চীনকে কি কোনভাবেই থামানো যাবে না? যে হারে দেশটি উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে পৃথিবীর অন্য দেশগুলো রীতিমতো শঙ্কিত। কোথায় পদচারণা নেই চীনাদের। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ থেকে শুরু করে আফ্রিকা মুল্লুক পর্যন্ত তাদের বিচরণ। এশিয়া অঞ্চলেতো আছেই। অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে একটি দেশকে কিভাবে উন্নতির চরম শিখরে নেয়া যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ চীন।
তাহলে কি চীন আগামী দিনে বিশ্বের সুপারপাওয়ার হতে চলেছে? চীন বা গোটা এশিয়ার লোকজন যাই মনে করুন না কেন উন্নত বিশ্বের নাগরিকরা এখন তাই মনে করছেন। ব্রিটেন, জার্মানি, স্পেন, কানাডা, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার লোকজন মনে করেন আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে চীন সত্যিকারের অর্থনৈতিক সুপারপাওয়ার হিসেবে অভিভূত হবে। আবার অনেকে মনে করেন চীন ইতিমধ্যেই সুপারপাওয়ারের খাতায় নাম লিখিয়েছে। ইতিমধ্যে আফ্রিকার খনিগুলো দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে চীন। তারপরও আফ্রিকার খুব কমসংখ্যক লোক মনে করছে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। মধ্যপ্রাচ্য এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর নাগরিকরাও তাই মনে করেন। তবে রাশিয়ার নাগরিকরা মনে করে, তাদের দেশের সরকারের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সাথে, চীনের সাথেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা উচিত। চলতি বছরের মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত ৩৯টি দেশের ৩৮ হাজার নাগরিকের ওপর পরিচালিত এক জরিপে এসব কথা উঠে এসেছে। জরিপটিতে অর্থনৈতিক শক্তির ওপর জোর দেয়া হয়েছে। ৪৪ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন চীন বিশ্বে অর্থনীতির একটি বড় শক্তি। ৩৯ শতাংশের মত হচ্ছে, অর্থনীতির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সেরা। তবে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, চেক রিপাবলিক এবং অস্ট্রেলিয়ার বেশিরভাগ মানুষের কাছে চীন এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে আধিপত্য বিরাজ করে চলেছে। চীন সম্পর্কে এমন ভিন্ন ভিন্ন ধারণার কারণীয় কি? ওই জরিপে এমন সব তথ্য বের হয়েছে যা চমকে দেয়ার মতো। চীনের রপ্তানি ঠেকাতে ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে কোটা দেয়া হয়েছে। চীন ইউরোপের বাজারে নির্দিষ্ট হারের চেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করতে পারছে না। এজন্য চীন তাদের কাছে মহাশক্তিশালী অর্থনীতির দেশ। আবার আফ্রিকার খনিগুলো অনেক আগে থেকেই চীনা কোম্পানিগুলো ইজারা নিয়েছে। তাই আফ্রিকার লোকজন মনে করে চীনের কাছে যথেষ্ট সম্পদ থাকলে তারা কোনদিনই আফ্রিকার দিকে হাত বাড়াতো না।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে যে মন্দাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো তা এখন ধীরে ধীরে কেটে যেতে বসেছে। কিন্তু চীনের অর্থনীতি উচ্চ শিখরে উঠলেও তা এখন এক জায়গায় থেমে আছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তাতে চীনের অর্থনীতি বছরে পৌনে আট শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সামনের বছরগুলোতে এ প্রবৃদ্ধি কমবে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। আইএমএফের রিপোর্টে বলা হয়, ২০০৮ সালে বিশ্বমন্দার সময়েও চীনের অর্থনীতি উল্লেখযোগ্যহারে এগিয়ে গিয়েছিলো। এখনো সে ধারা অব্যাহত রাখতে পেরেছে দেশটি। কিন্তু অর্থনীতিতে চাহিদার সাথে যোগানের বিষয়টিও নির্ভর করে। বিশ্ব অর্থনীতিতে চাহিদা থাকলেই চীনের যোগানের বিষয়টি নির্ভর করবে। সুতরাং চীনের উত্পাদন বাড়লে তা চাহিদার সাথে সংগতিপূর্ণ হবে এমন কথা বলা যায় না। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো চীনের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ গত এক বছরে ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
চীনের সাথে সাথে এশিয়ার অন্য দেশগুলোর উন্নতিও চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো বিশ্ব অর্থনীতিকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। চীনের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে চলছে দেশগুলো। উন্নত দেশগুলোর যেসব আমদানিকারক দাম বেশির কারণে চীন থেকে পণ্য কিনতে পারেন না তারা হাত বাড়াচ্ছেন পার্শ্ববর্তী অন্য দেশগুলোর দিকে। চীনের জীনযাত্রার মান বেড়ে যাওয়ায় সেখানে শ্রমিকদের মজুরির হারও বেড়ে গেছে। এতে সেখানকার পণ্যের রপ্তানিমূল্য অনেক বেড়ে যাচ্ছে। এ কারণে আমদানিকারকরা হাত বাড়াচ্ছেন এশিয়াসহ আফ্রিকার অনেক দেশে। তাহলে সুপারপাওয়ার হওয়ার জন্য চীন নিজেই নিজের শত্রু বনে যাচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর এসেছে জরিপে। জরিপে অংশ নেয়া যুক্তরাষ্ট্রের অনেকে মনে করেন, চীন এর মধ্যেও একটি উপায় বের করবে। যাতে করে তারা সামনের দিনগুলোতেও বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে পারে।
