সেই ভোরবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল একরাম আলি। তখনো মহেষগৌরিতে শেষ রাত্তিরের অন্ধকার, সুনসান নীরবতা। ভালো করে কাকপক্ষীও জাগেনি (যদিও গ্রামটিতে আগের মতো আর কাকপক্ষী নেই)। গ্রামবাসীর ঘুম ভাঙতে আরও কিছু সময় লাগবে। একরাম আলির তাড়া আছে। কেননা দেরি হয়ে গেলে, তখন আর মাছ পাওয়া যাবে না। আজকাল প্রায়ই এ রকম ঘটনা ঘটছে। মাছের চেয়ে চরিয়া বেশি, জেলেরা যে মাছ নিয়ে বিলের পাড়ে উঠে আসে—তা এক থাবাতেই শেষ হয়ে যায়। ক্রেতা বেশি হয় বলে তার মতো অনেকেরই মাছ কেনা হয় না। আর মাছ কিনতে না পারার অর্থ হচ্ছে, ঘরের চুলোয় হাঁড়ি চড়ানোতে টানাটানি। একরাম আলির এমন কোনো সম্পদ বা সঞ্চয় নেই—যাতে দু-একদিন রুজিরোজগার না করলেও কোনো সমস্যা হবে না।
আগে এটা নিয়ে ভাবত না একরাম আলি। তার বাবা সোরাব আলি, সেও হয়তো ভাবত না—দুঃসময়ের জন্য কিছু সঞ্চয় করে রাখতে হবে এটা মহেষগৌরির অনেকেই ভাবত না। দরকারও পড়েনি। তারা হাওরের পাড়ে বড় হয়েছে। জলভরা হাওর, সেই হাওরে যেন তাদের জন্য বাঁচার উপকরণ অপেক্ষা করে থাকত—জলের বুকে হাত ডোবালেই মাছ উঠে এসেছে। এত মাছ, সব মাছ ধরা হতো না—তখন পছন্দমতো মাছ ধরা হতো। যে মাছ খেতে ভালো, যে মাছের বাজারকাটতি আছে, তারা কেবল সেই মাছটিই ধরেছে। এটা সোরাব আলির মুখ থেকে শোনা, শুধু শোনা বলা ঠিক হবে না—একরাম আলি নিজেও এ রকম অবস্থা দেখেছে।
বর্ষায় হাওরের ঢেউ মহেষগৌরির বাড়িঘরের বেড়া ও উঠোনে এসে আছড়ে পড়ত। তখন ঘরের আশপাশ, খাল-নালায় লাফালাফি করেছে মাছ। বৈশাখ মাসে যখন নতুন পানির ঢল নামত হাওরে, সে সময় অনেক রকম মাছ ভেসে বেড়াত, যার সবটাই তারা ধরত না। সবার চোখ থাকত বিরাট বিরাট বোয়াল মাছের দিকে। তাই ধরত তারা। সোরাব আলি বলত, ‘বুঝছ, একেকটা বোয়াল ছিল মাইনষের মতন লম্বা।’ পুরো বর্ষায় আশপাশের কাউকে মাছ কিনে খেতে হয়নি। একরাম আলিরা মাছ ধরে দূরের বিভিন্ন হাট-বাজারে নিয়ে গেছে। তা বিক্রি করে যা পেয়েছে, তাতে তেল-নুন, চাল-সবজি কিনে ঘরে ফিরেছে। এর বাইরে তো বছরে এক-দুইবার বউ-ঝিদের জন্য শাড়ি-কাপড়, ছেলেদের লুঙ্গি শার্ট—তাদের চাওয়াটাও যে এত কম, তাদের কোনো সমস্যা হয়নি।
