প্রিয় নবী (স.) প্রত্যেক ঈদে তিনি এক বিশেষ ইয়ামানী চাদর পরতেন (কিতাবুল উম্ম ২০৬ পৃঃ)। তারপর তিনি সর্বোত্তম খোশবু লাগাতেন (হাকিম, ফতহুল আল্লাম ১ম খণ্ড -২২১পৃঃ)। তিনি বেজোড় খেজুর খেয়ে ঈদুল ফিতরের জন্য সকালে ঘর থেকে বের হতেন (বুখারী ১৩০ পৃঃ)। এক রাস্তা দিয়ে যেতেন অন্য রাস্তা দিয়ে ঘরে ফিরতেন (তিরমিজি, ১ম খণ্ড, ৬৯ পৃ.)।
এক মাস সিয়াম সাধনারপর পশ্চিম আকাশে শাওয়ালের একফালি চাঁদ উদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে পবিত্র ঈদুল ফিতরের অনির্বাচনীয় আনন্দের হিল্লোল প্রবাহিত হয়। প্রতি প্রাণে প্রাণে ঢেউ খেলে যায় বেহেশিত অমীয় শান্তির ফল্গুধারা। রহমত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস রমজান পালন করার সুযোগ দেয়ায় আল্লাহর কৃতজ্ঞতায় সেজদায় লুটিয়ে পড়ে সংযমব্রত পালনকারী প্রত্যেক রোজাদারের উচুশির। আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার-ওয়ালিল্লাহিল হাম্দ, ধ্বনিতে গুঞ্জরিত ও প্রকম্পিত হয় সমগ্র মুসলিম জাহান। রমজান শেষ হলে ঈদুল ফিতরের রাতটি খুবই মাহাত্ম্যপূর্ণ। যেমন রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, যে ব্যক্তি দু’ঈদের দু’রাতে নেকীর আশাধারী হয়ে সালাতে দাঁড়াবে তার হূদয় সেদিন মরবে না যেদিন অনেক মানুষ মনমরা হয়ে থাকবে (ইবনে মাজাহ, তালখীসুল হাবীব ১৪৩ পৃঃ, কানযুল উম্মাল খন্ড ১৯৮ পৃঃ)। বিখ্যাত তাবেঈ আল্লামা মুজাহিদ (রহ.) বলেন, রমজানের শেষ দশকের রাতের মত ঈদুল ফিতরের রাতও মাহাত্ম্যপূর্ণ এ কারণেই মনে হয় এই প্রসিদ্ধ তাবেঈ (কারো মতে সাহাবী) আবদুর রহমান ইবনে আসওয়াদ বলেন, ঈদুল ফিতরের রাতে অন্যান্যদের মত দুনিয়াবী রং ঢংয়ে রোজা পালনকারীদের মজে থাকা কোন মতেই চলবে না। বরং পারতপক্ষে ঐ রাত নফল ইবাদাতে কাটানো উচিত। আল্লামা হাফিয ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেন, একথা বর্ণিত আছে যে, রসূলুল্লাহ (স.) সর্বপ্রথম যে ঈদের সালাত পড়েন তা হল দ্বিতীয় হিজরীতে ঈদুল ফিতরের সালাত। তারপর থেকে তিনি দুনিয়া ত্যাগ করা পর্যন্ত আজীবন দু’ঈদের সালাত পড়েন (তালখীসুল হাবীর ১৪২ পৃঃ)। তাই অধিকাংশ ‘আলিমের মতে এ সালাত সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। কিন্তু বিভিন্ন হাদীসের বাহ্যিক ভাব বলে যে, এ সালাত ওয়াজিব বা অপরিহার্য। কারণ, নবী (স.) এবং তার পরে