ইয়েমেন অভিবাসীদের মৃত্যুপুরী

আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৩, ২১:২৫
সৌদি আরবের ঠিক দক্ষিণে বিস্তর এক মরুর দেশ ইয়েমেন। এশিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হলেও আফ্রিকা থেকে এর দূরত্ব খুব বেশি নয়। আফ্রিকা আর ইয়েমেনের দূরত্ব কেবল এক লোহিত সাগর। তবে আফ্রিকার দারিদ্র্য পীড়িত মানুষের দৃষ্টি সৌদি আরবের স্বর্ণালী বালুকাবেলায়। রুটি রুজির সন্ধানে তাই আফ্রিকা থেকে প্রতি বছর লোহিত সাগরে পাড়ি জমায় হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু সৌদি আরবে যাবার আগে তাদের পাড়ি দিতে হয় ইয়েমেনের ধূসর বালিয়াড়ি, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে বীভত্স ও বর্বরতম ঘাতক। এমনই এক নির্মম নির্যাতনের শিকার ইফতা। ইথিওপিয়া থেকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে ১৭ বছর বয়সেই পাড়ি জমিয়েছিলো সে। কিন্তু ইয়েমেনে পৌঁছা মাত্রই অপহূত হয় ইফতা। বন্দুকের মুখে তাকে নেয়া হয় ইট-কাদা মাটির তৈরি এক বাড়িতে। সেখানে সে দেখতে পায় আটকে রাখা আরো অনেক মেয়েকে। ইফতার সামনেই তাদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালায় ইমেনের বর্বরেরা। এরপর তার উপরও শুরু হয় ধর্ষণসহ শারীরিক নির্যাতনের স্টিমরোলার। এভাবে চলে তিনমাস। ইফতা জানায়, লজ্জা আর অপমানের কারণে বেঁচে ফিরতে অপহরণকারীদের চাহিদা মোতাবেক পরিবারের কাছে টাকা চাইতেও পারেনি সে। এক পর্যায়ে ইফতা অসুস্থ হয়ে পড়লে এবং টাকা দেবে না নিশ্চিত জেনে দুর্বৃত্তরা রাস্তায় ফেলে আসে ইফতাকে। প্রতি বছর ইথিওপিয়া থেকে গড়ে আশি হাজার মানুষ এমন বিপদজনক অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। সৌদি আরবে গিয়ে আয়-রোজগার করে তারা বাড়িতে টাকা পাঠানোর এক উচ্চাশা নিয়েই তারা নৌযানে ওঠে। ইথিওপিয়া থেকে জিবুতির পর্বতমালার পেছনেই আদম পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য। সেখানে অপেক্ষায় থাকে তারা। সেখান থেকে সবচেয়ে কাছে ইয়েমেনের বাব আল মানদাব। নৌযানে খুব সহজে ও অল্প সময়েই যাওয়া যায় সেখানে। পাচারকারীরা আগ্রহীদের সৌদি আরব নেয়ার কথা বললেও বাব আল মানদাবেই রেখে আসে তাদের। এমনই এক হতভাগ্য ২৩ বছর বয়সী হাফটন। ইথিওপিয়ার বেশ কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে সে পাড়ি জমিয়েছিলো লোহিত সাগরে। কিন্তু ইয়েমেনে যাওয়া মাত্রই যথারীতি অপহূত হয় তারা। অপহরণকারীরা দাবি করে মুক্তিপণ। হাফটনের পরিবার তাদের সব কিছু বিক্রি করে অপহরণকারীদের তিনশ’ মার্কিন ডলার দেয়। কিন্তু অপহরণকারীরা হাফটনকে না ছেড়ে তাকে বিক্রি করে দেয় সেই ইট-কাদা মাটির টর্চার ক্যাম্পে। নতুন এই গ্রুপটি এবার আরো আড়াইশ’ মার্কিন ডলার দাবি করে। এরপর হাফটনের উপর নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন চালানো হয়। মেরে তার মেরুদণ্ড ও কোমর এমনভাবে ভেঙে দেয়া হয়, যাতে সে উঠে দাঁড়াতে এমনকি বসার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। সে পুরোপুরিই প্যারালাইজড হয়ে যায়। একদিন সুযোগ বুঝে হাফটনের বন্ধুরা তাকে কাঁধে করে নিয়ে পালিয়ে যায়। আশ্রয় নেয় হারাধের শরণার্থী শিবিরে। নিঃসন্দেহে এটা একটা বিরাট ঝুঁকি। কারণ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নির্যাতন ও ইয়েমেনি সৈন্যদের দাপট সেখান থেকে সৌদি সীমান্ত পর্যন্ত গোটা পাঁচশ’ কিলোমিটার ধরে বিস্তৃত। মেডিসিনস স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স নামের দাতব্য সংস্থার মতে, ঐ এলাকায় দুই শতাধিক নির্যাতন ক্যাম্প রয়েছে। সমস্যার সমাধানে কাজ শুরু করেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা ও ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিটারিয়ান ক্রাইসিস। সম্প্রতি তাদের সহযোগিতায় এমনই এক টর্চার ক্যাম্প ঘুরে দেখেন বিবিসির সাংবাদিক ইয়ালদা হাকিম। বেশ কয়েকজন অভিবাসীকে জিম্মি অবস্থাতেও দেখতে পান তিনি। তাদের পাহারা দিচ্ছে সশস্ত্র কয়েকজন। গোটা এলাকায় শক্ত রাজত্ব মাদকসেবী, পাচারকারী ও সন্ত্রাসীদের। এর সাথে যোগ হয়েছে প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্র ইয়েমেনের দুর্বল শাসন ব্যবস্থা। জঙ্গিদের দুই গ্রুপের সাথেও অবিরত যুদ্ধ করতে হচ্ছে সে দেশের সরকারকে, যার ফলে লাখ লাখ মানুষ এখন গৃহহীন।