একরাম আলির মনে পড়ে, হাওর থেকে যখন বর্ষার পানি নেমে গেছে, তখনো বিল-বাদাড়ে মাছ ছিল। আর হাওরভরা ছিল তো গাছের জঙ্গল। করস, হিজল, বরুণ, শ্যাওড়া, বেতঝোঁপ, শতমূলি... একরাম আলি আর কয়টা গাছ চিনত। শুকনো মৌসুমে তাই এ সকল জঙ্গলে উদোম গরু-মহিষ ছেড়ে দিত মহেষগৌরির মানুষ। খোঁজও নিত না। গরু-মহিষ ঘুরে বেরিয়েছে। ইচ্ছামতো সবুজ ঘাস চিবিয়েছে। সোরাব আলি বলত, ‘রাইতের বেলা ঝোপ-ঝাড়েই ঘুমাই থাকত গরু-মইষ।’ হাওরে পানি বাড়ার আগ পর্যন্ত গরু-মহিষগুলোর অবাধ বিচরণ ছিল সেখানে। অনেক গরু মহিষ নাকি একা একাই সেখানে বাচ্চা বিইয়েছে, তিন-চার মাসের বাচ্চা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে।
শুধু সোরাব আলির মুখ থেকেই এ রকম কথা শোনেনি একরাম আলি। একরাম আলি তো নিজেও তার অনেককিছু দেখেছে। প্রয়োজন হলে সে নিজেই জল-জংলার ভূমি থেকে জগ দিয়ে গাভির দুধ দোহন করে নিয়ে এসেছে। কার গাভি, কার গরু—কে আর এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়েছে। শাপলা-শালুক, হিংরাই, মাখনা—কত রকমের জলেভাসা, বিলভরা ফুল-ফল, একরাম আলি চিনত তো এগুলোই। এর বাইরে আরও কতকিছু ছিল, এখন আর অনেকটাই চোখে পড়ে না। হাওরে ঘুরতে ঘুরতে পেটে ভুখ লাগলে মাখনার বীচি বের করে খেয়েছে, ভেট খেয়েছে, হিংরাইর খোসা ছাড়িয়ে শাঁস খেয়েছে।
এ রকম একটা সাম্রাজ্যে না সোরাব আলি, না একরাম আলি—কারোরই তো বাড়তি কিছু ভাবার ছিল না। একরাম আলিরা ভাইবোন মিলে হইচই করে এমন একটা সময়েই বেড়ে ওঠেছে। সোরাব আলি বলত, ‘হাত-পা থাকলে আর ভাবনার কিছু নাই, বুঝছো। শুধু চরিয়া খাইতে জানলেই বাঁচবা।’
কাল রাতে যখন একরাম আলি অন্ধকারে পাকা সড়ক ধরে কাঁধে চাঙরা ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরছিল—মহেষগৌরির কবরস্থানের কাছে আসতেই হঠাত্ করে তার খুব করে বাবার কথা মনে হয়। বাবার মৃত্যুর আগেই কেমন করে সেই নির্ভাবনার জায়গাটা নড়ে উঠেছিল, সবকিছু বদলে যেতে শুরু করেছিল। বাবার সরল-সোজা মুখটা ভেসে ওঠে চোখের সামনে।
তারা কেউ ঠিক বুঝতে পারছিল না, কোথায় কী ঘটছে। হাওরটা কেমন যেন বিমুখ করছিল তাদের। মহেষগৌরিতে একটা ভয় ঢুকে যায়। মানুষ মুখে কিছু বলে না, তবে যে মানুষগুলো কেমন গা-ছাড়া ভাব নিয়ে এত দিন বিলপাড়ে, করস গাছের ছায়ায় বসে তাস খেলত, চরের ঘাসে হা-ডু-ডু, কাবাডি খেলা নিয়ে মেতে থাকত—সেই পরিচিত দৃশ্যগুলো দ্রুত হারিয়ে যেতে থাকে। একরাম আলিরা কেমন হোঁচট খায়। চাইলেই এখন আর জলের শরীর ঘেঁটে মাছ পাওয়া যায় না। হাওরের জল কেমন পর হতে থাকে। চোখের সামনে থেকে করস, হিজল হারিয়ে যায়, শাপলা পদ্মপাতা আগের মতো জলের বুকে ভাসে না। হাজার হাজার পাখির ভিড় ছিল যেখানে, সেই পাখির কিচিরমিচির আর নেই। একরাম আলি মাঝেমধ্যে বলে, ‘একটা জীবনও শেষ করতে পারি নাই। সবকিছু কেমন জানি আউলাই-ঝাউলাই গেল।’