খোলাফায়ে রাশেদীন এ সালাত পড়ার জন্য নারীদেরকেও বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর এ নির্দেশও প্রমাণ করে যে, সালাতটি ওয়াজিব (সুবুলুস সালাম, ১ম খণ্ড ১৭৩ পৃঃ)। রাসূলুল্লাহ (স.) দু’ঈদের দিনে গোসল করতেন (ইবনে মাজা ৯৪পৃঃ)। তারপর তিনি সবচেয়ে সুন্দর কাপড় পরতেন। কখনো তিনি সবুজ রংয়ের চাদর পরতেন (নাসাঈ ১ম খণ্ড-১৭৮পৃঃ)। আবার কখনো লাল ফুলের বুটি দেয়া চাদর পরতেন (যাদুল মা’আদ ১ম খণ্ড-১২১পৃঃ)। জাবির (র.) বলেন, দু’ঈদে ও জুমআতে নবী (স.) তাঁর লাল বুটি দেয়া বিশেষ চাদরটি পরতেন (ইবনে খুযায়মা, নায়লুল আওতার ৩য় খণ্ড -১৬৬ পৃঃ)। প্রত্যেক ঈদে তিনি এক বিশেষ ইয়ামানী চাদর পরতেন (কিতাবুল উম্ম ২০৬ পৃঃ)। তারপর তিনি সর্বোত্তম খোশবু লাগাতেন (হাকিম, ফতহুল আল্লাম ১ম খণ্ড -২২১পৃঃ)। তিনি বেজোড় খেজুর খেয়ে ঈদুল ফিতরের জন্য সকালে ঘর থেকে বের হতেন (বুখারী ১৩০ পৃঃ)। এবং ঈদুল আযহার দিনে সালাত না পড়া পর্যন্ত কিছু খেতেন না (তিরমিযী ১ম খণ্ড-৭১ পৃঃ ইবনে মাজাহ, মিশকাত ১২৬ পৃঃ)। আলী (রা.) বলেন, সুন্নাত হল ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া (তিরমিযী ১ম খণ্ড-৬৯পৃঃ বুলুগুল মারাম ৩৫ পৃঃ)। তাই তিনি হেঁটে ঈদগাতে যেতেন এবং হেঁটেই বাড়ী ফিরতেন। (ইবনে মাজাহ ৯৩) তিনি এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যেতেন এবং অপর রাস্তা দিয়ে বাড়ী ফিরতেন (ইবনে খুযায়মা ২য় খন্ড, ৩৪৩ পৃঃ) এবং ঘর থেকে ঈদগাহ পর্যন্ত তিনি তাকবীর দিতে দিতে যেতেন (হাকেম, তালখীসুল হাবীর, ১৪২ পৃঃ)। হাসান ইবনে আহমাদ আলবান্না কিতাবুল আযাহীতে বর্ণনা করেছেন, নবী (স.) আমাদেরকে নিয়ে ঈদুর ফিতরের সালাত পড়েন তখন সূর্য দু’ বল্লম ওপরে ছিল এবং সূর্য এক বল্লম ওপরে থাকাকালীন ঈদুল আযহা পড়ান (তালখীসুল হাবীর ১৪৪ পৃঃ)। সে যুগে ঘড়ি আবিস্কৃত না হওয়ায় সাহাবীগণ একটা অনুমান করে এক ও দুই বল্লমের কথা বলে সময়টা বোঝাতে চেয়েছেন। অন্য এক সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে বুশর একদা ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আজহা পড়তে বের হন। অতঃপর ইমাম সাহেব দেরী করায় তিনি বিরক্ত প্রকাশ করেন এবং বলেন, এ সময়েই আমরা (রসূলুল্লাহর যুগে) সালাত পড়ে বাড়ী ফিরে যেতাম। এটা হল ইশরাকের সময় (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাঊদ ১ম খণ্ড-১৬১ পৃঃ, ইবনে মাজাহ ৯৪ পৃঃ, হাকিম ১ম খণ্ড-২৯৫ পৃঃ, ও বায়হাকী, মিরআত ২য় খণ্ড -৩৪৫ পৃঃ)। আবূ সাঈদ খুদরী (রা.) বলেন, নবী (স.