মুষলধারে টানা বর্ষণে রাজধানীর নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় ব্যস্ততম প্রধান সড়ক ও বিভিন্ন অলিগলিতে হাঁটু পানি জমেছে। জলাবদ্ধতার কারণে গণপরিবহন সঙ্কটের মাঝেও সৃষ্ট যানজটে পড়ে নগরবাসীকে দিনভর চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। টানা বর্ষণে সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছে ছিন্নমূল ও শ্রমজীবী মানুষ। যথাযথ ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি জমে থাকে বিভিন্ন এলাকায়। ৬৫টি খাল ভরাটের পরিণতি রাজধানীবাসীর এই দুর্ভোগ বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের প্রভাবে দুদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টির পর গত শনিবার রাতভর টানা ভারি বৃষ্টিতে পানির নিচে তলিয়ে গেছে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন রাজধানীবাসী। গতকাল রবিবার ভোর ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ১২২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
ভারি বৃষ্টিতে রাজধানীর মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, বিজয়নগর, শান্তিনগর, মালিবাগ, কুড়িল, ভাটারা, মিরপুর, শ্যাওড়াপাড়া, আজিমপুর, মানিক মিয়া এভিনিউ, মোহাম্মদপুর, কাকরাইল, ফকিরাপুল, কমলাপুরসহ আশপাশের এলাকায় পানি জমে যায়। একই অবস্থা হয় বাড্ডা ও নতুন বাজার এলাকায়। এছাড়া তেজগাঁও, রাজাবাজার, রামপুরা, মৌচাক, তেজকুনিপাড়া, বাড্ডা, শাঁখারি বাজার, পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কেও পানি জমে যায়। যাত্রাবাড়ী, রায়সাহেব বাজার, মুগদা, কাজীপাড়া এলাকায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। পানি ঢুকে যাওয়ায় বিভিন্ন সড়কে সিএনজিচালিত যানবাহনগুলোকে বিকল হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কোন কোন সড়কে হাঁটু পরিমাণ পানি জমে যাওয়ায় সকাল থেকে অফিসগামী মানুষদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। সকালে রাস্তায় বেরিয়ে বিপাকে পড়েন তারা। পানি জমে যাওয়ায় বাস, ট্যাক্সিসহ গণপরিবহন কম চলাচল করছে।
এদিকে জলাবদ্ধতার কারণে সকালেই বেশ কয়েকটি স্থানে গাড়ি বিকল হয়ে পড়লে সৃষ্টি হয় যানজটের। এ সময় অনেক মানুষকে পানি ভেঙ্গে পায়ে হেঁটেই যাতায়াত করতে দেখা গেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মূলত মৌসুমী বায়ু সক্রিয় থাকার কারণেই এই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সাগরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
স্বল্প আয়ের মানুষের ভোগান্তি
শনিবার রাত থেকে টানা বৃষ্টির ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। অবিরাম বৃষ্টির কারণে খোলা আকাশের নিচে দোকান খুলে বসতে পারছেন না অনেক হকার। কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও অল্প পানি জমে ভোগান্তি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিকে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মৌসুমী বায়ুর সক্রিয়তার কারণে সোমবার সকাল পর্যন্ত বৃষ্টি ঝরা নাও থামতে পারে। বরং কোথাও কোথাও আরো বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর অর্ধশতাধিক খাল ভরাটের কারণে নগরীর বৃষ্টির পানি সরতে পারছে না। ফলে রাজধানীতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের ধারণা, ৬৫টি খাল ভরাটের পরিণতি রাজধানীবাসীর এই দুর্ভোগ।
এদিকে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান ইত্তেফাককে বলেন, বৃষ্টির পরিমাণ অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার কারণে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে যায়। ওয়াসার কর্মীরা চেষ্টা করছেন পানি সরাতে। পানি কমে যাবে বলে জানান তিনি। ভারি বর্ষণে নগরবাসীকে সাময়িক যে পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয় তাকে ‘জলজট’ বলতে হবে, জলাবদ্ধতা নয়। ওয়াসার পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম এখনও শেষ না হওয়ায় এবং বর্তমানে রামপুরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলে স্যুয়ারেজ পাইপ পাল্টানোর জন্য রাস্তা খোঁড়া হয়েছে। সে কারণে ওইসব রাস্তার দুদিক দিয়ে পানি নিষ্কাশন বন্ধ আছে। এ কারণেও পানি কিছুটা কম সরছে বলে মনে করেন তিনি।
পানি নিষ্কাশনের জন্য কর্মীরা ম্যানহোলের ঢাকনা তুলে দেন। এতেও বিপত্তি বাঁধে। অনেক স্থানে ম্যানহোল বুঝতে না পেরে সিএনজি, প্রাইভেটকারসহ ছোট গাড়ি ও রিকশা তাতে পড়ে উল্টে যায়। এতে পথচারীরা আহতও হন। প্রয়োজনের তাগিদে হাজার হাজার মানুষকে হাঁটু পানি ভেঙ্গে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। টানা বর্ষণে সবচেয়ে কষ্টে পড়ে ছিন্নমূল ও শ্রমজীবী মানুষ।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়নে পানি জমার সমস্যাটা দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এছাড়া প্রতিবছর কার্পেটিং করায় অধিকাংশ সড়ক স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উঁচু হচ্ছে। আর বসত এলাকা নিচু হচ্ছে। এছাড়া জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসাবে রাজধানীর অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত ড্রেনেজকে দায়ী করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে রাজধানীবাসীর দুর্দশা আরও বাড়বে। এদিকে দুইদিনের বৃষ্টিতে তরিতরকারিসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