ততক্ষণে আকাশ বেশ ফরসা হয়ে গেছে। একরাম আলি খালি চাঙরা নিয়ে হাঁটতে আছে। সকালটা ঝকঝকে হবার আগেই তাকে হিংরাজুলি বিলের কাছে যেতে হবে। সকালবেলা জাল টেনে এনে বিলের পাড়ের কাছে ভেড়াবে জেলেরা। তখন নৌকা থেকে মাছ পাড়ে নামানো হবে। তারপর শুরু হবে নিলাম ডাক। সে সময় নিলামে অংশ নিতে না পারলে আর মাছ পাওয়া যাবে না। হাঁটতে হাঁটতে বেশ ভুক টের পায় একরাম আলি। একবার ইচ্ছা করে কোথাও বসে খাওয়াটা সেরে নেয়।
সেই অন্ধকার থাকতেই একরাম আলির বউ জমিলা বেগম তার জন্য রান্নাবান্না করে গরম ভাত, গরম তরকারি একটা প্লাস্টিকের বাক্সে ভরে দিয়েছে। জমিলা বেগম জানে মহেষগৌরি থেকে বিলে আসা-যাওয়া করতে কম করেও একরাম আলিকে ১০-১৫ মাইল হাঁটতে হবে। এর মধ্যে খালি ধূ ধূ প্রান্তর। চাইলেই কোথাও কিছু কিনে খাওয়ার মিলবে না।
একরাম আলি চাঙরার ভেতর গরম ভাত-তরকারির অস্তিত্ব টের পাচ্ছিল। তার নাকে এসেও যেন সেই ভাত-তরকারির ভাঁপ এসে লাগছে। কিন্তু তার পা থামছে না। খাওয়া দাওয়া করতে যে সময়টুকু লাগবে, তা নষ্ট করার মতো সময় তার নেই। যত দ্রুত হিংরাজুলি বিলের পাড়ে পৌঁছাবে, ততই তার জন্য স্বস্তি। কাল রাতে হাট থেকে ফেরার পথে অন্যদের কাছেও আজ হিংরাজুলিতে মাছ মারা হবে বলে শুনেছে। তার আর ভাত খাওয়া হয় না। সে হাঁটতে থাকে। সূর্য বেশ তেজ দেখায় তখন। ভোরবেলা যখন বের হয়েছিল, সেসময় বেশ ঠান্ডা ছিল। এখন সূর্যের তেজ বাড়ায়, অথবা হাঁটার জন্য হয়তো বেশ গরম লাগে—গায়ের চাদরটা খুলে চাঙরার ওপর রেখে দেয় একরাম আলি।
একরাম আলি এতক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে পায়েচলা দাঁড়া দিয়ে হাঁটছিল—এখন সে অকারণ মাথা তুলে ওপর দিকে তাকায়। হঠাত্ যেন তার কাছে সবকিছু ফাঁকা ফাঁকা লাগে। তার মনে হয়, বহুদিন পর যেন সে এমন করে আকাশ বা ওপরের দিকে তাকাল। তার মনে হয়, এত শূন্যতা সে অনেকদিন টের পায়নি। তার আশপাশে কোনো গাছপালা চোখে পড়ে না। অনেক দূরে একটা করস গাছ একা, নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে। একরাম আলির বয়স কত! ৪০-৫০। এ রকমই হবে হয়তো। বয়স তো আর কেউ কাগজে-কলমে লিখে রাখেনি। সে এই করস গাছটা তার বুঝ হওয়ার পর থেকে দেখে আসছে। শুধু কি এই গাছ, একরাম আলির চোখের সামনে সবুজ পাতায় ঠাসা ঝাঁকড়া মাথার অনেক অনেক করস গাছ যেন এখন হালকা শীতমাখা বাতাসে দোল খেতে থাকে।
