ডব্লিউএলটি-র প্রতিবেদন

আমাদের ইংরেজি সাহিত্য

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০১৩, ১৯:৩৯
বিশ্ববিশ্রুত সাহিত্য পত্রিকা World Literature Today-এর মে-জুন ২০১৩ সংখ্যায় রক্তলাল বাংলাদেশের মানচিত্রের পুরোটা জুড়ে গ্রাম্য অযত্নলালিত শ্রম-মলিন একটি কিশোর হাত প্রাণবন্ত বাঙ্ময়তায় চিত্রিত রয়েছে। পত্রিকাটির ৪৩ নং পৃষ্ঠার এই হাতের দিকে তাকালে যেকোনো বাংলাদেশির বুকের ভেতরটা একটু হলেও নড়েচড়ে উঠবে এবং সে নেড়েচেড়ে দেখতে চাইবে, এই হাতের নিচে কী ঢাকা রয়েছে। দেখতে চাইবে ৪৩ নং পৃষ্ঠার নিচে পরের পৃষ্ঠাগুলোয় এই হাতের তলে চাপা পড়ে আছে কী কথা- কী গাথা। উত্সুক পাঠক হিসেবে আমি সে কথা ও গাথা খুঁজতে গিয়ে সে হাতের নিচে গ্রথিত দেখেছি বাংলাদেশের বর্তমান ইংরেজি সাহিত্যের একটি ক্ষুদ্র কথাচিত্র। দেখেছি অনেকের অলক্ষে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের ইংরেজি সাহিত্য ঐশ্বর্যের একটি আভাস। এ কথাচিত্রে Molossus পত্রিকার সম্পাদক লসএঞ্জেলেস নিবাসী ডেভিড শুক বাংলাদেশের আজকের সাহিত্য ঐশ্বর্যের ইংরেজি অংশকে এক সংক্ষিপ্ত প্রতিনিধিত্বশীল বর্ণনায় বিশ্বব্যাপী অগণিত পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন। এ বর্ণনায় রয়েছে ডেভিড শুকের অনুধ্যানী মন্তব্য সংবলিত ছোট একটি ভূমিকা যার শিরোনাম Bangladesh on the World Stage। এরপরে রয়েছে Red Shift নামক ঢাকাস্থ এক কফিশপে ডেভিড শুক (David Shook) কর্তৃক গৃহীত বাংলাদেশি চার ইংরেজি লেখকের এক আনন্দঘন ও ভাবনা উদ্দীপিত সাক্ষাত্কার। সাক্ষাত্কার শেষে রয়েছে সাক্ষাত্কারদাতাগণের অন্যতম কাজী আনিস আহমেদ-এর একটি উপন্যাস থেকে নির্বাচিত একটি অংশ। The World in My Hands শিরোনামে রয়েছে সুদীপ্তা চাকমা মিকাদো-র চাকমা ভাষায় লিখিত দুটি কবিতার ইংরেজি অনুবাদ এবং এছাড়াও রয়েছে হংকং নিবাসী বাংলাদেশি ইংরেজি লেখক মারিয়া চৌধুরীর আলঙ্কারিক ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত স্মৃতিচারণমূলক লেখা The Three Stages of Separation. Opening Bangladesh to the World শিরোনামে চারজন সাড়া জাগানো বাংলাদেশি ইংরেজি লেখক তাহমিনা আনাম, ফারাহ গজনভী, মাহমুদ রহমান ও কে. আনিস আহমেদ-এর সাক্ষাত্কারে উঠে এসেছে বাংলাদেশি ইংরেজি লেখা ও লেখকের অনেক প্রসঙ্গ। তাঁদের অধ্যয়ন, বোধ ও বাস্তবতার অনুধ্যান সঞ্জাত বিভিন্ন মন্তব্য ও মতামতের মধ্য দিয়ে পাঠক ১৯৫০ দশক থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত বাংলাদেশের ইংরেজি সাহিত্যের গতি ও প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন ও ওয়াকিবহাল হয়ে উঠবেন বলে আমার বিশ্বাস। প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে আসা অনেক তথ্য আমাদের যথারীতি সচকিত করে তোলে। আমরা জেনে ফেলি ইংল্যান্ডের বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা Granta পাকিস্তান সংস্করণে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হতো। বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হকের নিজের মুখের উদ্ধৃতি থেকে শোনা যায় যে, একটি ইংরেজি বই পড়তে তাঁর এমনকি এক বছরও লেগে যেত তারপরও ইংরেজি পাঠ তিনি চালিয়ে যেতে থাকেন। তাঁর উপন্যাস ‘অনুর পাঠশালা’ লিখতে ১৯৬৫ সালে New Yorker-এ প্রকাশিত একটি লেখা (Deja Vu) থেকে তিনি ভাব আহরণ করেছিলেন মর্মে তিনি নিজে জানিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘জীবন আমার বোন’-এর নামটি তিনি পাস্তেরনাকের ‘Sister My Life’ শীর্ষক কবিতা থেকে গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাসাহিত্য চর্চাকারীগণ একটিমাত্র ভাষায় পঠনপাঠন সীমিত করে ফেলায় ও ফলস্বরূপ এক ধরনের অন্তরকের মাঝে আটকে যাওয়ায় বিশ্বসাহিত্যের সাথে তাদের দূরত্ব বাড়ছে, যা মোচনে সচেতনতা ও সচেতন প্রয়াস প্রয়োজন মর্মে সাক্ষাত্কারের সাহিত্যিকগণ গভীর উপলব্ধি ব্যক্ত করেছেন। এই অন্তরক (insularity) আমাদের অনুবাদ সাহিত্যকে দিন দিন দুর্বল করে দিচ্ছে মর্মেও তাঁরা শঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। এই উপলব্ধি ও শঙ্কা থেকে তাঁরা আনন্দিত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন এই প্রত্যাশা যে, ঢাকায় অনুষ্ঠিত Hay Festival স্থায়ী হোক এবং এটা প্রতি বছর পুনরাবর্তিত হোক। কেননা Hay Festival আর্ন্তজাতিকভাবে লেখক-প্রকাশকের একটি মিলনমেলার সুযোগ ও ক্ষেত্র তৈরি করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, তাহমিমা আনাম ও সাদাফ সাজ সিদ্দিকির প্রচেষ্টায় দুই বছর ধরে ঢাকায় এই ফেস্টিভাল আয়োজিত হচ্ছে। ২০১২ সালের এ উত্সবে ব্রিটিশ কাউন্সিলের আয়োজনে ইংরেজ লেখকদের একটি দল যোগদান করেছিলেন। তাহমিমা আনাম উল্লেখ করেন যে, ২০১২ সালের মেলাটি যথেষ্ট প্রাণবন্ত ও আশাপ্রদ রূপ পেয়েছিল। তাহমিমা আনামের ভাষ্যমতে, কিছু পুস্তক বিক্রেতা দুই দিনে এই পরিমাণ বই বিক্রি করেছিলেন যা সারা বছরে তারা করতে পারেন না। আন্তর্জাতিক প্রকাশক ব্লুমসবেরির সাথে বাংলাদেশি ইংরেজি লেখক খাদেমুল ইসলামের বই প্রকাশ বিষয়ে এই মেলায়ই চুক্তি সই হয়েছিল। Hay Festival-এর আন্তর্জাতিক আয়োজকরা পর্যন্ত চমকে গিয়েছিলেন যখন তারা দেখলেন, মাত্র দুই বছরের বয়ক্রমে বাংলাদেশে এই মেলাটি কী অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। মেলায় অংশগ্রহণকারীদের আবেগ ও আন্তরিকতায় আপ্লুত তাহমিমা আনাম উচ্ছ্বাসের সাথে উল্লেখ করেছেন—The fact is, the real truth is, that the women have performed really exceptionally. There were a lot of subjects that were discussed openly that people thought, Oh, you would never in Bangladesh have a literary panel with a big audience talking about sex, talking about, you know, sexuality. All of these were ... thrilling. ডেভিড শুকের বাংলাদেশি ইংরেজি লেখকগণের এই সাক্ষাত্কার গ্রন্থনার পরেই রয়েছে কাজী আনিস আহমেদ-এর একটি অগ্রসরমান উপন্যাসের খানিক অংশ। হয়তো একটি অধ্যায়। শিরোনাম The World in My Hands। গল্পাংশের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ পড়ে মনে পড়ল লাতিন আমেরিকান একজন লেখকের উপন্যাসের ভূমিকায় লিখিত Susan Sontag-এর একটি বিখ্যাত বাক্য—‘বইয়ের প্রথক বাক্য পড়লেই বুঝবেন আপনি একজন ওস্তাদ গল্পওয়ালার হাতে পড়েছেন’। কাজী আনিস আহমেদের The World in My Hands শীর্ষক গল্পের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ পর্যন্ত পড়ে Susan Sontag-এর অনুকরণে বলা অন্যায় হবে না যে, এ গল্পের পাঠকও শুরুতেই অনুভব করবেন, তিনি একজন ওস্তাদ গল্পওয়ালার হাতে পড়েছেন। গল্পের স্থানভিত্তিকে (Setting) চরিত্র ও চারিত্র্যের সাথে