কয়েনস ফ্রম বাংলাদেশ

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০১৩, ১৯:৪১
কয়েনস ফ্রম বাংলাদেশ বুলবুল আহমেদ এ.কে.এম শাহনেয়াজ পৃষ্ঠাসংখ্যা : ২৬৪ প্রথম প্রকাশ :জুন ২০১৩ নিমফিয়া পাবলিকেশন্স ঐতিহাসিকভাবে ব্যবসা বাণিজ্যে লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে মুদ্রার প্রচলন একেক দেশে একেক যুগে বিকশিত হয়েছে একেক রকমভাবে। ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে প্রাচীন যুগে মুদ্রার ব্যবহার ছিল প্রধানত রাজন্য শ্রেণীর মধ্যে। সিংহাসন আরোহন, রাজ্য জয়, নতুন রাজধানী স্থাপন, জন্ম-বিবাহ প্রভৃতি রাজকীয় শুভ ঘটনার স্মৃতি এবং সুনাম রক্ষার প্রয়াসে ইস্যু করা হতো মূল্যবান ধাতব মুদ্রা, বিশেষ করে স্বর্ণ মুদ্রা। মুদ্রায় খচিত বিশেষ বিশেষ ঘটনার (যেমন যুদ্ধ, সিংহাসন আরোহন ইত্যাদি) সন-তারিখ থাকত বিধায় প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় জীবনধারাকে সময়কালের ভিত্তিতে স্থাপন করার একটি বড় উত্স এসব প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ধাতব মুদ্রা, বিশেষ করে সন-তারিখ খচিত স্বর্ণমুদ্রা যা কিনা প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ইতিহাসকে সন-তারিখের ভিত্তিতে স্থাপন করার অতুলনীয় উত্স। মুদ্রা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দলিল, একটি চাক্ষুষ ইতিহাস। বাংলাদেশের মুদ্রা ইতিহাসে বর্তমান গ্রন্থটি একটি নতুন সংযোজন। এর প্রণেতা বুলবুল আহমেদ ও এ.কে.এম শাহনেয়াজ। পণ্ডিতদের ধারণা মানব ইতিহাসে মুদ্রার ব্যবহার শুরু খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী থেকে। মহেঞ্জোদাড়ো-হরাপ্পা সভ্যতায় মুদ্রার ব্যবহার ছিল বলে প্রত্নতত্ত্ববিদদের বিশ্বাস। সম্প্রতি নরসিংদীর ওয়ারি-বটেশ্বরে প্রত্নখননে মুদ্রাভরা একটি প্রাচীন মাটির কলস পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত মুদ্রার ভিত্তিতে বলা যায় যে, প্রাচীন বাংলা ছিল বহু ছোট-বড় রাজ্যে বিভক্ত। প্রাচ্যবিদগণ এ রাজ্যগুলি চারটি বৃহত্ অঞ্চলের মধ্যে চিহ্নিত করেছেন। আঞ্চলিকভাবে এসব রাজ্যাঞ্চল হলো—১. পুণ্ড্রবর্ধন ও বরেন্দ্র ২. রাঢ়, সোম ও গৌড়ীয় ৩, বঙ্গ ও বাঙ্গালাহ এবং ৪. সমতট, পাট্টিকেড়া ও হরিকেল। প্রতিটি অঞ্চল নিয়ন্ত্রিত হয়েছে জনপদ গোষ্ঠীভিত্তিক অনেক ছোট বড় রাজ্য দ্বারা। প্রতি রাজ্যই যে মুদ্রা প্রবর্তন করেছে এমন নয়। মুদ্রার সঙ্গে অর্থনীতির লেনদেন এতই সামান্য ছিল যে, অনেক ক্ষুদ্র রাজ্য মুদ্রা অর্থনীতি প্রবর্তনই করেনি। প্রাচীন যুগ থেক সুলতানী আমলের শুরু পর্যন্ত যে সব মুদ্রা পাওয়া গেছে সেগুলোর ছবিসহ একটি ক্ষুদ্র তালিকা করা হয়েছে এ গ্রন্থে। মোট ৫২টি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা। এগুলোর অধিকাংশই ব্যবহার করা হয়েছে ময়নামতি শালবন বিহার (কুমিল্লা), মহাস্থান গড় ও ওয়ারী বট্টেশ্বর সংগ্রহশালা থেকে। প্রতিটি মুদ্রার ছবি থাকায় পাঠক নিজে তা দেখে উপভোগ করতে পারছেন এবং চিন্তা ও কল্পনার মাধ্যমে হাজার বছর আগের মানুষের জীবনধারা আন্দাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। এই গ্রন্থে সুলতানী আমলের