একরাম আলির মনে হতে থাকে, তার বাবা সোরাব আলি যেমন তাদেরকে হাওরের বুকভরা মাছ, ফুল-ফল, আর গভীর জঙ্গলের কথা বলত, আর সে বলার মধ্যেই সবকিছু সীমাবদ্ধ ছিল না—সে নিজের চোখেও সেই জলজংলা দেখেছে, মাছ দেখেছে। সেও এখন তার ছেলেমেয়েকে সেই জংলা, আর মাছভরা জলের কথা বলবে। কিন্তু এই একটা করস গাছ দেখানো ছাড়া আর কোনো প্রমাণ তাদের সামনে তুলে ধরতে পারবে না। একরাম আলির খুব কষ্ট হতে থাকে। মহেষগৌরিতে এখন পাকা সড়ক এসেছে, অনেক রকম বদল হয়েছে। কিন্তু সে বুঝতে পারে না—এই হাওর মানুষের মুখে যে খাদ্য তুলে দিয়েছে, এখন মানুষ বাড়লেও সে খাদ্য তো এখন আর সহজে পাবার উপায় নেই।
একরাম আলি গভীর রাতে বাড়ি ফেরে। ছেলেমেয়েরা তখন ঘুমেই থাকে। সে ফেরার আগে বউ জমিলা বেগম এক ঘুম দিয়ে ফেলে। কিন্তু ঘুমালে কি হয়, একরাম আলি বাড়ি ফিরলে তার পায়ের শব্দেই বেশিরভাগ রাতে সে জেগে ওঠে। কদাচিত্ দরজায় ধাক্কা দিতে হয় একরাম আলিকে। বাচ্চাদের সাথে তার দেখা হয় মূলত সে যেদিন কোনো কারণে বাড়ি থাকে, বা বাড়ি থেকে বের হতে দেরি করে, সেদিন। অথবা রাতের বেলা বাড়ি ফেরার মুহূর্ত পর্যন্ত যদি বাচ্চারা জেগে থাকে।
কাল রাতে জমিলা বেগম যখন তার সামনে ভাত বেড়ে বসে থাকে, কুপিবাতির ম্যাড়মেড়ে আলোয় জমিলা বেগমের তামাটে মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়েছিল, অনেকদিন সে জমিলা বেগমকে চোখ তুলে দেখেনি। হাওরের বুকে গেলে মাঝেমধ্যে যখন আকাশে টুকরো টুকরো মেঘ ভেসে আসে, জমিলা বেগমের চোখেমুখে এমন অসংখ্য টুকরো টুকরো সচল মেঘ। তখন এ-ও মনে পড়ছিল, কতকাল যেন সে এই মেঘমাখা আকাশকে ছুঁয়ে দেখেনি। কেবল এক বিরান ভূমি দিয়ে সে হেঁটে চলছে। তার চোখের সামনে শুধু মাছের শরীর, চাল-ডাল-তেল-নুন-আনাজপাতি...। এর বাইরে আর কিছু নেই। একরাম আলি কেমন আলুথালু হয়ে যায়, তার বুকের ভেতর এখন বৈশাখে শিলা-পাথরের আঘাত থেকে পাকা বোরো ধান বাঁচাতে এক মেঘতাড়ানো হিরাল উলঙ্গ হয়ে নৃত্য করছে। তার আর অন্য কোনো দিকে নজর দেবার সুযোগ নেই। জমিলা বেগমের চোখ-মুখের মেঘ তাড়াবার আবেগ এখন তাকে প্রবলভাবে তছনছ করে। একরাম আলি খাওয়া শেষ করে গ্যাস লাইটার জ্বেলে লকলক আগুনের শিখায় কাগজের বিড়ি ধরায়। জমিলা বেগম ততক্ষণে খাওয়া শেষ করে, বাসনকোসন ঘষেমেজে, ঘুচিয়ে চৌকিতে একরাম আলির পাশে এসে বসে। একরাম আলি জমিলা বেগমের কাঁধে হাত রাখে, অবাক হয় জমিলা বেগম। কত বছর যেন এমন শক্ত, খসখসে হাত তাকে স্পর্শ করেনি। জমিলা বেগম বুঝতে পারেনা, একরাম আলির হলোটা কী!
