আবুল হাসানের কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসঙ্গতার সচিত্র বাঁককে উন্মোচন করা। সে বাঁকগুলো নানা বস্তুগত, অবস্তুগত উপাদানের সমগ্রতায় পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়েছে। নিঃসঙ্গতা থেকে জাত বিচ্ছিন্নতা, প্রতীকী একাকীত্ববোধ বা দ্রোহ, অন্তর্গতবোধজাত নানা বাস্তবিকতা, সমাজ-রাজনীতি ইত্যাদি তাতে ধারাবাহিকভাবে উন্মোচিত হয়। বোদলেয়ারকে আমরা যেভাবে ক্লেদজ কুসুম-এ পাই, রিলকে-কে যেভাবে ডুয়িনো এলিজি-তে, কিটসকে যেভাবে ওড টু মিলানকোলি-তে, জীবনানন্দকে যেভাবে ধূসর পাণ্ডুলিপি-তে ঠিক সেভাবেই আবুল হাসান তাঁর সমগ্র কাব্যে নিঃসঙ্গতার ধারক। তিনি তাঁর নিঃসঙ্গতাকে ছড়িয়ে দেন ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে
ঝিনুক নীরবে সহো
ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও
ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও!
(ঝিনুক নীরবে সহো/পৃথক পালঙ্ক)
কবি আবুল হাসান নিঃসঙ্গ ঝিনুক যিনি ভিতরে বিষের বালি ধারণ করে বাংলা কবিতাকে তাঁর মহত্ কাব্যশিল্পে ঋণী করেছেন। নিজে কতটুকু পেলেন তার খোঁজ তিনি কমই করেছেন বরং সামাজিক মানুষ হয়ে তাঁর নির্বিশেষ কাব্যিক অবগাহনই কবিতার সোনা ফলাতে সাহায্য করেছে। আশ্চর্য সুরধর্মী কবিতাকে তিনি নিঃসঙ্গ জীবনসহযোগে শিল্পবান্ধব করে দেন আর তাতেই সমকাল ছড়িয়ে থাকে, থাকে নস্টালজিক কথামালা কিংবা রাজনীতিপ্রসঙ্গও। ষাটের দশকের উত্তাল সময়ে যে কবিরা সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা আধুনিক কবিতাকে, আবুল হাসান সে-সময়ের কণ্ঠস্বর। ষাটের দশকের প্রথমার্ধ্বে রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, সিকদার আমিনুল হক-রা আসেন, দ্বিতীয়ার্ধ্বে হুমায়ুন কবির, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, সমুদ্রগুপ্ত, সানাউল হক খান, মুহম্মদ নুরুল হুদা, অসীম সাহাদের সঙ্গে আবুল হাসানের আগমন ঘটে। বলা যায় বাংলা আধুনিক কবিতার স্বর্ণসময়ে তাঁর আবির্ভাব। সমকালীন বন্ধু-শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ, আড্ডাপ্রিয়তা ইত্যাদিও আবুল হাসানের সহজাত ছিল, অথচ তাঁর কবিতা নিঃসঙ্গতার মহিমায় উদ্ভাসিত একগুচ্ছ শিল্প। মাত্র তিনটি কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ (১৯৭২), ‘যে তুমি হরণ করো’ (১৯৭৪) ও ‘পৃথক পালঙ্ক’ (১৯৭৫) এবং ‘অগ্রন্থিত কবিতা’ (১৯৮৫) নিয়ে তাঁর কাব্যসম্ভার বিস্তৃত। যে সূত্র ধরে ইংরেজি সাহিত্যের শেলি, কিটস বা রুডইয়ার্ড কিপলিং-রা স্বল্পায়ু শিল্পী সে সূত্রে আবুল হাসানও পড়েন। মাত্র আটাশ বছরের জীবন। সুকান্তের যেমন একুশ বছর। সাদৃশ্য হলো কম সময়েই এত অসাধারণ কাব্যসম্ভার পাঠকের কাছে রেখে যাওয়ার ব্যাপারটি। বোধ হয় শিল্পভুবনে এ এক নিয়তি। যাঁরা পৃথিবীতে বেশিদিন থাকেন না, তাঁরা আমাদের অল্পেই ঋণী করেন।
আবুল হাসানের কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসঙ্গতার সচিত্র বাঁককে উন্মোচন করা। সে বাঁকগুলো নানা বস্তুগত, অবস্তুগত উপাদানের সমগ্রতায় পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়েছে। নিঃসঙ্গতা থেকে জাত বিচ্ছিন্নতা, প্রতীকী একাকীত্ববোধ বা দ্রোহ, অন্তর্গতবোধজাত নানা বাস্তবিকতা, সমাজ-রাজনীতি ইত্যাদি তাতে ধারাবাহিকভাবে উন্মোচিত হয়। বোদলেয়ারকে আমরা যেভাবে ক্লেদজ কুসুম-এ পাই, রিলকে-কে যেভাবে ডুয়িনো এলিজি-তে, কিটসকে যেভাবে ওড টু মিলানকোলি-তে, জীবনানন্দকে যেভাবে ধূসর পাণ্ডুলিপি-তে ঠিক সেভাবেই আবুল হাসান তাঁর সমগ্র কাব্যে নিঃসঙ্গতার ধারক। তিনি তাঁর নিঃসঙ্গতাকে ছড়িয়ে দেন ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে। সেই ব্যক্তি প্রথমত একজন ব্যক্তিমানুষ, যে আগে নিজেরই অস্তিত্ব খোঁজে তারই কেন্দ্র ও পরিধিতে এবং ক্রমশ সে সমষ্টির দিকে যাত্রা করে—যেখানে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র থাকে।
‘রাজা যায় রাজা আসে’ কাব্যের নাম কিছুতেই প্রথমে ঠিক করতে পারছিলেন না তিনি। আবদুল মান্নান সৈয়দকে বারবার জিজ্ঞাসা করতেন কী দেওয়া যায় নামটি। শেষে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি ছোটগল্প থেকে নাম নির্ধারণ করেন, রাজা যায় রাজা আসে। নামটি অসাধারণ এবং গভীর দর্শনজাত অনুভবকে বোঝায়। প্রথম কবিতাই আত্ম-উন্মোচন কিংবা আত্ম-বিশ্লেষণজাত। নিজের পরিচয় এবং তার স্তরে স্তরে ব্যবচ্ছেদ করে কবি সমাধান পাননি। দ্বন্দ্ব আছে পুরো কবিতাতেই। যখন বলা হয়েছে—‘সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে’ পরে সেই পাথরকেই বলা হয়েছে—‘এটা সেই পাথরের নাম নাকি? এটা তাই?’ প্রশ্নের ধরনে প্রথম সাত লাইন এভাবে আত্ম-উন্মোচনকে চূড়ান্ত করে তোলে। এক পর্যায়ে ‘জন্মদাতা জনকের রুগ্ন রূপান্তর’ এবং ‘তুই যার অনিচ্ছুক দাস!’ এ দুটি লাইন জেনেটিক ফর্মের আশ্চর্য এক ব্যাখ্যা প্রদান করে। আমরা চিরকালীন একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে স্ব স্ব অস্তিত্বকেই সেখানে পাই এবং সেটা ইচ্ছা করলেও কেউ ছেঁটে বাদ দিতে পারি না। শেষে এসে দ্বান্দ্বিক প্রবাহে অসমাপ্ত জিজ্ঞাসা আসে—‘তবে কি সে মানুষের সাথে সম্পর্কিত ছিল, কোনো দিন/ ভালোবেসেছিল সেও যুবতীর বাম হাতে পাঁচটি আঙুল?/ ভালোবেসেছিল ফুল, মোমবাতি, শিরস্ত্রাণ, আলোর ইশকুল?’ (আবুল হাসান)। কবি এভাবেই নিজেকে বোঝেন। বস্তুত এটাই ব্যক্তি বিশেষের আত্ম-জিজ্ঞাসায় পরিণত হয়। কবে, কখন, কোথায় একজন ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণ তৃপ্ত করেছে এমনটি কেউই হলফ করে বলতে পারে না তাই তাঁর দ্বন্দ্বটাও যেমন স্বাভাবিক তেমনি জিজ্ঞাসাও অসমাপ্ত থাকে। নিঃসঙ্গতার যে বাঁকগুলো আমরা সচরাচর যেভাবে ভাবি আবুল হাসান সে ধারণাগুলোকে তুলে ধরেননি। তিনি জীবনবোধের গভীরতল থেকে একা থাকা মানেই নিঃসঙ্গ হওয়া এমন ‘স্টেরিওটাইপ’ অবস্থাকে স্বীকার করেননি। ধরা যাক ‘বনভূমির ছায়া’ কবিতাটি। পিকনিকে যাবার জন্য বন্ধুমহল যে আয়োজন করে সেখানে সবার ক্ষেত্রেই সমান প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু সাঁকোর জলে যখন পরস্পরের মুখ প্রতীকীভাবে ভেসে উঠল তখনই বোঝা গেল আসলেই মানুষের অন্তঃকরণ বলে একটা ব্যাপার আছে। তাতেই ধরা পড়ে প্রতিদিনের জমানো ক্ষোভ, দ্রোহ। তাই কবি বলেন—‘কেউই আর আমাদের এই ভয়াবহ নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব, অসহায়বোধ আর মৃত্যুবোধ নিয়ে বনভূমির কাছে যেতে সাহস পেলাম না।’ কবি যে একাকীত্ব, অসহায়বোধ, মৃত্যুবোধের কথা এখানে বলেছেন, সেগুলো বাহ্যিকভাবেই প্রকাশ পায় কিন্তু অন্তঃকরণে তা দীর্ঘ এক দ্রোহের ফসল আর কবির বলার জগত্টা সেখানেই আলাদা। ‘পাখি হয়ে যায় প্রাণ’ কবিতার নস্টালজিক বর্নির বাওড়ের বৈকালিক ভ্রমণ, সরজু দিদির কপালের লক্ষ্মীতারা, বাবলুর চোখের সামুদ্রিক ঝড় এসব কিছু দেখতে দেখতে শেষে এসে মাঠে বৃক্ষের মতন বসে থাকা একা একজন লোককে পরিচয় করানো হয়। তিনি কবি নিজেই। টুঙ্গিপাড়ার বর্নি গ্রাম তাঁর নিজেরই স্মৃতিমুখর অংশ এবং ‘পাখি হয়ে যায় এই প্রাণ ঐ কুহেলি মাঠের প্রান্তরে হে দেবদূত!’— কথাটিও সেখানেই তাঁর প্রাণকে ডেকে নেয়। এ তো প্রত্যেক মানুষেরই জীবনের গল্প তাই নিঃসঙ্গবোধটাও ততটাই মৌলিক এবং নিজস্ব।
হুমায়ুন আজাদ ‘আমাদের মা’ কবিতায় বলেন, নিঃসঙ্গ এক মায়ের গল্প যার ঠোঁট থাকত শুষ্ক এবং অভিযোগ ছিল বাবা বোধ হয় মায়ের ঠোঁটে একটা চুমুও খায়নি কখনো। করুণ সে দৃশ্য। আবুল হাসান পরিচয় করান বাবার সঙ্গে যিনি একজন নিম্নমানের মানুষ। তিনি পুলিশের চাকরি করেও পুলিশি মেজাজহীন, ঘুষ খান না, অন্যায় করেন না, প্রকৃতিকে নিয়ে তাঁর কারবার। তাই তিনি পরাজিত, চামেলী হাতে ব্যর্থ এক মানুষ। ‘চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ’ কবিতার সেই বাবাও করুণ এবং বিমূর্ত। নিঃসঙ্গ কবি যে নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন তার প্রমাণ ‘জন্ম-মৃত্যু জীবনযাপন’ কবিতাটি। এ কবিতা যেন একখণ্ড ইশতেহার যেখানে সভ্যতার আদি থেকে এখন অবধি স্খলন ও মানবতাবোধের কথা বলছে। ‘মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না’—এ লাইনটি যে প্রাতিষ্ঠানিক দৌর্বল্যের কথা বলেছে এবং মৃত্যুর মতো চূড়ান্ত অবস্থানকেই ধ্রুব হিসেবে ব্যক্তি অস্তিত্বের জন্য ভেবেছে সেটাই পৃথিবীর সভ্যতা। কিছু প্রশ্ন যেমন—‘কী লাভ যুদ্ধ কোরে?/শত্রুতায় কী লাভ বলুন?/আধিপত্যে এত লোভ?’—এগুলো সামষ্টিকভাবে আমার, আপনার সবার প্রশ্ন। পৃথিবীর হানাহানি বা জীবনের অর্ধেক সময় সঙ্গম ও সন্তান উত্পাদনের জৈবনিক ব্যস্ততা থেকে তৈরি একঘেয়েমিতাকে দেখে দেখে কবিই যেন সেই বাস্তবতা থেকে উত্পন্ন মানবতার দৃশ্যের নিঃসঙ্গ দর্শক হয়ে যান। বলেন, ‘পৃথিবীতে তবু আমার মতোন কেউ রাত জেগে/নুলো ভিখিরীর গান, দারিদ্র্যের এত অভিমান দেখলো না।’ এত কিছুর পরেও আমরা বহুবচনজ্ঞাপক সামষ্টিক মানুষেরা নিজেদেরকেই প্রশ্ন করতে পারি না ‘ভালো আছি, খুব ভালো আছি?’। বৈশ্বিক চেতনার ধারা এভাবেই ছড়িয়ে পড়ে কবি হিসেবে শিল্পের আশ্রয়ে আবুল হাসানের পরম উদ্দেশ্য। তিনি গর্ব করেই বলেন, ‘শিল্প তো নিরাশ্রয় করে না’ (স্বাতীর সঙ্গে এক সকাল)। প্রেমকে ধারণ করে রোমান্টিক হয়ে বলেন, ‘তোমার মাথাধরাও আমি এক চুমুতে সারিয়ে দেবো!’ (শীতে ভালোবাসা পদ্ধতি)। ব্যক্তির খোলস যে সামাজিক জীবনে পদে পদে ছড়িয়ে থাকে, তাকে কবি অনুভব করেছেন। যত সখ্য বা ভালোবাসাই থাক না কেন বাস্তবতা এটাই—‘আমরা কেউই চিনি না কাউকে ব্যক্তিগত পোশাক পরলে’ (ব্যক্তিগত পোশাক পরলে)। নির্মলেন্দু গুণকে উত্সর্গিত ‘অসভ্য দর্শন’ কবিতায় রাজনীতিকে সূক্ষ্মভাবে উপাদান অনুযায়ী দেখান। যেমন—‘দালান উঠছে তাও রাজনীতি/দালান ভাঙছে তাও রাজনীতি!, মানুষ জন্মাচ্ছে তাও রাজনীতি/মানুষ মরছে তাও রাজনীতি!