ভালো মানের নাটক নির্মাণের জন্য মানানসই জুটির বিষয়টা জরুরি। মানানসই জুটি হলে একের সাথে অন্যের অভিনয়টাও অনেক সুন্দর লাগে। সম্প্রতি সজল ও মেহজাবীন জুটি বেঁধে অভিনয় করলেন ঈদের জন্য নির্মিত ছয় পর্বের একটি নাটকে। এই দুই তারকা জুটির কথা নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। লিখেছেন খালেদ আহমেদ
টিভি মিডিয়ায় তার বলবার মতো অর্জনের জায়গাটি সজল তৈরি করে নিয়েছেন অনেক আগেই। তারপর শুধুমাত্র নিজের জনপ্রিয়তা আর অভিনয় দক্ষতার সাথেই যেন হাত ধরাধরি করে এগিয়ে গেছেন দর্শকপ্রিয় এই অভিনেতা। এ কারণে টিভি নাটকের অভিনেতা হিসেবে তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে এখন আর বাড়তি কোনো বিশেষণের প্রয়োজন হয় না। অভিনয়ের শুরুর কথা জানতে চাইলে তিনি সুন্দর একটি হাসি উপহার দিয়ে বলেন, ‘তখন সবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা দিয়েছি। তাই পৃথিবীটাও অন্যরকম। ভালো-মন্দের মিশেলে রঙিন ভুবন। অনুষ্ঠানে হৈচৈ লাফালাফির মধ্যেই চোখে পড়ে যাই কোকাকোলা প্রতিনিধির। এবং তখনই কোকাকোলার বিজ্ঞাপনে কাজ করার প্রস্তাবটা আসে। সেই থেকে শুরু। আর বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করতে গিয়ে গুণী নির্মাতা ও অভিনেতা আফজাল হোসেনের সান্নিধ্য পাই। এরপর বন্ধু তন্ময় এসে একদিন বলল, চল আমরা হাসতে হাসতে একটি নাটক তৈরি করে ফেলি। কেউ দেখুক বা না দেখুক আমরাই দেখব।’ সেই বন্ধুর কথাতেই ‘তখন জানতে বাকি’ নাটকে কাজ করলেন সজল। নাটক দেখে আফজাল হোসেন তো মহা খেপা। ফোন দিয়ে খুব করে বকাবকি করলেন। আফজাল হোসেনের কথা শুনে অভিমান জমল সজলের মনে, ‘পণ করেছিলাম জীবনে আর কখনও নাটক করব না। এটাই শেষ। পরে সেই আফজাল হোসেনই বাসায় ডেকে ধরে ধরে বোঝালেন বিজ্ঞাপন আর নাটকে কাজ করার পার্থক্য, সংলাপগুলো কখন কীভাবে আওড়াতে হয় এসব। এরপর অভিনয় করে যাচ্ছি।’ মাস্তান, পুলিশ, চোর, ডিরেক্টর থেকে শুরু করে এমন কোনো চরিত্র নেই, যাতে সজল অভিনয় করেননি। নিজের অভিনীত চরিত্রগুলো সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘গতানুগতিক চরিত্রের বাইরে ভিন্ন মাত্রার চরিত্রের প্রতি আমি সব সময়ই দুর্বল। প্রতিটি নাটকে অভিনয়ের আগেই আমি হোমওয়ার্ক করি। অভিনয়ের জন্য চরিত্রকে বোঝা ও পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর মধ্যে থাকতে হবে। আমি বরাবরই কোনো একটি চরিত্রে অভিনয় করার আগে স্ক্রিপ্ট ভালোভাবে পড়ি। পরিচালকের কাছে চরিত্র সম্পর্কে ব্রিফ নিই। এরপর ওই চরিত্রটি নিজের ভেতর ধারণ করি।’ তার কাছে নিজের অভিনীত পছন্দের কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে—কৌশিক শংকর দাসের পরিচালনায় ‘একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা নাটক’, আলভি আহমেদের ‘ওসিডি’, অঞ্জন আইচের পরিচালনায় ‘চশমা পরিবার’, ‘মেয়েটি জাতিস্মর অথচ সেদিন ছিল অহেতুক অমাবস্যা’ ও ‘একটি বিবর্ণ রাতের গল্প’, জয়ন্ত মণ্ডল ও সাজ্জাদ সনির পরিচালনায় ‘শেষ চিঠি’, মিজানুর রহমান লাবুর পরিচালনায় ‘বিষ্যুদবারের কালো গোলাপ’, সকাল আহমেদের ‘ভোটিং লাইফ’ উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে ঈদের বেশ কিছু নাটক নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন সজল। এরমধ্যে তিনি ফেরদৌস হাসান, তন্ময় তানসেন, মোহন খান, সকাল আহমেদ, পার্থ সরকার, জিএম সৈকত, অনন্য ইমন, আরিয়ান ও চিত্রনায়িকা মৌসুমীসহ আরও অনেক পরিচালকের নাটকে কাজ করেছেন। অন্যদিকে গতানুগতিক নায়িকা চরিত্রের মাঝে নিজেকে বন্দী করতে চান না মেহজাবীন। তার ভাষ্যে, ‘আমি লাক্স-চ্যানেল আই সুন্দরী প্রতিযোগিতা থেকে এসেছি বলে অনেকে হয়তো ধরে নিয়েছিলেন, অন্য কারও কারও মতো আমিও গতানুগতিক নায়িকা চরিত্রগুলোতে কাজ করব। কিন্তু তা না করে আমি একটু ভিন্ন পথে হেঁটেছি। আমি সব সময় সেই সব চরিত্রে কাজ করেছি, যেখানে আমার অভিনয়ের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আমার মনে হয় আমি কিছুটা হলেও পেরেছি।’ মেহজাবীনের তারকা হয়ে ওঠার গল্পটা রূপকথার মতোই। লাক্স-চ্যানেল আই সুন্দরী প্রতিযোগিতার উত্সাহী দর্শক মেহজাবীন টিভি পর্দায় গুণবতী সব রূপের রাজকুমারীদের দেখে অনুপ্রাণিত হন তাদের কাতারে সামিল হতে। বাঁধভাঙা উত্সাহের এ পথ ধরেই ২০০৯ সালের প্রতিযোগিতায় রেজিস্ট্রেশন, অংশগ্রহণ এবং নিজের যোগ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ। আর ফলস্বরূপ আজকের এই তারকা মেহজাবীনের জন্ম। এর পরের গল্প সবারই জানা। এরই মধ্যে মেহজাবীন বেশ কিছু মানসম্পন্ন বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হিসেবে পারফর্ম করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—সিঙ্গার ফ্রিজ ও এসি, লেজারট্রিট, ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির বডি লোশন, প্রাণ বাবল গাম, নাভানা রিয়েল এস্টেট ইত্যাদি। সম্প্রতি শেষ করলেন আরও নতুন একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের কাজ। শুধু মডেল হিসেবেই নয়, মেহজাবীন অভিনয়েও ইতোমধ্যে চমক দেখাতে শুরু করেছেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হলো—‘গহীনে’, ‘একজন মায়াবতী’, ‘ছায়াসঙ্গী’, ‘কেন্ডিডেট’, ‘এসেছিল’, ‘বিষটোপ’, ‘যে পথে ভালোবাসা’ প্রভৃতি। এসব নাটকে মেহজাবীন সুন্দর অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমান সময়ে মেহজাবীনের পথচলা শুরু হয়েছে একজন ভালো অভিনেত্রী হওয়া নিয়েই। একসময় অভিনয় করা নিয়ে তার মধ্যে একটা সংশয় কাজ করেছিল। তিনি মনে করতেন, আমি কখনই অভিনয় করতে পারব না। কিন্তু এ প্রতিযোগিতার একটি পর্বে খ্যাতিমান অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা যখন মেহজাবীনের অভিনয় দেখে বললেন, ‘তুমি পারবে বড় অভিনেত্রী হতে।’ আর প্রিয় শিল্পীর এই কমেন্ট মেহজাবীনের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে। তার কথায়, ‘আমি জানি একজন ভালো অভিনেত্রী হওয়ার জন্য অনেক সাধনার দরকার হয়। আমি প্রস্তুত এই পথে হাঁটতে।’ লাক্সের ক্যাম্পে থাকার দিনগুলো মেহজাবীনের কাছে জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। এখান থেকেই অনেক কিছু অর্জন করেছেন এই কন্যা। ক্যাম্পের সোনালি সেই দিনগুলোর গল্প নিয়ে মেহজাবীন বলেন, ‘ক্যাম্পের দিনগুলো কখনও ভোলা যাবে না। ওখানে আমরা অনেক কিছু শিখেছি। বিশেষ করে গ্রুমিং সেশনটা ছিল চমত্কার। এরফলে আমাদের কনফিডেন্স আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। আর এই অভিজ্ঞতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজে লাগবে বলে আমি মনে করি। টাইম সেন্স, ডিসিপ্লিনের ব্যাপারে আমি বরাবরই সচেতন ছিলাম। লাক্সে আসার পর সেই সচেতনতা আরও জোরদার হয়েছে।’ বর্তমানে ঈদের বেশ কিছু নাটক নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন মেহজাবীন। এরমধ্যে তিনি জয়ন্ত রোজারিও, ইরানী বিশ্বাস, রেদোয়ান রনিসহ আরও বেশ কয়েকজন পরিচালকের নাটকে কাজ করেছেন। এবারের ঈদে মেহজাবীনকে বেশ কয়েকটি চ্যানেলে নৃত্য পরিবেশন করতে দেখা যাবে। লাক্সতারকা মেহজাবীন সকাল আহমেদের পরিচালনায় একটি নাটকে জুটিবদ্ধ হয়ে কাজ করেন সময়ের ব্যস্ততম অভিনেতা আব্দুর নূর সজলের সাথে। এরপর তারা দু’জন জুটিবদ্ধ হয়ে মোহন খান, শাহীন কবির টুটুল, মারুফ পাঠানসহ আরও বেশ কয়েকজন পরিচালকের নির্দেশনায় জুটিবদ্ধ হয়ে কাজ করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় আবারও তারা দুজন জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করছেন শাহীন কবির টুটুলের রচনা ও পরিচালনায় ছয় পর্বের একটি নাটকে। সম্প্রতি নাটকের শুটিং সম্পন্ন হয়েছে। এই নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করছেন সজল। নাটকে তার নাম ‘রাহুল’। অন্যদিকে তার বিপরীতে মেহজাবীন কাজ করছেন ‘অবন্তী’ চরিত্রে। সজল বলেন, ‘মেহজাবীন খুবই কোঅপারেটিভ একজন অভিনেত্রী। এই সময়ে বেশ ভালো করছে, যে কারণে অল্পদিনের মধ্যে তার দর্শক গ্রহণযোগ্যতাও বেড়েছে অনেকখানি।’ অপরদিকে মেহজাবীন বলেন, ‘আমি মিডিয়াতে কাজের শুরু থেকেই সজল ভাইয়ার আন্তরিক সহযোগিতা পেয়ে আসছি। তিনি সব সময়ই হাসিখুশি একজন মানুষ। এই নাটকটি দর্শকের অনেক ভালো লাগবে।’ আগামী ঈদে ছয় পর্বের এই ধারাবাহিক নাটকটি একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলে প্রচার হবে।
