আলোকযাত্রা

শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন -‘শামসুন্নাহার’

আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৩, ২১:১৯
বেশ অনায়াস আনন্দ ও আয়েশেই কেটে যেতে পারত তার জীবন। স্বামী অধ্যাপক কাজী সালেহ আহমেদ (প্রাক্তন ভি.সি. জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়), একটি মেয়ে অধ্যাপনা করছে, একমাত্র ছেলে সেও আমেরিকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছে। নিজেও দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন স্কুলের শিক্ষকতা ও মানবাধিকার কর্মী হিসেবে। নিজের বাড়ির গৃহকর্মীর মেয়েটি বেশ মেধাবী ছিল। তার পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ শামসুন্নাহারকে ভাবতে শুরু করালো। উন্মোচিত হলো এক নতুন জগত্। মেয়েটিকে তিনি পড়ালেন, খরচ দিলেন অতঃপর মেয়েটি ভালোভাবে এসএসসি পাস করল। যেন এক আলোর জগতের স্বপ্নলোকের চাবি হাতে পেলেন তিনি। এরপর তিনি ভাবতে লাগলেন কিভাবে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের হাতে তুলে দেয়া যায় রঙিন খাতা, কলম, বই... ওদের একটুখানি আনন্দ! একের পর এক শিশু-কিশোরকে নিয়ে তিনি সহায়তা দিতে শুরু করলেন। শুরু হলো এক নিভৃত আলোকযাত্রা! যে শিক্ষার আলোর জন্য পথে হেঁটেছেন বেগম রোকেয়া শাখাওয়াত্ হোসেন! এগিয়ে এলো তারই ছেলে, মেয়ে, স্বামী ও ছেলের বন্ধুরা। তারাই শামসুন্নাহারের এই শুভ উদ্যোগের সাথে জড়িত হলেন। বাড়ালেন এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সহযোগিতার হাত। গ্রামীণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিনি গিয়ে দেখেছেন শিক্ষার জন্য উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে অসংখ্য সম্ভাবনাময় জীবন স্থবির হয়ে আছে, একটু সহায়তা পেলে ওরা আলোচিত হতে পারে, প্রকাশ করতে পারে তাদের অমিত-প্রতিভা। আদাবর মোহাম্মদপুরে একটি বাড়ি নিলেন তিনি। প্রথমে দশটি শিশুকে বৃত্তিদান কর্মসূচি শুরু করলেন। যাদের বাবা-মায়েরা গৃহকর্ম, রিকশা চালানো, মুদি দোকান, দারোয়ান ইত্যাদি নিম্নবিত্ত কর্মসংস্থানের সাথে যুক্ত। যারা বস্তিতে বসবাস করে উপযুক্ত পরিবেশ না পেয়ে নিজেরাও গৃহকর্ম, রিকশা মেকানিকসহ বিভিন্ন শিশু-শ্রমে নিযুক্ত। তাদের জন্য তিনি ক্লাব গঠন করলেন, সম্পৃক্ত করলেন তাদের বাবা-মাদেরও। বোঝালেন শিক্ষার গুরুত্ব! জীবনকে এগিয়ে নেবার মন্ত্রণা। তার ক্লাবে পাঠ-চক্র, ওয়াল-ম্যাগাজিন, বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা, কোচিং, পিকনিক, বৃত্তি, বই-কলম-খাতা প্রদানসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে তাদের সম্পৃক্ত করা ছাড়াও তিনি উন্নত মানস গঠনে তাদের বিশেষ শিক্ষাদান কর্মসূচি চালু করেন। মানুষ হিসেবে তারা নিজেদের মূল্যায়ন করতে শিখতে আরম্ভ করে। এ বছরই তার আটজন ছাত্র-ছাত্রী এসএসসি পাস করল। বর্তমানে ১৫টির মত শিশুকে তিনি এই বৃত্তি প্রদান করছেন। কলেজ পর্যায়েও শুরু করেছেন এই বৃত্তির ব্যবস্থা। যাদের নিয়মিত বৃত্তি প্রদান, কলম-খাতা-বই তিনি দিচ্ছেন। ওদের মধ্যে তিনি সম্ভাবনার অপার আলো দেখছেন। তিনি বলছিলেন, ‘উপযুক্ত পরিবেশ পেলে ওরাও প্রমাণ করে দেয় ওদের প্রতিভার সম্ভাবনা। ওদের উত্সাহ দিতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।’ নিরক্ষরতা দূরীকরণে তিনি তার এই ক্ষুদ্র উদ্যোগকে অনেক বড়ো আকারে রূপ দিতে চান। গ্র্যাজুয়েশন ও মাস্টারস পর্যন্ত পড়ানোর সহায়তা দিতে চান এই শিশু-কিশোরদের। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে চান, সেই সঙ্গে জীবনের নির্মল আনন্দ। তাই এই ছেলে-মেয়েদের জন্মদিন পালন করেন তিনি। জীবনে ও সমাজে ওরাও মানুষ... এই পবিত্র অনুভূতি প্রবেশ করাতে চান ওদের ভেতর। অনেক ছেলে-মেয়ে শামসুন্নাহারের কাছে এসে পরিবর্তিত হয়েছে। ইভটিজিং ও বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কে তিনি তাদের সচেতন করেছেন। তিনি আহ্বান করেন বিত্তবান বা যেকোন প্রতিষ্ঠান, সহূদয় ব্যক্তি তার এই কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারেন, অজস্র সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষাদান কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হতে পারেন শামসুন্নাহারের এই শুভ উদ্যোগের সাথে। শিক্ষাহীনতার অন্ধকার থেকে, অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে পারেন অজস্র সম্ভাবনাময় শিশুর মূল্যবান জীবন। নিজের ব্যক্তিগত সামর্থ্যে তিনি কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন। এই উদ্যোগটি নিয়ে তিনি অনেক বড়ো স্বপ্ন দেখেন। শিক্ষার আলোর মতন পবিত্র জীবনে আর কি হতে পারে? তিনি আহ্বান করেন প্রতিটি বাড়িতে আমরা যদি গৃহকর্মী, দারোয়ান বা অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোকে শুধু সামান্য কিছু সাহায্য দিয়ে পরনির্ভরশীল না করে যদি শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতা দেই তাহলে সমাজের এক আলোকিত পরিবর্তন সম্ভব। আর এই পদক্ষেপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন গৃহবধূ নারী, সচেতন বিবেকের অধিকারী নারীরা। তিনি বিশ্বাস করেন একমাত্র শিক্ষাই মুক্তির পথ!