মুদ্রা আলোচনা খুবই সরস ও শক্তিশালী। সুলতানী আমলের মুদ্রা অর্থনীতির ওপর বিস্তর গবেষণা হয়েছে। বর্তমান গ্রন্থেও এর সবিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। সুলতানী ্আমলের মুদ্রায় আমরা প্রথম দেখি শাসকের নাম, সিংহাসন আরোহনের তারিখ এবং শাসকের ধর্মীয় পরিচয় । মুদ্রার ইতিহাসের স্বর্ণ যুগ হলো মোগল আমল যখন এর অর্থনীতি বিশ্বের অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। এ সময়কার মুদ্রায় সুবে বাংলার আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক দিক উন্মচিত হয়েছে। এ যুগে স্বর্ণমুদ্রা দেখা যায় অর্থনীতির সর্ব স্তরে, যা সুলতানী আমলে ছিল বিরল। পূর্বেকার পণ্য-বিনিময় অর্থনীতিকে বিদায় দিয়ে এর সর্বস্তরে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে আধুনিক মুদ্রা অর্থনীতি প্রবর্তন মোগল বাংলার এক বড় অর্জন। নবাবী আমলে বাংলার বাণিজ্য তুমুলভাবে প্রসারিত হয়। ইউরোপীয় বণিকগোষ্ঠী বাংলার পণ্য ক্রয় করার জন্য বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য নিয়ে আসত। এসব স্বর্ণ-রৌপ্য স্থানীয় টাকশাল থেকে টাকায় পরিণত করা হতো বাজার থেকে পণ্য ক্রয় করার জন্য। অর্থাত্ এ আমলেই আমরা লক্ষ করি অর্থনীতিতে সোনা-রোপার দাপট। বাংলার পণ্যের সঙ্গে বিনিময় ঘটলা ইউরোপীয় বণিকগোষ্ঠী আমদানিকৃত সোনা ও রুপার। এর ফলে বাংলার অর্থনীতিতে আসে এক বিপ্লব। কিন্তু এ বিপ্লব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারেনি। বঙ্গ বাণিজ্যে সোনা-রুপার ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে প্রতিটি ইউরোপীয় বাণিজ্যিক গোষ্ঠী বাংলা ও বৃহত্ ভারতে ঔপনিবেশিক ঘাঁটি নির্মাণ করে যে ঘাঁটিগুলিই পরিশেষে রূপান্তরিত হয় ঔপনিবেশি রাষ্ট্রে। এ প্রক্রিয়ায় টাকার ভূমিকা গ্রন্থে আলোচিত হলে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র গঠনের মূলে ধাতবের ভূমিকা বুঝা যেতো। যাহোক, উনিশ শতকের প্রথম সিকি অব্দি সিক্কা টাকা ছিল কোম্পানির স্বীকৃত টাকা যা ছিল সর্বগ্রাহ্য । ১৮২০-এর দশক নাগাদ আমরা বহু নামের, বহু রকমের এবং বহু ওজনের টাকা দেখতে পাই। ভারতের অন্যান্য প্রদেশের টাকাও মিশ্রিত হয় বাংলার সিক্কা রুপির সঙ্গে। এর ফলে টাকা বাজারে দেখা দেয় এক অরাজ্যকর পরিবেশ। এ সমস্যা নিরসনে ঔপনিবেশিক সরকার কর্তৃক ১৮৩৫ সনে এক ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে টাকার বাজারে একটি একক নিয়ম চালু করা হয় যা ব্রিটিশ শাসনের সব অবধি কার্যকর থাকে। গ্রন্থকারদ্বয় অতি যত্ন সহকারে টাকার ইতিহাস তুলে ধরেছেন এই গ্রন্থে। সাধারণ ভাষা ও ভাষ্যের ফলে বইটি সকলের নিকট উপভোগ্য হয়ে উঠেছে অবিশ্যি। বইটির বিশেষত্ব এই যে, বাংলায় টাকা অর্থনীতি বিকাশের সকল স্তর নিখুঁতভাবে ধরা হলেও সাধারণ পাঠকগণও বিশেষজ্ঞতার জটিলতায় আবদ্ধ না হয়ে এর বিকাশের সকল স্তরই পরিভ্রমণ করে উপভোগ করতে পারবেন। সুন্দর কাগজ, সুন্দর ছবি; উচুমানের ছাপা ও বাঁধাই বইটিকে বৈশিষ্টমণ্ডিত করে তুলেছে সন্দেহ নেই। গ্রন্থকার বুলবুল আহমেদ ও এ. কে.এম শাহনেওয়াজ এ সুন্দর উপভোগ্য বইটি উপহার দিয়ে আমাদের কৃতার্থ করেছেন, গর্বিত করেছেন।