একরাম আলি হাতের বিড়িটা মেঝের মাটিতে ফেলে দেয়। —‘বউ, কেমনে বাঁচি রে। এখন তো বিলঝিল সব ভরাট অই যায়। শুকাই যায়। মাছ নাই। যা আয়-রোজগার। তাতে তো দুই বেলার ভাতই জুটানো মুশকিল।’
জমিলা বেগম শূন্য চোখ মেলে একরাম আলির দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু কুপির ম্লান ঘোলাটে আলোয় একরাম আলি সে চোখ দেখতে পায় না। কিংবা দেখলেও হয়তো এর কোনো আলাদা পাঠ সে নিতে পারে না। একরাম আলি জমিলা বেগমকে বুকের কাছে টেনে নেয়, হাতের মুঠোয় কুমোরের মাটি ঢলার মতো পিষতে থাকে। জমিলা বেগমের শরীর থেকে রুই মাছের খোসা ছাড়ানোর মতো শাড়ি খোলে, পেটিকোট খোলে। বহু দিন পর বিলের বুকে যেন মাছ ধরার প্রবল উল্লাস সে খোঁজে পায়। জমিলা বেগমের শরীরের কাদা খুঁড়ে সে জিওল মাছ খুঁজতে থাকে, ধরতে থাকে। অথবা এক প্রবল শূন্যতায় সে সাঁতার কাটতে থাকে।
সবকিছু ছাপিয়ে শূন্যতার কথা, এই শূন্য ভূমির বুকে রাতটার কথা তার এখন খুব মনে পড়ে। যেখানে জীবন থেকেও নেই, যেখানে জীবন নতুন জলের মাছের মতো বাঁধনহারা উল্লাসে লাফাতে পারে না। জমিলা বেগমের বুকের মধ্যে থেকেও তার মনে হয়েছে, গভীর শূন্যতা সেখানে হাহাকার করে হাওর পেরিয়ে চলছে। এ রকম একটা জীবনের কী অর্থ আছে, তা খুঁজে পায় না সে।
ততক্ষণে সে হিংরাজুলি বিলের কাছে চলে এসেছে। সে দেখে যে, হিংরাজুলি বিলের পাড় তখন চরিয়ায় ভরে গেছে। শুধু মহেষগৌরি না, শংকরখাল, হাওয়াপুর, হাওরপাড়ের অনেক গ্রাম থেকেই চরিয়ারা এসেছে। এদের অনেককেই তো সে চেনে, একসাথে তারা হাঁটে হাঁটে মাছ বেচতে যায়। তার চোখের সামনে এই মুখগুলো পাতাঝরা হিজলের ডালের মতো মনে হতে থাকে। হাওর যেমন করে বুক খালি করছে, এই মানুষগুলো সামনের দিনগুলোতে কেমন করে চলবে। তার ঘরে যে জমিলা বেগম আছে, তিনটা ছেলেমেয়ে আছে এবং তারা মহেষগৌরিতে তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে। একরাম আলি এসব কথা, তার নিজের কথা ভুলে যায়। এই মানুষগুলোর মুখ তার চোখের সামনে বড় হতে থাকে। সে তার আগেও যে অনেকে ছুটে আসে, তার জন্য অবাক হয় না। সে তো এত দিনে জেনে গেছে, তার যেমন ভুক লাগে—অন্যদেরও সমান ভুক।
