পরিত্যক্তের পথে আরিচা ঘাট

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০১৩, ২০:১৪
হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় মুখরিত আরিচা ঘাট এখন শূন্য মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এক সময়কার বহুল আলোচিত আরিচা ঘাটটি এখন শুধুই ইতিহাস। কালের চাকায় হারিয়ে গেছে আরিচা নদী বন্দরের সেই দৃশ্যপট, কিন্তু সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে নদীবন্দরের পরিত্যাক্ত জায়গায় গড়ে উঠতে পারে শিল্প কারখানা। যেখানে কর্মসংস্থান পেতে পারে ঘাট এলাকার হাজার হাজার বেকার মানুষ। বিআইডব্লিউটিএ অফিস জানায়, দেশের দক্ষিণ ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের ২১ টি জেলার রাজধানী ঢাকার সাথে সড়ক ও নৌ যোগাযোগের একমাত্র প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত আরিচা ঘাটটি ১৯৮৩ সালে নদীবন্দর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। ৬.৫৮ একর জমির উপর তৈরি করা হয়েছিল ফেরি টার্মিনাল। আরিচা-নগরবাড়ি ও আরিচা-দৌলতদিয়া রুটে এই ফেরি সার্ভিস চালু ছিল। ১৯৬০ সালে কর্ণফুলি নামের একটি ফেরি দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল আরিচা ফেরি সার্ভিস। প্রথম যাত্রায় ফেরিটিতে একটি গাড়ি পার হয়েছিল । তার জন্য গাড়িটিকে ভাড়া গুণতে হয়েছিল ৭৫ পয়সা। তারপর একে একে বেশকিছু কে টাইপ ও রোরো ফেরি যোগ হয় এই বহরে।সড়ক যোগাযোগের ক্রম উন্নতির সাথে সাথে আরিচা ঘাটের গুরুত্ব দিন দিন বেড়েই চলছিল। গুরুত্ব বাড়ার সাথে সাথে এটি দেশের অন্যতম ফেরি ঘাট হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছিল। ঘাট জমজমাট হবার সাথে সাথেই এখানে গড়ে উঠেছিল হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্র হয়ে উঠে আরিচা ঘাটটি। আরিচা ঘাটের প্রকৃত মৃত্যুযাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৯৭ সালে যমুনা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে। একদিকে যমুনা সেতু আরেকদিকে প্রাকৃতিক অর্থাত্ নদী ভরাটের কারণে ২০০২ সালে ঘাটটি পাটুরিয়ায় স্থানান্তরিত করা হয়। ঘাট স্থানান্তরের সাথে সাথে বেকার হয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষ। তেওতা গ্রামের ট্রাক চালক জামাল উদ্দিন জানান, যখন আরিচা ঘাট চালু ছিল তখন শতশত ট্রাক দিনের পর দিন ঘাট এলাকায় আটকে থাকত। প্রতিদিন ৪/৫ কিলোমিটার যানজট লেগেই থাকত। নদী পার হতে কত কত সময় ৬/৭ দিন সময় লাগত। বিশেষ করে ঈদের মৌসুমে যানজটে আটকে পড়ে ঈদের নামাজ ঘাটেই আদায় করেছে ঘরমুখো যাত্রীরা। আরিচা ঘাটে এখন আর এসব কিছু দেখা যায় না। আরিচা ঘাটের হোটেল ব্যবসায়ী মোঃ জামাল উদ্দিন শেখ জানান, আরিচা ঘাটে আগে মানুষ হাটতে পারত না। হাটতে গেলে একজনের সাথে গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগত। আর এখন সেই জায়গায় মানুষই চোখে পড়ে না। ঘাটটি এখন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ঘাট এলাকায় প্রায় ২ শতাধিক খাবার হোটেল ছিল। বেচাকেনাও ছিল প্রচুর। কিন্তু তখনকার আমলের সেই লোকগুলো এখন বেকার হয়ে পড়েছে। সেই সময়কার হকার আমিন উদ্দিন জানান, এই আরিচা ঘাটে স্থানীয় ও বাইরের প্রায় কয়েক হাজার হকার বিভিন্ন জিনিস ফেরি করে বিক্রি করত। তাদের রুটিরুজির জায়গা ছিল এই আরিচা ঘাট। কিন্তু ঘাট সরে পাটুরিয়া চলে যাওয়ায় এখানকার সেই লোকগুলো সেখানে গিয়ে ব্যবসা না করতে পারায় তারা খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। ঘাটে লোকজন না থাকায় এখন বেচাকেনা আর হয় না। ছেলেমেয়ে নিয়ে তিনি নিজেও একবেলা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন বলে তিনি জানান। স্মৃতিচারণ করে তিনি আরো বলেন, আগে ঘাট এলাকা মানুষের কোলাহলে সব সময় সরব থাকত আর সেই জায়গায় এখন মাঝে মাঝে কুকুরও চোখে পড়ে না। যানজট যত বাড়ত আমাদের বেচাকেনাও তত বাড়ত। ঘাটে দিনের পর দিন যানজট লেগেই থাকত। যানজটে আটকা পড়ে অনেক গর্ভবতী নারীও গাড়িতে সন্তান প্রসব করেছেন বলে তিনি জানান।