স্থূলতা সমস্যায় কাতার হয়রান

আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৩, ২১:২৩
বিত্ত-বৈভবের সুফল যেমন আছে, কুফলও কম নয়। অঢেল সম্পদ থাকলে সাধারণত যা হয়, মানুষ গা ভাসায় বিলাসের সাগরে; হয়ে যায় অলস আর এর বিরূপ প্রভাব পড়ে শরীরের উপর; ভর করে রোগ-বালাই; অনেক ক্ষেত্রে দুরারোগ্য ব্যাধি। তখন মানুষ আফসোস করে বলে, সম্পদ তুচ্ছ বিষয়; সুস্থ না থাকতে পারলে এগুলোর কোন মূল্যই নেই; এসবের বিনিময়েও যদি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারতাম! এমন সমস্যাতেই হিমশিম খাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ ক্ষুদ্র রাষ্ট্র কাতার। সেখনে রীতিমতো স্থূলতার মহামারী চলছে। স্থূলতার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে শীর্ষস্থানটি দখলে নেয় কাতার চলতি বছরের মার্চ মাসে। কাতারের ৭০ শতাংশ লোক অতিরিক্ত ওজনের এবং ৪১ শতাংশ লোক অস্বাভাবিকরকম মোটা— এ তথ্যটা দিয়েছে কাতারের সুপ্রিম কাউন্সিল অফ হেল্থ। কাতারের ওয়েইল কর্নেল মেডিক্যাল কলেজ (ডব্লুসিএমসি— কিউ) জানিয়েছে, স্থূলতার কারণে অকালমৃত্যুর সংখ্যা ভীষণ বেড়ে গেছে। হু হু করে বাড়ছে ডায়াবেটিস, হূদরোগ ও নানা প্রকারের ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। আয়েশি লাইফস্টাইল বেছে নেয়াতেই এমনটি হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন জানিয়েছে, কাতারের মোট জনসংখ্যার ২০.২ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এদের একটি বড় অংশ আবার টাইপ-টু ডায়াবেটিক রোগী। যেটি হয়ে থাকে মূলত পরিশ্রম না করার কারণে। আর এটি সবাই জানে, বর্তমান কাতারের লোকজন বিপদে না পড়লে কায়িক পরিশ্রমের ধারে-কাছেও যায় না। ব্যায়ামের কথা বললে অধিকাংশ লোকই প্রশ্ন করে বসে, এর কি কোনও প্রয়োজন আছে? আল জাজিরা টেলিভিশন সম্প্রতি এক রিপোর্টে জানিয়েছে, কাতারের ৫০ শতাংশ শিশুই অস্বাভাবিক মোটা। এদের অনেকেই টাইপ-টু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। অবস্থা বেগতিক দেখে কোনো কোনো শিশুর অভিভাবককে ডাক্তাররা পরামর্শ দিচ্ছেন তার আদরের সন্তানটির ওয়েট-লস সার্জারি করাতে। কাতারের লোকসংখ্যা ১৮ লাখ। এর মধ্যে মাত্র ৩ লাখ হচ্ছে কাতারের নাগরিক। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, অভিবাসীদের মধ্যে মোটা মানুষ খুব কম। শারীরিক পরিশ্রমের কারণেই স্থানীয়দের তুলনায় অসুখ-বিসুখ কম। তেল ও গ্যাস আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকেই কাতারীদের জীবনে স্থূলতার সমস্যা দেখা দেয়। ঐতিহ্যগতভাবে মরু অঞ্চলের বাসিন্দারা খুব কর্মঠ। কিন্তু কাতারে নগরায়ণ ও সমৃদ্ধির কারণে এখন আর কর্মঠ থাকার প্রয়োজন পড়ছে না। উটের স্থান দখল করে নিয়েছে চার চাকার গাড়ি। ফাস্ট ফুডে অভ্যস্ত হয়ে গেছে লোকজন। হোম ডেলিভারির কারণে বেশিরভাগ বাড়িতে রান্নাবান্না পর্যন্ত হয় না। গৃহস্থালির কাজ ও সন্তান লালন-পালন করে চাকর-চাকরানীরা। অতএব মানুষ তো মোটা হবেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাক্কলন অনুসারে, পাঁচ বছর পর কাতারে ৭৩ শতাংশ নারী এবং ৬৯ শতাংশ পুরুষের শরীরই অতিরিক্ত মোটা হবে। তখন এদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়েই গলদঘর্ম হয়ে পড়বে সরকার এবং কর্মক্ষম মানুষ খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। লোকজন এখনই সতর্ক না হলে এমন পরিণতি অনিবার্য। কাতারীদের খাবারের পদ ও পরিমাণ দেখলে ভিরমি খাওয়ার উপক্রম হয়। ইচ্ছা এবং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করা অনুচিত, এ বিষয়টি অধিকাংশ লোক বুঝতেই চায় না। সংযমের মাস রমজানে দিনের বেলা উপবাস থাকলেও ইফতার, রাতের খাবার এবং সেহরি মিলিয়ে কেউ কেউ স্বাভাবিকের চেয়ে দু’তিনগুণ বেশি খাদ্য গ্রহণ করে। তেল ও গ্যাস বিক্রির অর্থ প্রত্যেকের একাউন্টেই কম বেশি জমা হয় বলে যেসব চাকরিতে কায়িক শ্রম দিতে হয়, সেগুলোর ব্যাপারে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। ওগুলো নির্ধারিত বিদেশি শ্রমিকদের জন্য। হোয়াইট কলার জব পর্যন্ত অনেকে করতে চায় না; দিন পার করে শুয়ে-বসে। অতএব বেশিরভাগ লোকের মুটিয়ে যাওয়াটাই তো স্বাভাবিক। সমগ্র কাতারে পার্ক ও জিমন্যাসিয়ামের অভাব নেই। তা সত্ত্বেও হাঁটাহাঁটি ও ব্যায়ামের ব্যাপারে লোকজনের প্রবল অনাগ্রহ কাজ করে। সেজন্য অবশ্য প্রকৃতিও কিছুটা দায়ী। বছরের ছয় মাসেই তাপমাত্রা থাকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে। এমন গরমে হাঁটাহাঁটিতে একটু সমস্যাই হয় বৈকি। অবস্থা বুঝে বিকল্প উপায় খুঁজে বের করা হয়েছে। কাতারে নবনির্মিত বিশালাকৃতির শপিং মলগুলোতেই হাঁটার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এসব মলে ঢোকার পথে দোকানের ম্যাপের পাশাপাশি টানিয়ে দেয়া হয়েছে ওয়াকিং রুট। সেইসঙ্গে উল্লেখ করা আছে, কতোটুকু হাঁটলে কতো ক্যালোরি খরচ হবে। হাঁটাহাঁটির উদ্দেশ্যে শপিং আওয়ার্সের দুই ঘন্টা আগে এবং পরে মলে অবস্থান করা যায়। কাতারের লোকজন যাতে দিনে অন্তত দশ হাজারবার কদম ফেলে সেই প্রকল্পের আওতাতেই এই ব্যবস্থা। তবে তাতেও খুব একটা সাড়া মিলছে না। এ প্রসঙ্গে কাতারের সুপ্রিম কাউন্সিল অফ হেলেথর গণস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ হামাদ জে আল থানি মন্তব্য করেছেন, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে জনগণের আচরণ পরিবর্তন করাটা অনেক বেশি কঠিন। স্থূলতা সমস্যা থেকে কাতারের মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে লোকজনের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়া। নইলে সামনে আরো কঠিন দিন অপেক্ষা করছে।