একরাম আলি বিলের পাড়ে এসে বসে। সে দেখে যে, জাল টেনে মাত্র নৌকায় তোলা হচ্ছে। মাছ নিয়ে নৌকা পাড়ে আসতে বা নৌকা থেকে পাড়ে মাছ নামাতে আরও কিছু সময় লাগবে। সে ভিড় থেকে একটু দূরে গিয়ে ঘাসের ওপর বসে। সে একটু ছায়ামতো জায়গা খোঁজে। কিন্তু আশপাশে একটি গাছও নেই। না হিজল, না জারুল, না করস...। সে চাঙরা থেকে ভাত বের করে খাওয়ায় মনযোগ দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে মাছের নিলাম ডাক শুরু হবে। তখন আর খাওয়ার ফুরসত পাওয়া যাবে না। মাছ কেনা হলে আরেক তাড়া। কত দ্রুত তা নিয়ে হাটে যাবে—দ্রুত না পৌঁছালে মাছ যদি নষ্ট হয়ে যায়। মাছ দূরের বাজারে নিয়ে যেতে হলে বরফ দিতে হবে। মাথার মধ্যে দারকিনা মাছের মতো অনেককিছু কিলবিল করে।
শংকরখালের ফজলুদ্দি তার কাছঘেঁষে বসে। বলে, ‘বউর হাতর রান্না না খাইলে বুঝি পেট ভরে না।’
একরাম আলি হাসে। ‘সেই ফজরের সময় রওয়ানা দিছি। বুঝছ না, তখন খাইয়া আইলে তো এখন ভুক লাগত।’
ফজলুদ্দি বলে, ‘আইয়াই কী লাভ। মাছের যা অবস্থা। মনে অয় না আইজ মাছ কিনা যাইব।’ কথাটা ছ্যাত করে লাগে একরাম আলির বুকে। সূর্যের গোলকটা সুড়ুত্ করে যেন তার বুকের মধ্যে ঢুকে যায়। সূর্য ঢোকার এই ঘটনা ফজলুদ্দি তো নয়ই, দুনিয়ার আর কেউই টের পাবে না। হাতে ভাতের লোকমা নিয়ে একরাম আলি ফজলুদ্দির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘এইভাবে কেমনে চলি। আমরার তো আর কিছু করার নাই। হাওর থাকি গাছ গেছে। পাখি গেছে। মাছও যদি খালি অয়। বউ-ছাওয়াল নিয়ে বাঁচি কেমনে।’
ফজলুদ্দি যেন এবার কথা বলার তোড়ে ভাসে। ‘দেখলে তো, এখন বারিষা মাসেও হাওরে পানি থাকে না। আগে বারিষা মাসে ঘরবাড়িত পানি উঠছে। ভাসান পানি ছাড়া মাছ ডিম পারব কেমনে। বিল ভরি গেছে। সবকিছু কেমন বদলাই যায়।’
একরাম আলি টের পায়, ফজলুদ্দির বুকেও এখন শূন্যতার ঘূর্ণিবাত্যা। ফজলুদ্দি উঠে ভিড়ের দিকে হাঁটতে থাকে। একরাম আলি খাওয়া সেরে একটা বিড়ি ধরিয়ে ফুঁকতে থাকে। বিড়িতে টান দেয়, আর একটু একটু করে যেন সময়কে পোড়ায়, বয়সকে পোড়ায়।