বেঁধে দিয়ে লেখক প্রারম্ভিকায়ই পাঠককে সচকিত করছেন : This fundamental lack of foundation worried Hissam. Could one possess strength without a solid base to stand on? যে প্রশ্নে এ সচকিতকরণ তার ওপরে ধীরে ধীরে দাঁড়াচ্ছে গল্পের বিষয়ভাবনা—পান্ডুয়ার অর্থাত্ অন্তঃনামে বাংলাদেশের ভূকেন্দ্রে শক্ত শিলাভিত্তির যে অভাবের কথা বলা হয়েছে রূপক আঙ্গিকে, সে অভাব দিনে দিনে শিকড়ে দুর্বল করে দিচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, মানবতা, ধর্ম ইত্যাকার মৌলিক সত্তাসমূহের বুনিয়াদ। গল্পের এই বিষয়-ভাবনাকে এগিয়ে নিচ্ছে পত্রিকার সম্পাদক হিসাম, আর্মি অফিসার বখতিয়ারসহ গল্পের তাবত্ কুশীলব। সাংবাদিকতার দর্শন যেখানে রাষ্ট্রের ভুলগুলো দেখিয়ে দিয়ে চলার পথকে প্রতিনিয়ত সঠিক গন্তব্যে চালনায় নির্মোহ সহযোগিতা করা, সেখানে এ গল্পে চিত্রিত সাংবাদিকতা জগতের প্রতিনিধি সিয়ামের কাজ দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রকে ভুলপথে চালনায় সহযোগিতা করে রাষ্ট্রকে কাজে লাগিয়ে আত্মলোভ চরিতার্থকরণ। রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর সর্বোচ্চ এজেন্সি আর্মির নিষ্ঠা ও সততা ধসে গিয়ে সেখানে কীভাবে জেগেছে যা-খুশি করার বাসনা সেই কাহিনি চিত্রণের গল্প The World in My Hands। ধ্বংস ও অবক্ষয়ের এই গল্পে লেখক বাংলাদেশের একটি চিহ্নায়নযোগ্য সময়কে নির্ভীক চরিত্র ও কথনে উপস্থাপন করেছেন। চরিত্র, কাহিনি, স্থান-প্রতিবেশ বিষয়ভাবনা ইত্যাকার গল্পের সকল আঙ্গিক ও প্রকরণকে একবিন্দুতে সার্থক মিলন ঘটিয়ে কাজী আনিস আহমেদ গল্পায়নে পাকা ওস্তাদির স্বাক্ষর রেখেছেন। হংকং নিবাসী বাংলাদেশি ইংরেজি লেখক মারিয়া চৌধুরীর The Three Stages of Separation স্মৃতিকথার ফর্মে এমনই এক অন্তর্ভেদী কাহিনি। প্রবাসী এক লেখক মাতা-মাতৃভূমি থেকে তার ছিন্ন হওয়ার ঘটনা-ধারাকে তিন পর্বে দেখিয়েছেন। প্রথম পর্বে রূপকে হলেও অনেক আবেগঋদ্ধরূপে লেখক লিখেছেন ভূমিষ্ঠকালীন মায়ের শরীর থেকে নাড়ি কেটে ছিন্ন হওয়ার কাহিনি। পরের পর্বে রয়েছে কল্পনায় দেশ ছেড়ে আমোরিকা-কানাডার মতো স্বপ্নরাজ্যে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন যা আদম ও হাওয়ার মতো স্বর্গ থেকে ছিন্ন হওয়ার পাপস্পর্শী এক চিরন্তন ট্রাজেডির কাহিনি। তৃতীয় পর্বে রয়েছে ছিন্ন হওয়া স্বর্গে আর ফিরে আসতে না পারার এক আজীবন অভিশাপের কাহিনি। রূপকে ব্যঞ্জনায় বিচ্ছিন্ন হওয়ার তিনটি স্তরই মারিয়ায় বর্ণনায় মর্মস্পর্শী ও এক গভীর চেতনার দ্যোতক। সুদীপ্তা চাকমা মিকাদো-র চাকমা ভাষায় লিখিত সহজ উচ্চারণের কবিতা দুটিও সহজ কাব্যভঙ্গিতে মর্মস্পর্শী ব্যথার কথা বলে। WLT-র মে-জুন ২০১৩ সংখ্যা এভাবে প্রচ্ছদ-কাহিনির গুরুত্বে তুলে ধরেছে বাংলাদেশের এ প্রজন্মের ইংরেজি লেখকদের বর্ণনায় বাংলাদেশের আনন্দ-দুঃখের এমন আপন গোপন কিছু কথা। এ কথা বাংলাদেশের অন্তহীন কথার ও অজস্র আনন্দ-কান্নার নিংড়ানো দুফোঁটা মাত্র। তবে সে দুফোঁটায় ইংরেজি ভাষা-মাধ্যমে বিম্বিত হয়েছে দুনিয়ায় অজস্র পাঠকের কাছে আমাদের সবুজ বাংলাদেশের হলুদ বেদনাগুলো ও সবুজ চেতনাগুলো পৌঁছে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী প্রত্যাশাময় এক প্রয়াস। এ প্রয়াসের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক অভিনন্দন ও অজস্র সাধুবাদ।