাই জয় করেছেন নিজের শ্রম, চেষ্টা আর মেধার কারিগরিতে।
তহুর সাথে কাজ করছেন প্রায় ২০০জন কর্মী। কাজের পুরস্কার হিসেবে সাপ্তাহিক ২০০০এর সেরা পুরস্কার পেয়েছেন পরপর ৪বার। এ্যাপলিক, টাইডাই, এ্যাক্রেলিকের কাজ করলেও তহু মূলত প্রশান্তি পান এ্যাপলিকের কাজে। পাওয়া না পাওয়ার কথা জানালেন, ‘নিজের জন্য এবং অনেকের জন্য কিছু করতে পারছি-এটাই পাওয়া। না পাওয়ার কিছু নেই, যা আছে তা সঞ্চয়।’ তহু আরো বলেন, ‘মনের ঘরে ডিজাইন থাকাটাই বড় কথা, পাঠশালায় পাঠ নিলেই সে পাঠে পারদর্শী হবে, না নিলে হবে না এমন না। ডিজাইনিং বিষয়টি একটু অন্য রকম। এমন অনেকেই অছে যারা পাঠ নিয়েও কিছুই করতে পারছেন না, আবার অনেকেই স্বপ্রতিভ ডিজাইনার হয়েও একটি রেখা তৈরি করেছেন।’ পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে নিজের জন্য, ভাই-বোনের জন্য এটা-ওটা রঙ কিংবা সুতায় কাজ করে তৈরি করে দিতেন জামা, শার্ট, ফতুয়া অথবা নিজের সালোয়ার-কমিজ। বড় হবার সাথে সাথে পড়াশোনার ব্যস্ততা বাড়লেও হাতের কাজের অভ্যাসটি ছিকায় তুলে রাখেননি। সময় পেলেই নিজে নকশা করে নিজেই বসিয়ে দিতেন শাড়ি অথবা শার্টের উপর, অত:পর উপহার হিসেবে দিতেন ভাই বা বোনকে।
শামীমা লিজা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০১ সালে এমফিল করেন মিউজিকে। এরপর কিছু একটা করতে চান। ভাবতে ভাবতে পেয়ে যান ছোট বেলার শখের পন্থাটি। তিন ভাই-বোন মিলে মাত্র ১০,০০০টাকা করে নিয়ে শুরু করেন ব্লক বাটিকের কাজ। নিজের বাসায় তৈরি করে নিজের স্বজন-পরিচিতদের কাছেই বিক্রি করতেন প্রথম দিকে। সময় যায়, কাজের রূপ ছড়িয়ে পড়ে পরিজনের গন্ডি পেরিয়ে পাড়া-পড়শীর সীমানায়। ব্যস্ততা বাড়ে, পার্টনাররা ব্যস্ত হয়ে পড়েন যার যার ভালোলাগার কাজে। হাঁপিয়ে উঠলে স্বামী পাশ থেকে শতভাগ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে দেন চলতি পথে চলতে। ছোট ছোট স্বপ্ন দিয়ে গড়া লিজার সেদিনের ১০,০০০টাকার রঙতুলির ঘর এখন ছয় অংক ছাড়িয়ে ততোধিক। লিজা কাজ করেন এ্যাপলিকের হাউজ হোল্ড, নকশী, ব্লক-বাটিক নিয়ে। নিজের নকশায় রাঙিয়ে তোলেন শাড়ি, চাঁদর, পর্দা, সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া, পাঞ্জাবী ইত্যাদিতে। এ কাজ নিয়ে কতদূর যেতে চান জিজ্ঞেস করলে লিজা বলেন, ‘কতদূর যাবো জানি না, ভালোলাগে তাই লেগে আছি। যতদিন এই ভালোলাগা থাকবে ততদিন কিছু করার চেষ্টা করবো। আমি না চাইলেও যে মানুষগুলো আমার কাজের সাথে জড়িয়ে আছে অন্তত তাদের জন্য আমাকে থাকতে হবে।’
শখের শো-রুমের নাম দিয়েছেন ‘আকর্ষী’। দ্বিতীয় শো-রুম ‘আকর্ষী’ খুলনাতে। লিজা বলেন, ‘মুনাফার দিকে খুব একটা তাকাই না, আমার যে কর্মী আছে তাদের বেতন, সুযোগ-সুবিধা দিতে পারলেই আমার চলে। এটা আমার ব্যবসা না, আমার শখ।’
ছবি: বাপ্পী আকন্দ