খালি চাঙরা রেখে সে এলোমেলো ঘোরে। হাওরের চারপাশে অনেকটা দূরে দূরে সবুজ কালচে রেখার মতো একেকটা গ্রাম। মহেষগৌরি, হাওয়াপুর, শংকরখাল...। কত নাম। একদিন এই গ্রামগুলো বর্ষায় হাওরের আফালে দোল খেত, সোরাব আলিরা কারও বাড়ির উঠোনে চাটাই পেতে গোল হয়ে বসত, গান গাইত। গাজির গান, মারফতি, মুর্শিদি...। একরাম আলির মাথাটা ঝিমঝিম করে, কেন সে এত কথা ভাবছে। সে এসেছে মাছ কিনতে, চাঙরা বোঝাই করে মাছ নিয়ে হাটে যাবে। মাছ বিক্রি করে যা লাভ হবে, তা-ই নিয়ে চাল কিনবে, তেল-নুন-আনাজপাতি কিনবে। শীত এসেছে, ছোট মেয়েটার জন্য একটা উলের জামা কিনবে।
হিংরাজুলি বিলের পাড়ে এখন অনেক চরিয়ার হইচই। বাতাসে মাছের আঁশটে গন্ধ। মাথার উপর চিঁ চিঁ করে উড়ছে চিল। পুরো শীত নামেনি বলেই কিনা, এখনও আসেনি ভিনদেশি পাখির ঝাঁক। তবু যে একেবারে পাখি নেই, তাও না। কিচকিচ করে কিছু হাঁস এক বিল থেকে আরেক বিলে উড়ে যায়। একরাম আলি চরিয়ার ভিড়ের ভেতর চলে আসে। নৌকা থেকে মাছ নামিয়ে এনেছে জেলেরা। বেশ কটি চাঙরার মধ্যে আলাদা আলাদা করে মাছ রাখা হয়েছে।
মাছের পরিমাণ দেখেই মনটা খারাপ হয়ে যায় একরাম আলির। কত চরিয়া এসেছে, সে বুঝতে পারে না—তারপক্ষে আজ মাছ কেনা সম্ভব হবে কি না। রাতের কুপির আলোয় দেখা জমিলা বেগমের মুখ মনে পড়ে, সন্তানদের মুখ মনে পড়ে। মাছের নিলাম ডাক শুরু হতেই তার পাশে এসে দাঁড়ায় ফজলুদ্দি, মুখটা ছাইকালো হয়ে আছে। ‘মাছ কিনতে পারলাম না রে, একরাম।’
একরাম আলির বুকের ভেতর সেই ছ্যাতলাগা, সূর্যপোড়া ভাবটা ফিরে আসে। সে ভিড় ঠেলে নিলাম ডাকের স্থানে চলে যায়। কিন্তু তার আগেই চাঙরাগুলো অনেকটা কাড়াকাড়ি করে যার যার মতো দাম হেঁকে টেনে নিয়ে যায়। একরাম আলি নিলামে অংশ নিতেই পারেনি।
হাওরের সারা বুকটা এ মুহূর্তে একরাম আলির সামনে সোরাব আলির মুখ হয়ে যায়, ‘চরিয়া খাইতে জানলে বাঁচতে পারবা...।’ হঠাত্ হাঁ হাঁ করে হাসতে থাকে একরাম আলি। ভিড়টা চমকে ওঠে পলকে। সবার চোখ একরাম আলির ওপর। কী হয়েছে তার, কথা নাই বার্তা নাই—এমন করে হাসছে কেন সে। যদিও তার দিকে তাকানো একটা চোখও সে দেখতে পারছে না। তার কানের কাছে বাবার কথাটা ঘুরে-ফিরে বাজছিল। সে খালি চাঙরার দিকে এগিয়ে যায়। চাঙরাটা কাঁধে তুলে নেয়। তার চোখের সামনে এখন কোনো জলাভূমি নেই, হিজল-করস নেই, মাছের রুপালি ঝিলিক নেই, শাপলাপাতার দোলা নেই—বিস্তীর্ণ খালি প্রান্তর চোখের মধ্যে জলের মতো ঝিকমিক করে। একরাম আলি স্থির করতে পারে না, এখন এই মধ্যদুপুরে সে কোন দিকে পা চালাবে।
