মিসরের রাজনৈতিক অচলাবস্থা যেন কাটাছেই না। ২০১১ সালে হোসনি মোবারকের পতনের পর দেশটিতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সামরিক কিংবা বেসামরিক কোনো সরকারই জনগণের আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে পারছে না। উদারপন্থী এবং ইসলামপন্থীদেও বিরোধ এখন প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্বও কোনো এক পক্ষকে এককভাবে সমর্থন দিতে পারছে না। ফলে মিসরের চলমান অস্থিতিশীলততা অবসানের দিনক্ষন কেউই বলতে পারছে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে কিংবা ভারসাম্যপূর্ণ সরকার প্রতিষ্ঠিত না হলে মিসরের জনগনকে বারবার ফিরে যেতে হবে তাহিরর স্কয়ারে। মিসরের রাজনৈতিক দুর্যোগ গভীর হয় গত ৩ জুন মুরসিকে সেনাবাহিনী কর্তৃক সরানোর পর।
মিসরে গত মঙ্গলবার গঠিত ৩৪ সদস্যের অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভার বেশির ভাগই আমলা এবং উদারপন্থী। সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি নতুন সরকারের প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর যৌথ দায়িত্বে রয়েছেন। স্বৈরশাসক হোসনি মুবারকের পতনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভকারী প্রধান দুটি ইসলামপন্থী দলের কোনো সদস্য মন্ত্রিসভায় নেই। মুসলিম ব্রাদারহুড এ সরকারে থাকবে না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছিল। সরকারের সংলাপের আহ্বানও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। নতুন সরকার যেসব বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে তা কঠিন কাজ হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। প্রভাবশালী সংগঠন ব্রাদারহুডের পাশাপাশি অতিরক্ষণশীল আল-নুর পার্টিও নতুন মন্ত্রিসভাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সেনাবাহিনী অভিযোগ করেছে, মুরসির সমর্থকেরা দেশটির সামরিক ঘাঁটিগুলোর বাইরে সশস্ত্র বিক্ষোভ উস্কে দিচ্ছে এবং চলমান রাজনৈতিক বিরোধকে ধর্মীয় বিরোধে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক প্রধান ক্যাথেরিন অ্যাস্টন মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে মুক্তি দেয়ার আহ্ববান জানিয়েছেন। মিসরের সেনাবাহিনী গৃহযুদ্ধ থেকে দেশকে রক্ষা করেছে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী জন কেরি। মিসরে চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইইউ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ। মিসরের নতুন নেতা, মুরসিবিরোধী আন্দোলন তামারোদের সদস্য এবং মুরসির সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির (এফজেপি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন অ্যাস্টন। এর আগে মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম বার্নস বলেন, ওয়াশিংটন চায় মিসরে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সরকার প্রতিষ্ঠিত হোক। সব রাজনৈতিক দল যাতে সরকারে অংশ নিতে পারে। কিন্তু বর্তমান সরকারে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী দুই দল ব্রাদারহুড এবং আল নূর দলের কোনো প্রতিনিধি নেই। দুই দলের সমর্থকরা এখন আন্দোলনের মাঠ গরম করতে ব্যস্ত। মিসরে কোনো দলের কট্টরপন্থী বুদ্ধিজীবী ছাড়া কেউই কোনো সরকারকে সমর্থন দিতে পারছেন না। তারা এক সরকারের বিরুদ্ধে কলম ধরছেন এবং ওই সরকারের অবসান হওয়ার পর অন্য সরকার আসছে। কিন্তু সেই সরকারও যখন জনগণের দিকে নজর দিচ্ছে না তখন আবার এই সরকারের বিরুদ্ধেও লেখালেখি হচ্ছে। বর্তমানে মিসরের অধিকাংশ মানুষ দুই ধরনের ভাবাবেগে ঘুরপাক খাচ্ছে। একটা অংশ চায় দেশটিতে দেশটিতে উদারপন্থী এবং ইসলামপন্থীদের নিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ স্থিতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হোক যারা মিসরকে একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে সক্ষম হবে।
মিসরের রাজনীতিতে যারা গুরুত্বপূর্ণ পালন করছেন তাদের মধ্যে রয়েছে সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি, মোহাম্মদ এল বারাদি, মাহমুদ বদর, আদলি মনসুর এবং মোহাম্মদ মুরসি ও তার দল ব্রাদারহুড এবং আল নূর পার্টি। রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ মিসরের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান সেনাবাহিনীকে কিছুটা হলেও মানুষের কাছে নিম্নমুখী করেছে। আল-সিসিই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জাতিসংঘের আনবিক শক্তি সংস্থার সাবেক প্রধান বারাদি (৭১) মুরসির পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি উদারপন্থী এবং বামপন্থী ও যুবকদের সমন্বয়ে গঠিত ন্যাশনাল স্যালভেশন ফ্রন্টের সমন্বয়ক।
গত ৪ জুলাই আদলি মনসুর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেন। তিনি সেনাবাহিনীর প্রশংসা করেন। তিনি মুরসিবিরোধী গণপ্রতিবাদেরও প্রশংসা করেন। তিনি নির্বাচনের রূপরেখা ঘোষণা করেছেন। ব্রাদারহুড তাদের প্রত্যাখান করেছে। ২০১১ সাল থেকে সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একের পর এক মুরসির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুল জারি করেছে। ব্রাদারহুড অভিযোগ করেছে, আদালত এখনো মুবারকের অনুগত। মুরসি মিসরের পঞ্চম এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট। সমালোচকরা বলেছিলেন, মুরসি নিজের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করছেন। তিনি এখন কায়রোর পূর্বাঞ্চলে সেনাবাহিনীর ব্যারাকে গৃহবন্দী। মুরসি ক্ষমতায় এসে বলেছিল, দেশে জনগনের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। সমালোকরা বলছেন, এর পরিবর্তে মুরসি এবং তার দল মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতা নিজেদের কব্জায় নেয়ার চেষ্টাই করেছে। মুরসির বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত শুরু হয়েছে। ২০১১ সালে কারাগার থেকে পলায়নের অভিযোগে এক মামলায় তাকে আদালতে তলবের আবেদন করা হয়েছে।
আল নূর পার্টি মিসরে শরীয়াহ আইন বাস্তাবায়নের পক্ষে। বিগত নির্বাচনে ব্রাদারহুডের পর আল-নূর পার্টি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পায়। এরপর থেকেই মিসরের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। দলটি সংবিধানের খসড়া প্রণয়নে ব্রাদারহুডকে সমর্থন দেয়। কিন্তু প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিরোধিতা করে। ফলে গত কয়েক মাসে তাদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়। তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে সহায়তা দেয়। আর এ নিয়ে দলটির মধ্যে আরো বিভেদ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে সমপ্রতি নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ৫০ জন মুসলিম ব্রাদার হুডের সমর্থক মারা যাওয়ার কারনে অনেকে মুসলিম ব্রাদারহুডে যোগ দিয়েছে। দলটি পরে অন্তর্বর্তী কালীন সরকারের প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।
