একাত্তরের বীর সৈনিক কবি বেলাল মোহাম্মদ গত ৩০ জুলাই সাতাত্তর বছর বয়সে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। প্রচার বিমুখ এই মানুষটি ছিলেন অনেকের কাছে অচেনা। অথচ তিনি ঊনসত্তরের গণঅভুত্থান, সত্তরের সাধারণ নির্বাচন ও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সাথে ছিলেন সরাসরি জড়িত। তিনিই প্রথম চট্টগ্রামে সেই অগ্নিঝরা দিনে ডা. শফি ও মুক্তিযোদ্ধা মুশতারী শফির বাসায় একাত্তরের আরেক বীর সৈনিক আবুল কাশেম সন্দ্বীপকে নিয়ে স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করেন এবং তাঁর সহকর্মী দশজন শব্দ সৈনিক নিয়ে মুজিব সরকারের পরিচালনায় স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র চালু রেখে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখেন। তিনিই এই কেন্দ্রটির প্রথম পর্বে কালুরঘাটের নিরাপত্তা দেবার জন্য পটিয়ায় তত্কালীন ক্যাপটেন অলী আহমদের বাড়িতে অবস্থানরত মেজর জিয়াউর রহমান এবং তার প্লাটুনকে নিয়ে আসেন।
পঁচাত্তরের পর তিনি বেতারে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। চাকুরিরত বেতার প্রতিষ্ঠানে তিনি ছিলেন পর্দার আড়ালে। যথাসময়ে তাঁর পদোন্নতি হয়নি। উপপরিচালক পদে থেকেই তাঁকে অবসরে যেতে হয়েছে। তিনি তোষামোদি ও দালালিকে ঘৃণা করতেন। সত্য কথাটি বলতে পেছপা হতেন না। সারা জীবন ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, উদারচেতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। তিনিই প্রথম বঙ্গবন্ধুকে বলেছেন শ্রেষ্ঠবাঙালি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্রের তাঁর সহকর্মী ও বন্ধু আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, আবদুল্লাহ আল ফারুক, শরফুজ্জামান, সৈয়দ আবদুস শাকের, মোহাম্মদ ফারুক, নাসিমুল কাদের চৌধুরী, রাশেদুল হোসেন, আমিনুর রহমান, রেজাউল করিম চৌধুরী, মুস্তাফা আনোয়ার, কাজী হাবিব উদ্দিন প্রমুখ মুজিবনগরে পরম নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশ ও জাতির কাছে তাঁরা ছিলেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁরা দেশের সূর্যসন্তান। দেশ ও জাতির কাছে তাঁরা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। শুধু তাই নয়, এই কেন্দ্রে অংশগ্রহণকারী শিল্পী ও কথকরাও বাংলা মায়ের যোগ্য সন্তান ও সৈনিক।
বেলাল মোহাম্মদ মূলত ছিলেন একজন কবি। সারা জীবন তিনি কবিতা লিখেছেন। তাঁর তিরাশি সাল পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ: কবিতা নয়, পর্যায়ক্রম নেই, শুধু মিত্রাক্ষর ও সামনে আছে মুক্তিযুদ্ধ—বইগুলো কবিতার। চিন্তা ও চেতনায় তিনি ছিলেন সংগ্রামী। সারা জীবনই তিনি সংগ্রাম করেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা চল্লিশের অধিক। এর মধ্যে শতফুল শতরূপা, লাল মলাট, উপনয়ন, আমান টোলার পয়গাম, ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার, কমরেড মোজাফফর আহমদ, মরণজয়ী লাল মোহন সেন, আরেক মুক্তিযুদ্ধ, সাকিন সন্দ্বীপ, জয়বাংলা রেডিও, আমার প্রতিবাদের ভাষা, শয়তান, চিত্ররূপা, আমান টোলার সুফি, তীর্থযাত্রা রোজনামচা, গল্পের মতো, যেতে যেতে পথে, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও সন্দ্বীপ সন্দর্শন (সম্পাদনা) বিশেষভাবে উল্লেখ্য। স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র গ্রন্থটির বহু সংস্করণ হয়েছে। এই বইটি আমার ও সেলুবাসিতের অনুরোধে তিনি রচনা করেছিলেন এবং বন্ধু আজিজের ফুলদল প্রকাশনী থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো। সাহিত্যচর্চার জন্য তিনি বাংলা একাডেমীর সাহিত্য পুরস্কার এবং মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ২০১০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। পুরস্কারটি তিনি সংরক্ষণের জন্য বেতার কর্তৃপক্ষকে প্রদান করেন। এর আগে ১৯৭৫ সালের ২৫শে মার্চ অন্যদের সাথে তিনি বঙ্গবন্ধু পুরস্কারে ভূষিত হন।
বেলাল মোহাম্মদ ১৯৩৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপস্থ মুশাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মোহাম্মদ ইয়াকুব, মায়ের নাম মাহমুদা খানম। তিনি দক্ষিণ সন্দ্বীপ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন এবং বেশ ক’বছর মীরসরাইয়ের আমানটোলা দরবার শরীফের অবস্থান করেন। পরে দৈনিক আজাদীতে চাকুরি গ্রহণ করেন। এ বছরই তিনি চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রে স্ক্রিপ্ট রাইটারের পদে যোগদান করেন। একাত্তরে মুজিবনগর সরকার তাঁকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে অনুষ্ঠান সংগঠক হিসেবে নিযুক্তি প্রদান করে।
ব্যক্তিগত জীবনে বেলাল মোহাম্মদ ছিলেন সাদাসিধে মানুষ। শুভ্রবসনে এবং লুঙ্গিপরণে তিনি চলাফেরা করতেন। বিদেশ সফরেও এর ব্যতয় ঘটত না। সংগ্রামী এই মানুষটি ছিলেন বড়ই একা। অনেক আগেই স্ত্রী মারা যান। একমাত্র ছেলে আনন্দকে হারিয়ে তিনি জীবনের শেষ বয়সে ভাইয়ের কাছে থাকতেন। দীর্ঘদিন ছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বাসায়।
বেলাল মোহাম্মদ মানবধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। একটি ছিন্নপত্রে তিনি লিখেছেন: খেয়েপরে বাঁচা-বাড়া মানুষের স্বভাবধর্ম। এই মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্যই গণতন্ত্রের রাজনীতি। আর, অলৌকিক বিশ্বাস আমাদের যার যার নিজস্ব। সেটা নিয়ে যারা রাজনীতি করে তারা মানবতার দুশমন। এই দুশমনদের বিরুদ্ধে তিনি আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। বিচারও স্বচোক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন।
বেলাল মোহাম্মদ-এর স্মৃতির প্রতি আমারা শ্রদ্ধা জানাই। তিনি আমাদের হূদয়ে চিরকাল জাগরুক থাকবেন।
