ধান নিয়ে চিন্তিত কৃষক, এক মণ ধানের দামে মিলছে না শ্রমিক

আপডেট : ১৪ মে ২০১৯, ২০:১২

পাবনায় বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াবে দাবি স্থানীয় কৃষি বিভাগের। চলছে কাটার উৎসব। ধান কাটা আর মাড়াইয়ে তাই ব্যস্ত সময় কাটছে কৃষকের। তবে ধানের দাম নিয়ে খুশি নন তারা। একজন শ্রমিক এক মণ ধানের দামে মিলছে না।

সরেজমিনে মঙ্গলবার পাবনার দাপুনিয়া, নাজিরপুর, গয়েশপুর, দোগাছি, ঈশ্বরদী,আটঘরিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে দেখা যায়, মাঠের পর পর মাঠ ছেয়ে আছে সোনালী ধানে। সোমবার রাতের বৃষ্টিতে অধিকাংশ ধান ক্ষেতে জমেছে পানি। কাদাপানি মাড়িয়েই কৃষক ধান কেটে আঁটি বাঁধছেন। মাথা বোঝাই করে সে ধান নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে। এরপর মাড়াই মেশিনে ধান, খড় আলাদা করে রোদে শুকোচ্ছেন কৃষক কৃষাণীরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পাবনার উপপরিচালক মো. আজহার আলী জানান, পাবনায় ৫৬ হাজার হেক্টর আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও  আবাদকৃত জমির পরিমাণ ৫৮ হাজার ৬৫ হেক্টর। এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধেক  জমির  ধান কর্তন হয়েছে। চাল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ২ দশমিক ২ টন, আশা করা যায়  কাটা শেষ হলে উৎপাদন  ২ দশমিক ৫ টন ছাড়িয়ে যাবে।

এদিকে ফলন ভাল হলেও কৃষকের মন খারাপ। ঝড়-শিলাবৃষ্টির আতঙ্ক মনে। পাশাপাশি শ্রমিক সংকট। যে টাকা ধান কাটতে  খরচ হচ্ছে, ধান বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, আরও ঘর থেকে চলে যাচ্ছে। কোথাও  স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে ধান কাটতে মাঠে নেমে পড়েছে।

আরও পড়ুন: হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক হওয়ার পেছনে ইসরায়েল

আটঘরিয়া উপজেলার নাদুরিয়া গ্রামের কৃষক ইউসুফ মিয়া নিজের জমিতে প্রতিদিন  শ্রমিকপ্রতি ৭শ’ থেকে ৮শ’ টাকা মজুরি দিয়ে ধান কাটাচ্ছেন। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে পেট পুরে খাওয়ানোর ব্যবস্থা। মাড়াইয়ের জন্য আলাদা খরচ। প্রতি মণ ধানে মাড়াইওয়ালাকে দিতে হয় ২ থেকে  কেজি ধান। উৎপাদিত ধান  বিক্রি করে তিনি হিসাব করে দেখেন তার লাভ তো দুরের কথা, খরচই উঠছে না। তার প্রতিমণ ধানে  ১০০ থেকে ২০০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। 

সদর উপজেলার দোগাছি গ্রামের কৃষক মেনহাজ মিয়া বলেন, বাজারে ধানের কোন চাহিদা নেই। কৃষকের হাতে যখন ধান থাকবে না তখন দাম বাড়বে। বাড়তি দামের সুফল কৃষকের কোন উপকারে আসবে না।

ঈশ্বরদী উপজেলার আথাইলশিমুল গ্রামের কৃষক মোস্তাফিজ ১০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমির সেচ দুই হাজার ৫০০ টাকা, হালচাষ-রোপণে খরচ তিন হাজার টাকা, সার-বীজ-নিড়ানি-কীটনাশক ২ হাজার টাকা খরচ। তার সঙ্গে  কাটা মাড়াই তিন  হাজার টাকা যোগ করলে সব মিলিয়ে তার খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৫০০ টাকা। তিনি প্রতি বিঘা ধান পেয়েছেন ১৮ থেকে ১৯ মন। যার বর্তমান বাজার মূল্য নয়  থেকে সাড়ে নয়  হাজার টাকা। প্রতি বিঘা জমিতে তার লোকসান গড়ে ৫শ থেকে ১ হাজার টাকা।

আরও পড়ুন: নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডাকে পাঁচ ডলার ঘুষ দিলো শিশু!

পাবনার কৃষকদের প্রধান ফসল বোরো ধানের দাম কমে যাওয়ায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ঋণের জালে আটকে যাচ্ছেন কৃষক। ব্যাংকঋণ সহজলভ্য না হওয়ায় বেশির ভাগ কৃষক চড়া সুদে দাদন নিয়ে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। ধানের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকরা ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। ঋণ নেওয়া দাশুরিয়া  গ্রামের কৃষক সুরুজ শেখ  বলেন, বোরোর ধানের দাম কম হওয়ায় তার মত অনেকের মনে ঋণ শোধ নিয়ে চরম হতাশা বিরাজ করছে।

পাবনা জেলায় বোরো ধানের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের মাঝে এ অঞ্চলের আতাইকুলা, বনগ্রাম, কাশিনাথপুর, চতুরহাট, ডেমরা, ধুলাউড়ি, বোয়াইলমারিসহ বিভিন্ন হাটে নিয়মিত যাতায়াত করেন এমন কয়েকজন ব্যাপারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে হাটগুলোতে প্রকারভেদে প্রতিমণ  বোরো ধান ৫০০ থেকে ৫৩০ টাকা  দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে হাট ধানের চাহিদা নেই, ক্রেতা কম। ধানের বাজার দর নিয়ন্ত্রণ করছে ফড়িয়া ও দালালেরা। ক্রেতার অভাবে চাষিরা কম দামে ফড়িয়া ও দালালদের কাছে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

চাষিরা জানান, সরকারি হিসাবে প্রতিমণ ধান ১ হাজার ৪০ টাকা। সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয় করলে  লাভবান হবেন তারা।

ইত্তেফাক/জেডএইচ