বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক শেক্সপিয়রের জুলিয়েটের কাছে একটি প্রশ্ন ছিল, নামের মধ্যে কী আছে? উত্তর ছিল: ঐতিহ্য, সাধনা এবং পরিবারের প্রত্যাশা। আর হয়তো সেজন্যই ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের ছেলে-মেয়েদের নাম নিয়ে এত মাতামাতি হয়। একটা নাম রাখতে একমাসও লেগে যায়। কারণ যদি নামের মধ্যে এমন কিছু থাকা যাবে না যাতে রাজপুত্রের ক্ষতি হয়। তবে ব্যতিক্রম ঘটেছে সিংহাসনের তৃতীয় উত্তরাধিকারীর নামের ক্ষেত্রে। প্রায় এক শতাব্দী পর দ্রুত নাম ঘোষণা করা হয়েছে তার। নাম তার প্রিন্স জর্জ আলেকজান্ডার লুইস। বিশ্ব গণমাধ্যম এখন তার নিয়ন্ত্রণে। তার জীবন-যাপন নিয়ে জানার আগ্রহ এখন কৌতূহলীদের। যুক্তরাজ্যের সিংহাসনের তৃতীয় উত্তরাধিকারীর সিংহাসনে আরোহণের পর পরিচিত হবেন রাজা সপ্তম জর্জ নামে। ডিউক অব কেমব্রিজ প্রিন্স উইলিয়াম ও ডাচেস অব কেমব্রিজ কেট মিডলটন তাদের প্রথম সন্তানের নাম রেখেছেন জর্জ আলেকজান্ডার লুইস। এখন সে পরিচিত হবে হিস রয়েল হাইনেস প্রিন্স জর্জ অব কেমব্রিজ নামে। এলিজাবেথের ছেলে যুবরাজ চার্লস যুক্তরাজ্যের সিংহাসনের প্রথম উত্তরাধিকার। তার পরের উত্তরাধিকারী নতুন যুবরাজের বাবা প্রিন্স উইলিয়াম। এরপরে ছিলেন প্রিন্স হ্যারি। কিন্তু তিনি এখন চতুর্থ নম্বরে চলে গেলেন।
রাজপরিবারের নাম রাখা হয় ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য রেখে। ব্রিটিশ সিংহাসনে এই পর্যন্ত আরোহণ করা ছয়জন রাজার নাম ছিল জর্জ। এই নামের সর্বশেষ রাজা ষষ্ঠ জর্জ বর্তমান রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের বাবা। আলেকজান্ডার নামটি ছিল কেটের পছন্দ, আর লুইস আসে উইলিয়ামের নামের চতুর্থ অংশ থেকে। যুক্তরাজ্যে জনপ্রিয়তায় জর্জের পরের স্থানে যথাক্রমে আলেকজান্ডার ও লুইস। লুইসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লুইস মাউন্টব্যাটেনের নাম। তিনি ছিলেন বর্তমান রাণীর স্বামী এবং ব্রিটিশ শাসিত ভারতের সর্বশেষ ভাইসরয়। প্রিন্স উইলিয়ামের দাদার দাদার নাম ছিল প্রিন্স লুইস। এছাড়া প্রিন্স উইলিয়ামের নিজের নামের মাঝেও আছে লুইস। জর্জ নামটিও ঐতিহ্য আর মর্যাদায় পিছিয়ে নেই। সেন্ট জর্জ ইংল্যান্ডের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তবে জার্মান বংশোদ্ভূত রাজা প্রথম জর্জের নাম থেকেই তা যুক্তরাজ্যে জনপ্রিয়তা পায়। নামটির শিকড় গ্রিসে। এছাড়া আরও পাঁচজন জর্জ যুক্তরাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন। আলেকজান্ডার নামে যুক্তরাজ্যে কোনো রাজা না থাকলেও স্কটল্যান্ডে এ নামে তিনজন রাজা ছিলেন। আর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট বিশ্বের প্রায় অধিকাংশ ভূখণ্ড জয় করেছিলেন। ঐতিহাসিক এ তিনটি নাম যুক্ত করেই রাখা হলো যুক্তরাজ্যের সিংহাসনের তৃতীয় উত্তরাধিকারীর নাম। লুইসের জন্ম হওয়ার আগেই অনেকে তার নাম ঠিক করেছিলের এবং তার চুলের রঙের ছবিও এঁকেছিলেন। রাজপুত্রের নাম জেমস রাখা হয়নি। এর কারণ হিসেবে জানা যায়, ১৬৮৮ সালে রোমান ক্যাথলিকদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার জন্য জেমস দ্বিতীয়কে সিংহাসন আরোহণের অধিকার থেকে বাদ দেয়া হয়।
উত্তর অস্ট্রেলিয়ার নর্দান টেরিটরি কর্তৃপক্ষ ব্রিটিশ রাজপরিবারের নতুন অতিথি প্রিন্স জর্জকে ভিন্নধর্মী উপহার দিয়েছে। উপহারটি হচ্ছে জীবন্ত একটি কুমিরের বাচ্চা। জর্জের সঙ্গে মিলিয়ে একই দিনে এই কুমিরের বাচ্চাটিকে জন্ম দেওয়ানো হয়। একসময় ব্রিটিশ রাজশিশু জন্মের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা উপস্থিত থাকতেন। তবে প্রিন্স চার্লসের জন্মের আগে আগে ১৯৪৮ সালে এই প্রথা বিলুপ্ত করা হয়। ১৯৩০ সালে প্রিন্সেস মার্গারেটের জন্মের সময় তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জে আর কাইনস বিপাকে পড়েছিলেন। প্রত্যাশিত সময়ের দুই সপ্তাহ পর জন্ম হওয়ায় মন্ত্রী কাইনসকে দুই সপ্তাহ বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছিল। প্রিন্স উইলিয়ামই হাসপাতালে জন্ম নেয়া যুক্তরাজ্যের প্রথম হবু রাজা। রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের জন্ম লন্ডনে তাঁর মায়ের পৈতৃক বাসভবনে। প্রিন্স চার্লসের জন্ম বাকিংহাম প্রাসাদে। উইলিয়াম-কেটের ছেলেশিশুকে ধর্মে দীক্ষার ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরানোর স্থান এখনো ঠিক হয়নি। সাদা সার্টিনের লেসযুক্ত পোশাকটি রাজপরিবার ১৮৪১ সাল থেকে এ কাজে ব্যবহার করছে। কারণ চার্চের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে রাজাকে। প্রিন্স উইলিয়াম আধুনিক রীতি অনুসরণ করে পিতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করছেন।
রাজসিংহাসনে জন্ম নেয়া মানে সমস্ত দুঃখ-কষ্ট এবং হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়া। কিন্তু তাই বলে তাদের চ্যালেঞ্জটা কম নয়। তার মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখেই দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হবে। রক্ষা করতে হবে রাজসিংহাসন। তার উত্তরসূরীদের রীতিনীতি পালন করতে হবে তাকে। এজন্যই হয়তো বলা হয়, যতো উচ্চপর্যায়ে অধিষ্ঠিত হবেন ততোই পরাধীন হবেন। এই আধুনিক যুগে এবং রাজপরিবারের জন্ম নিয়ে কি জর্জ তাহলে পরাধীনতায় আবদ্ধ হলেন? তাকে মর্যাদা অর্জন করতে হবে মানুষের কাছ থেকেই।
