২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের স্বাগতিক হিসেবে যখন কাতারের নাম ঘোষিত হলো, তখন অনেকের চক্ষুই উঠে গিয়েছিলো চড়ক গাছে, আর তারা ভাবছিলো, এ কী করে সম্ভব! তাদের মাথায় হয়তো যে বিষয়টি আসেনি— অর্থের জোরে অনেক অসাধ্যকেই সাধন করা যায়। এটিই করেছে কাতার। স্বাগতিক হওয়ার ভোটযুদ্ধে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির বড় খেলুড়েদের পেছনে ফেলে অট্টহাসি দেয় গ্যাস ও তেল সমৃদ্ধ এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে তারাই প্রথম আয়োজন করবে বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো প্রেস্টিজিয়াস আসর। এ সুযোগে আরো চাঙা হবে কাতারের অর্থনীতি। সেজন্য বেশ আগে থেকেই শুরু হয়ে গেছে তাদের প্রস্তুতি। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ চলাকালীন প্রায় আধা মিলিয়ন বিদেশি দর্শক কাতারে অবস্থান করবে, যা কি-না তাদের বর্তমান জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। একসঙ্গে এতো লোকের আগমনে বিশাল প্রভাব পড়বে তাদের অর্থনীতিতে।
স্বাগতিক হবার দৌড়ে শরিক হয়েই কাতার ঘোষণা করেছিলো, সুযোগ পেলে তারা প্রস্তুতি বাবদ ব্যয় করবে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যেই কথা সেই কাজ। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে যেন মহাযজ্ঞে মেতে উঠেছে তারা। ২১টি হোটেল নির্মিত হচ্ছে রাজধানী দোহায়। এর মধ্যে ১১টি পাঁচ তারকাবিশিষ্ট এবং ১০টি চার তারকাবিশিষ্ট। ধারণা করা হচ্ছে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই এগুলোর কাজ সম্পন্ন হবে। তারপর নির্মাণ করা হবে আরো পঞ্চাশটি হোটেল, যেগুলো প্রস্তুত হবে ২০২০ সালের মধ্যেই। এছাড়া কোনো উপায়ও নেই অবশ্য। ফিফা স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপ চলাকালীন ৬০ হাজার হোটেল কক্ষের প্রয়োজন হবে। কিন্তু তাদের এখন রয়েছে মাত্র ১৫ হাজার। পুরো কাতারে হোটেল রয়েছে মাত্র ৭৭টি। তবে এর বেশিরভাগই চার কিংবা পাঁচ তারকাবিশিষ্ট। কাতার পর্যটন কর্তৃপক্ষ আগামী পাঁচ বছরে পর্যটন সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় করবে ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বিশ্বকাপকে লক্ষ্য রেখে নতুন নয়টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হোটেল নির্মাণ করছে কাতার। এ কাজটিও হচ্ছে বাধ্য হয়ে। বিশ্বকাপ ফুটবল চলার সময়টায় কাতারের গড় তাপমাত্রা থাকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে। স্বাগতিক দৌড়ে নামার পর এ সমস্যাটি নিয়েই তাদের সবচে’ বেশি সমালোচনা সইতে হচ্ছিলো এবং এখনো হচ্ছে। কারণ বিশেষত ইউরোপের ফুটবলাররা এমন গরমে হাঁসফাঁস করবে। কিন্তু ভোটারদের এই বলে প্রভাবিত করেছিলো যে, পুরো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামেই খেলার আয়োজন করবে কাতার, তা সে যতো অর্থ ব্যয় করেই হোক। এমন প্রতিশ্রুতি পেয়েই শেষ পর্যন্ত মন গলেছিলো ভোটারদের। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, ভোটারদের মোটা অংকের উেকাচ দিয়ে ভোটযুদ্ধে জিতেছিলো তারা।
২০১০ সালে ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করার কথা ঘোষণা করেছিলো কাতার, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী যার মান এখন ১১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্লেষকদের ধারণা, শেষ পর্যন্ত কাতারের খরচ দাঁড়াবে আরো অনেক বেশি। কারণ বেশ কয়েকটি হাই প্রোফাইল মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে তারা, বিশেষত পরিবহন, পর্যটন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গৃহায়ন খাতে। মেট্রো ও রেল নেটওয়ার্কের পেছনেই ব্যয় করা হবে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে নিউ দোহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
আসলে কাতার এক ঢিলে দুই পাখি মারছে। ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০-এর আওতায় ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে তারা। কিন্তু সবাইকে বলছে, বিশ্বকাপকে লক্ষ্য রেখে খরচ করা হচ্ছে— এমন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে নিন্দুকেরা। প্রাক্কলিত ১০০ বিলিয়ন ডলারের ৬০ শতাংশেরই যোগান দেবে কাতার পেট্রোলিয়াম। কেউ কেউ ধারণা করছেন, শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি কাতারের নতুন আমির মনোনীত হওয়ায় বিশ্বকাপের প্রস্তুতি খরচ আরো বেড়ে যেতে পারে। কারণ মাত্র ৩১ বছর বয়স্ক এ আমির তার বাবা ও সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানির চেয়ে অনেক বেশি সৌখিন। উপরন্তু তিনি কাতারের অলিম্পিক কমিটির প্রধান।
সমালোচকরা বলছেন, একথা ঠিক যে, বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ২০২২ সাল পর্যন্ত কাতারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রতি বছর ৫ শতাংশ পয়েন্ট যোগ হবে; কিন্তু সমস্যা দেখা দেবে বিশ্বকাপ শেষ হলে। ছোট ও কম জনসংখ্যার দেশ হওয়ায় বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অনেক কিছুই তাদের আর কাজে লাগবে না। তখন লাভ-ক্ষতির হিসাব মিলাতে গিয়ে দেখবে ক্ষতির অংকটা অনেক বড়। তবে কাতারের স্বাগতিক হওয়াকে কেন্দ্র করে লাভবান হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। বিশেষ করে ভারত উপমহাদেশীয় দেশগুলো থেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি শ্রমিক আসছে কাতারে। সমৃদ্ধ কাতারের লোকজন কায়িক পরিশ্রমের কাজ করতেই চায় না। করার প্রয়োজনও পড়ে না অবশ্য। কাতারে তাদের নাগরিকদের চেয়ে তিনগুণেরও বেশি রয়েছে অভিবাসী শ্রমিক। এদেরকে যে পারিশ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়, স্থানীয় লোকজন এই পারিশ্রমিকে কাজ করার চিন্তাও করে না।
— ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউন অনুসরণে