/জীবনের অস্তিত্বে ক্ষুধায় মরছি তাও রাজনীতি’। রাজনীতির সূক্ষ্মতা এমনই। পদে পদে ঠোকর বসানো থাকে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা শ্রেষ্ঠ অর্জন। আমাদের জাতিগত প্রেক্ষিতে কবি খুঁজে পান স্বাধীনতাকে কিছু ব্যক্তিবিশেষের অনুপস্থিতির বেদনাতে। ‘উচ্চারণগুলি শোকের’ কবিতায় লক্ষ্মী বউয়ের স্মৃতি, ছোটভাই, বোনের অনুপস্থিতিতে অন্য সত্তায় তাদের প্রতিস্থাপিত রূপ যেমন—রাজহাঁস, স্বাধীন পতাকা, তিমিরের বেদীর উত্সব ইত্যাদিতে ভাস্বর হয়ে থাকে। কাছের মানুষকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ কবি স্বাধীনতার অন্য সত্তায় পান তাঁর সান্ত্বনা। রাজা যায় রাজা আসে—কাব্য এভাবেই পূর্ণতা পায়।
‘যে তুমি হরণ করো’ (১৯৭৪) সার্বিক অর্থেই নিজেকে উজাড় করে স্বদেশচেতনায় উদ্বুদ্ধ কবির শিল্পবীজ রোপণের উদাহরণ। স্বদেশচেতনায় বৈশ্বিক ধাঁচও আছে, আছে ব্যক্তির টুকরো টুকরো কথা। সব মিলিয়েই তার ঐশ্বর্য। প্রথম কবিতায় অন্তর্গত দ্রোহ যেন বলছে—‘দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও আমি অনাবাদী রাখবো না আর আমার ভেতর!’ (কালো কৃষকের গান)। অনাবাদী না রাখার চেতনা প্রগতির কথা বলেছে নিজের ভেতর সেই আলোড়নকে ধারণ করে কবি চলে গেছেন গ্রিক কবি হোমারের কাছে যার স্পর্শে শিল্প-সাহিত্যের আদি পীঠস্থান গ্রিসও ধন্য হয়েছিল। সমস্ত সৃষ্টিহীন পরিবেশ দেখে ক্লান্ত, অবসন্ন সেই কবিকথক বলবে, ‘পুনর্বার আমাকে হোমার করো, সুনীতিমূলক এক থরো থরো দুঃখের/জামিন আমি চাষ করি এদেশের অকর্ষিত অমা!’ স্বদেশের অন্ধকারকে হূদয়ে উপলব্ধি করেই কবির এত আলোড়ন। নিজে নিঃসঙ্গ থেকেও স্বদেশ-স্বকালকে সুন্দর-সৌম্য দেখার আকাঙ্ক্ষায় বলেন, ‘উদিত দুঃখের দেশ, হে কবিতা, হে দুধভাত তুমি ফিরে এসো/মানুষের লোকালয়ে ললিত লোভনকান্তি কবিদের মতো/তুমি বেঁচে থাকো’ (উদিত দুঃখের দেশ)। মানুষের লোকালয় তাঁর কবিদৃষ্টির সচেতনতায় সেই স্বদেশের ছবি। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী এদেশের ছবি। যখন জীবনধারণের অর্থ হয়ে উঠেছিল সামগ্রিক সাধনায় দেশকে একটি পুনর্জাগরণের পথে নিয়ে আসা যাতে জাতিগত ঐক্য থাকে। পিতৃপুরুষের কাছে ঋণ শোধ করবার সুযোগও হাতছাড়া করতে চাননি কবি। যুগের অস্থিরতা এবং অসংলগ্ন প্রাতিষ্ঠানিকতা চিন্তার কারণ ছিল। তাই কবি ছুটি চেয়েছেন কখনো বা হুলস্থূল সমিতি প্রধান যুগ থেকে। সভ্যতার চেহারা যখন শুধুই স্খলনের হয়ে পড়ে আদি থেকে তখন পর্যন্ত সভ্যতার প্রতীকী ধ্বংসাবশেষকেও প্রতীকী করে বলেন, ‘চাঁদ/ফুল/নারী/শিল্প/সভ্যতার কুশপুত্তলিকা’ (বন্দুকের নল শুধু নয়)। বন্দুকের নলই সব ধ্বংসের কারণ নয় তার সঙ্গে মানুষের বুকে অন্য অনেক ব্যাথাও থাকে। এগুলো তারই চিহ্ন। ব্যাথার ওইসব চিহ্নও নিঃসঙ্গতার কথা বলে যা বস্তু ও অবস্তুর সংমিশ্রণে তৈরি হয়। ‘নিঃসঙ্গতা’ কবিতায়ও তার চিহ্ন আছে—‘একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী।/তোমার চিবুক ছোঁবো, কালিমা ছোঁবো না।’ পুরুষ যে গূঢ়ৈষার ধারক তাতে সে রমণী বলছে এক বালিকাকে এবং তা চিবুক বা শরীর ভোগ করছে কিন্তু বালিকার কলঙ্ককে ভাগ করে নিচ্ছে না। কী অমোঘ এই বাস্তবতা! আজকের সমাজের চিত্রও তো তাই।
‘পৃথক পালঙ্ক’ (১৯৭৫) কাব্য সমপর্কে হাসান হাফিজুর রহমান ষাটের দশকের অন্যান্য কবিদের উদ্দেশে বলেছেন—‘আবুল হাসান তাঁর এই বইয়ে কবিতার যে শিখরে পৌঁছেছে সেখানে আপনারা কেউ যেতে পারেননি।’ আবদুল মান্নান সৈয়দও পৃথক পালঙ্ক-কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছেন।
মোটের ওপর এ বিবেচনাগুলো ব্যক্তিবিশেষের ভাবনামাত্র। আবুল হাসানের কবিতার চূড়ান্ত কথা মূলত একটাই, তিনি আসলে প্রকাশিত, অগ্রন্থিত সব কবিতা মিলেই অসামান্য কবি। অভিজ্ঞতার জায়গাতে আরও ঋদ্ধ ও পরিণত তিনি এ কাব্যে। অভিজ্ঞতাসূত্রে বলেন—‘মানুষের যৌনসঙ্গম/মানুষীর যৌনসঙ্গম/লিঙ্গ/ঘৃণা/লোভ /সমস্ত মুচড়িয়ে আমি দেখেছি সুন্দর তারা আবার কুিসত’ (মেধা দূরে ছিলে বুঝতে পারোনি)। সমস্তকে দেখেই সুন্দর ও কুিসতের মধ্যকার পার্থক্যকে বুঝেছেন। নিবিড়ভাবেই ভয়ংকর সুন্দর নিঃসঙ্গ তিনি এ কাব্যে বলেন—‘চলে গেলে—তবু কিছু থাকবে আমার; আমি রেখে যাবো/আমার একলা ছায়া, হারানো চিবুক, চোখ, আমার নিয়তি’ (অপরূপ বাগান)। মায়ের পেটে ভ্রূণ থাকার অপার স্বাধীনতাই ভালো ছিল তার জন্য। তাই বাবার সূত্রেও জন্ম নেয়া পৃথিবীর রহস্যকে তার ভালো লাগেনি। ‘জরায়ু আমি জরায়ু ছিলাম’ কবিতার এই হাহাকার নিরেট ফাঁপা বেদনার কথা বলেছে। ‘ঝিনুক নীরবে সহো’-র মতো নীরবে ঝিনুক হয়ে নিঃসঙ্গতার বহর সাজানোতে তিনি পরম ও চরম আশ্রয় খুঁজেছেন। তাই অবাক হই না, যখন বলেন ‘হায় সুখী মানুষ বুঝলে না অসুখ কত ভালো’ (অসুখ)।