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে ঈদগাহে যেতেন (বুখারী, ১৩১ পৃঃ, মুসলিম ১ম খণ্ড-২৯০ পৃঃ, মিশকাত ১২৫পৃঃ)। আবূ হুরায়রাহ (র.) বলেন, একবার বৃষ্টি হওয়ায় নবী (স.) সবাইকে নিয়ে মসজিদে ঈদের সালাত পড়েন (আবু দাঊদ ১ম খণ্ড-১৬৪ পৃঃ ইবনে মাজাহ ৯৪পৃঃ, মিশকাত ১২৫পৃঃ)। উক্ত দু’টি হাদীস প্রমাণ করে যে, কোন এক মাঠেই ঈদের সালাত পড়া উত্তম ও সুন্নাত। তবে বৃষ্টি হলে এবং মাঠে সালাত পড়া সম্ভব না হলে মসজিদে ঈদের সালাত পড়া যাবে। হানাফী, মালিকী, হাম্বলী ও আহলে হাদীসদের অভিমত তাই। মদীনার পূর্বদিকে মসজিদে নববী থেকে রসূলুল্লাহ (স.) এর ঈদগাহ ছিল এক হাজার হাত দূরে। ‘উমার ইবনে শিবহ আখবারে মদীনাতে এ বর্ণনা দিয়েছেন (ফতহুল আল্লাম ১ম খণ্ড ২১৭পৃঃ)। একবার ছাড়া আজীবন রসূলুল্লাহ (স.) ঐ ঈদগাহে ঈদের সালাত পড়েছেন। জাবির ইবনে সামুরাহ (রা.) বলেন, আমি রসূলূল্লাহ (স.) এর সাথে কয়েকবার দু’ঈদের সালাত পড়েছি বিনা আজানে ও বিনা ইকামাতে (মুসলিম ১ম খণ্ড-২৮৯ পৃঃ, মিশকাত ১২৫পৃঃ, বুখারী ১৩১ পৃঃ, নাসাঈ ১ম খণ্ড -১৭৭ পৃঃ)। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত নবী (স.) ঈদের দিন দু’ রাকআত সালাত পড়েন। তার আগে এবং পরে কোন সালাতই তিনি পড়েননি (সিহাহ সিত্তা ও মুসনাদে আহমাদ, বুলুগুল মারাম- ৩৫পৃঃ)। একদা ওয়াসিলাহ ঈদের দিনে রসূলুল্লাহ (স.) এর সাথে সাক্ষাত করে বলেন, ‘আল্লাহ আমাদের এবং আপনার তরফ থেকে ঈদকে কবূল করুন। তখন তিনি বললেন, হ্যাঁ। তাকাব্বালাল্লা-হু মিন্না ওয়া মিনকা (ইবনে আদী)। রসূলুল্লাহ (স.) এর সাহাবীগণ যখন ঈদের দিন সাক্ষাত করতেন তখন একে অপরকে বলতেন, তাকাব্বালাল্লা-হু মিন্না ওয়া মিনকা (ফতহুল বারী ২য় খণ্ড-৪৪৬ পৃঃ)। রসূলুল্লাহ (স.) ঈদগাহে যাবার সময় একটা লাঠি বা বল্লম নিয়ে যেতেন এবং সালাত শুরুর আগে সেটা তাঁর সামনে সুতরা হিসেবে ব্যবহার করতেন (বুখারী ১৩৩ পৃঃ)। অতঃপর তিনি আল্লাহু আকবার বলে তাকবীরে তাহরীমা বলে হাত বাঁধতেন। তারপর তিনি সানা পড়তেন (ইবিনে খুযায়মা)। নু’মান বিন বাশীর (স.) বলেন, রসূলুল্লাহ (স.) দু’ ঈদের ও জুমআতে সূরা সাব্বিহিসমা রব্বিকাল আ’লা (সূরা-আ’লা) ও হাল আতা-কা হাদীসুল গাশিয়াহ (সূরা গাশিয়া) পড়তেন।