‘অগ্রন্থিত কবিতা’ (১৯৮৫)-য় এসে নিঃসঙ্গতাই যে ধ্রুব, তা বোঝার অবকাশ থাকে না। নিঃসঙ্গতা তাঁর কবিত্বের অজেয় উপাদান কিন্তু তিনি আশাবাদীও। বলেছেন—‘আমার অনলে আজ জাগো হে জীবন, জয়শ্রী জীবন!’ (জলসত্তা)। নিজেকে পুড়িয়ে হলেও সামষ্টিক জীবনে জয়শ্রী জীবনকে চান। কবি তো এমনই হবেন যিনি নিজের বেদনাকে সবার সঙ্গে ভাগ করবেন। আবার বলবেন—‘যে যাবার সে চলে যাক, তাকে আর বসিয়ে রেখো না’ (বনভূমিকে বলো)। আবুল হাসান কবিতাটি যেমন আত্ম-উন্মোচনের তেমনি খেদও আছে। ওটা খালি চোখে দেখে আঁচ করা ভীষণ শক্ত কিন্তু এই কবিতায় যখন বলে যান—‘ক্লাশভর্তি উজ্জ্বল সন্তান, ওরা জুড়ে দেবে ফুলস্কেপ সমস্ত কাগজ!/আমি বাজে ছেলে, আমি লাস্ট বেঞ্চি, আমি পারবো না!... আমি কি সাহসে লিখবো তবে সত্য পাখি, সচ্চরিত্র ফুল?’ এই স্তরগুলো পেরিয়ে শেষে বলে যান—‘আমার হবে না, আমি বুঝে গেছি, আমি সত্যি মূর্খ, আকাঠ!’ (আমার হবে না, আমি বুঝে গেছি)। কবিতাটি খালি চোখেই পুরোপুরি দৃশ্যমান বাস্তবতা তৈরি করে। বড় কথা, অতি পরিচিত বাস্তব দৃশ্য এটি, অ্যাকাডেমিক গলদকে প্রকাশ করেন এবং স্টেরিওটাইপ সত্য এক পরিবেশকে দিনের আলোর মতো স্বচ্ছ করেন। কবিতাটি ‘ক্লাশভর্তি উজ্জ্বল সন্তান’ কিংবা ‘আমি বাজে ছেলে’—এ দুটি কেন্দ্রেই বিভাজনটিকে দেখায়। এ সত্যতা শিল্প-সাহিত্যজগতেরও সত্যতা। প্রসঙ্গক্রমে হুমায়ুন আজাদের একটি কবিতার কথাও মনে পড়ছে। বলেছেন—‘কারো সাথেই খাপ খেলাম না/এ ঠোঁট-আঙুল/ পা থেকে মস্তক ও মধ্যবর্তী হূদপিণ্ড যখন যেখানে রাখি/সেখানেই সুচারু শান্তিশৃঙ্খলার মধ্যে জন্ম নেয় ঝড়-ত্রাস-বিপর্যয়’ (খাপ-না-খাওয়া মানুষ)।
আমরা উপলব্ধি করতে পারি অগ্রন্থিত কবিতা-র ঔজ্জ্বল্যেও কম নয়। আবুল হাসান নিঃসঙ্গ কবি সামগ্রিকভাবেই। খণ্ডিত ও অংশবিশেষের বিচারে নয়। আবার, নিঃসঙ্গ মানেই তিনি সমাজ ও রাষ্ট্রবিচ্ছিন্ন নন; বরং প্রবলভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রধারণকারী।
এলিজি আছে রিলকের ডুয়িনো এলিজি। আবুল হাসানের পাঠ্যতালিকায় তা প্রিয় ছিল। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘পাথরের ফুল’-ও এলিজি আর আবুল হাসানকে নিয়ে তাঁর বন্ধু কবি নির্মলেন্দু গুণেরও এলিজি আছে ‘ভালোবেসে যাকে ছুঁই/সেই যায় দীর্ঘ পরবাসে’ (হাসানের জন্যে এলিজি)। আবুল হাসান নিঃসঙ্গ হয়ে খুব অল্পেই দীর্ঘ পরবাসের বাসিন্দা হয়েছেন আর বাংলা কবিতা ঘরে তুলেছে উর্বর শস্য।
