মহাদেব সাহার কবিতা

হলুদ খামে নীল সমুদ্র

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৩, ১৯:৩৮
আগামী ৫ আগস্ট কবি মহাদেব সাহার ৭০তম জন্মদিন। কবিকে জন্মদিনের আগাম শুভেচ্ছা একদা যাযাবর বলেছিলেন, ‘বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ’—তা সত্য হতে চলেছে আমাদের এযুগের প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে। কিন্তু চিঠিপত্রের বিকল্প যতই আসুক, পত্রবিনিময়ের মূল তাত্পর্য বিজ্ঞানের কল্যাণে পূরণ হওয়ার নয়। তাতে কাজের দিকটি হয়তো সারে, তবে ভাবের দিকটি অপূর্ণই থেকে যায়। চিঠিপত্রের মাধ্যমে আমরা কাজের কথার ফাঁকে হূদয়ানুভূতি এবং প্রাণের কথাও প্রকাশ করি—যা বিজ্ঞানের অবদানে অসম্ভব। তাই ‘যত লিখে যাই, তবু না-ফুরায় চিঠিতো হয় না শেষ’—এই কাব্যগীতিতে যে অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে তার তুলনা নেই। একালে, এই একুশ শতকে প্রযুক্তির অভাবনীয় অপ্রতিরোধ্য উন্নতিতে চিঠিপত্র আর লেখা হচ্ছে না, হবে না আর। কিন্তু চোখ সজল হয়ে ওঠে এই ভেবে যে, পৃথিবীর কোনো ভাষাতেই বোধকরি ‘পত্রসাহিত্য’ বলে আর কিছু থাকবে না। বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী যে পত্রসাহিত্য, তার আর ধারাবাহিকতা থাকল না। তবে সামান্য হলেও সান্ত্বনা এখানেই যে, চিঠিপত্রের প্রসঙ্গে-অনুষঙ্গে মহাদেব সাহার অনেক কবিতা আছে—যা পত্রালাপের মধুর স্মৃতি আরও দীর্ঘদিন আমাদের স্মরণে থাকবে। চিঠি মহাদেবের কবিতার একটি প্রিয় প্রসঙ্গ, অন্যতম বিষয়। বাংলা ভাষায় চিঠিপত্র নিয়ে এত বেশি কবিতা বোধকরি অন্যকোনো কবি রচনা করেননি। তাঁর চারখণ্ডের কাব্যসমগ্রের সূচিপত্রে চোখ রাখলে এক মুহূর্তে পাওয়া যাবে অনেক পত্রবিষয়ক কবিতা : আজীবন একই চিঠি, চিঠি দিও, নববর্ষের চিঠি, চৈত্রের চিঠি, একটি বিষণ্ন চিঠি মাকে, একখানি চিঠির উত্তর, চিরকুট, তোমাকে লিখবো বলে একখানি চিঠি, স্বপ্নে তোমার চিঠি পাই, যদি কষ্ট হয়, তোমার উড়ন্ত চিঠি, একটি চিঠি দিও, আর কতো লিখবো চিঠি উড়াবো রুমাল, হারানো চিঠির দুঃখ, এখন আমার জন্য, ভুল বানানের চিঠি, মনে মনে কতো চিঠি লিখি, যে মেয়ে কখনো চিঠি পড়ে না, তুষারের চিঠি, হলুদ পাতার ঐ উড়ো চিঠি, প্রেমের প্রস্তুতিপর্ব, নববর্ষে তোমাকে কী বার্তা পাঠাবো। মহাদেবের চিঠি-বিষয়ক এই কবিতার তালিকা আরও দীর্ঘ হতে পারে। এছাড়া তাঁর আরও অনেক প্রেমের কবিতায় ‘চিঠি’ শব্দটি বার বার ঘুরে-ফিরে এসেছে। চিঠি পরিচয়ের প্রতীক, প্রথম প্রেম নিবেদনের প্রতীক, ভালোবাসার কথা জানানোর মাধ্যম। ভালোলাগা, ভালোবাসা, প্রিয়জনকে প্রীতির সম্ভাষণ জানানো এবং মুগ্ধতার প্রতীক হিসেবে তিনি চিঠিকে কবিতার ভাব ও বিষয় হিসেবে করে নিয়েছেন। এরকম বহু তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়কে তিনি শিল্পোত্তীর্ণ কবিতায় রূপান্তর করে পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। মহাদেবের একটি সুবিখ্যাত প্রেমের কবিতা ‘চিঠি দিও’ : করুণা করেও হলে চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও আঙুলের মিহিন সেলাই ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও, এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি। চুলের মতোন কোনো চিহ্ন দিও বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও... বর্ণনা আলস্য লাগে তোমার চোখের মতো চিহ্ন কিছু দাও! এমন ব্যস্ততা যদি শুদ্ধ করে একটি শব্দই শুধু লিখো, তোমার কুশল।... করুণা করে হলেও চিঠি দিও, ভুলে গিয়ে ভুল করে একখানি চিঠি দিও খামে... খুব মেঘ করে এলে কখনো কখনো বড় একা লাগে, তাই লিখো করুণা করেও হলে চিঠি দিও, মিথ্যা করেও হলে বোলো, ভালোবাসি। (কী সুন্দর অন্ধ) প্রেমিকার কাছ থেকে পত্রলাভের জন্যে এমন ব্যাকুলতা, এত হাহাকার করুণাময় নিবেদন কেবল প্রেমের অতলান্তিক গভীরতারই নির্দেশক। এসম্পর্কে দীপংকর গৌতমের মন্তব্য লক্ষ্যভেদী : একটা চিঠির জন্যে কী পরিমাণ আকুতি। যারা কবিতার ব্যাকরণ নিয়ে কাজ করেন এবং ওই মাপকাঠিতে কবিতার বিচার করেন, তাদের হাতে এ কবিতার ব্যবচ্ছেদ হলে হয়তো শিল্পের সন্ধান কিংবা শিল্পের কোনো গন্ধ-বাতাস পাবেন না। কিন্তু যে ছেলে আজ কোনো এক গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছে, শহরের রূঢ় বাস্তবতা যাকে প্রতিনিয়ত ফেলে দিচ্ছে কঠিন ও করুণ সব অভিজ্ঞতার দিকে, সামনে তার শুধু অন্ধকার—সমূহ অন্ধকার। পেছনে তার কোনো অবলম্বন নেই শুধু আছে স্মৃতি আর দহন। গ্রাম থেকে সে ফেলে এসেছে মেঘ, ফুল, নদী, সবুজ পাহাড়। যার জন্যে অপেক্ষা করে কপিলার কালো তিল, যার চুল সত্যি বিস্ময়ের মতো বিস্ময়—সৃষ্টি করে তার কাছে এ কবিতা কি শিল্পের বাধা-নিষেধ বা ব্যাকরণের নিয়মরীতি মানতে চাইবে? আর এসব অন্তর্গত টানাপোড়েনকে শৈল্পিক মাত্রায় উপস্থাপন করে কাব্যের এক ভিন্ন শৈল্পিক ধারা সৃষ্টির কাজে কবি মহাদেব সাহার কবিতা অনন্য। মাটি ও মানুষের একদম ভেতরের দহনকে শৈল্পিক ফর্মে রূপান্তর করণে তিনি অদ্বিতীয় আর এ কারণেই তাঁর কবিতা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে সর্বত্র এবং সৃষ্টি করেছে ভিন্ন মাত্রা। (মহাদেব সাহা : প্রকৃতি ও মানবিকতার প্রতিকৃতি, জনকণ্ঠ) দুই. মহাদেব সাহার চিঠি-বিষয়ক কবিতাগুলোর অধিকাংশই প্রেমানুভূতি-সঞ্জাত—তাঁর চিঠির নীলখামে-হলুদখামে ভরা আছে পর্বতপ্রমাণ বেদনার হিমবাহ, বিরহের গভীর সাগর। পত্রপ্রাপ্তি মানুষকে যেমন আনন্দ দেয়, স্মৃতিকাতর করে, তেমনি প্রিয়জনের চিঠি না-পাওয়ার বেদনা মানুষকে নিরন্তর আদিগন্ত প্রতীক্ষার পথে বসিয়ে রাখে। অনুভূতির বিচিত্র প্রকাশ সত্ত্বেও তাঁর চিঠি-বিষয়ক কবিতা যেমন স্মৃতিভারাতুর তেমনি বিরহকাতর। কয়েকটি উজ্জ্বল উদ্ধৃতি : কখন মেলবে ডানা সেই খাম,/বহুযুগের ওপার থেকে আসা শ্রাবণের মেঘের মতো/কখন আসবে এই চিঠি? ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... সহস্র বছর তোমার চিঠির জন্য বসে আছি/ব্যাকুল বালক, বলো কখন উড়বে সেই হলুদ সোনালি খাম;/ হলুদিয়া পাখি/ তোমার উড়ন্ত চিঠি, কাব্যসমগ্র/৩ \ পৃ. ৬৫) কথা ছিল তোমার সাথে প্রিয়/নীল খামে একটি চিঠি দিও। (একটি চিঠি দিও, কাব্যসমগ্র/৩ \ পৃ. ১২৭) আর কতো তোমাকে পাঠাবো নীলখাম আর কতো উড়াবো রুমাল তোমার পায়ের তলে আর কতো ঘাস হবো আমি! (আর কতো লিখবো চিঠি, উড়াবো রুমাল, কাব্যসমগ্র/৩ \ পৃ. ৪৩১) একদিন মায়ের ব্যাকুল চিঠি পেয়ে মনে হতো পৃথিবীর সব দুঃখ ভুলে গেছি আজ চিঠির বাক্স খালি কোনোখানে মায়ের চিঠির মতো সজলতা নেই। ভুল শব্দে কখনো যে এমন ব্যঞ্জনা হতে পারে ভুল বানানও যে কখনো এমন অর্থের মহিমা পেতে পারে সে কেবল ভুল শব্দে লেখা এই প্রেমের/চিঠিতে দেখা যায়। (ভুল বানানের চিঠি, কাব্যসমগ্র/৪ \ পৃ. ১৯৪) সবুজ চা আর সবুজ হূদয় সে আমাকে ক্যুরিয়ারে/পাঠিয়ে দিয়েছে। (তুষারের চিঠি, কাব্যসমগ্র/৪ \ পৃ. ৩২৬) মহাদেব সাহার পত্র-বিষয়ক কবিতাগুচ্ছে কেবল তরুণ-হূদয়ের তরল আবেগ-উচ্ছ্বাস বা কান্নাকাতর বিরহী মনের তপ্ত দীর্ঘশ্বাসই নিঃসরিত হয়নি; এর মধ্যে পরিশুদ্ধ জীবনের কথা, গভীর জীবনবোধের কথাও ব্যক্ত হয়েছে। প্রেমের প্রারম্ভিকপর্ব পত্রবিনিময়, চিঠি চালাচালি—প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ-মাধ্যমের আগে বাঙালি তারুণ্যে প্রেমের প্রথম পাঠ ছিল এভাবেই। এর সঙ্গে যুক্ত হতো গোলাপের পাপড়ি, সুগন্ধি কিংবা ফুল-তোলা রুমাল। সে-যুগ অতীত হয়েছে কিন্তু প্রেমপত্রের আবেদন ম্লান হয়নি মহাদেবের কবিতায়। তাই জীবন থেকে পাঠ নেয়া গভীর বোধের আলোকে তিনি একুশ শতকে লেখা কবিতায়ও বলেন : এ আমার প্রেমের প্রস্তুতিপর্ব, কেবল বাল্যশিক্ষা/হাতে নিয়েছি মাত্র অ আ ক খ, বর্ণমালা শেষ হবে, আ-কার, ই-কার শিখবো ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... তবেই তো প্রেমপত্র, তবেই তো অনন্তের কাছে রাত জেগে একখানি ভালোবাসার চিঠি, তবেই তো শুদ্ধ হওয়া দু’চোখের জলে। (প্রেমের প্রস্তুতিপর্ব, মাটির মলাট) তাঁর চিঠি-বিষয়ক কবিতায় আছে গভীর দার্শনিক বোধ : চিঠির শব্দের দিকে চেয়ে মাত্র পাঠ করে সম্বোধনটুকু আমি আরো সহস্র বছর এভাবে কাটিয়ে দিতে পারি, ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... এই স্বপ্নের চিঠির মধ্যে এমন কি লিখেছো তুমি, এমন কি পাঠিয়েছো অভিনব বার্তা বা বিষাদ— আমি পুনরায় বেঁচে উঠি কিংবা মরে যাই; আমার দুচোখ আকাশের মতো এই সুবিশাল চিঠিখানি ছাড়া আর কিছুই পড়ে না। (স্বপ্নে তোমার চিঠি পাই, কাব্যসমগ্র/২ \ পৃ. ২৫১) এসব কবিতা যেন মানব-মানবীর জীবন-রহস্যের গাঢ় ও সংবেদনশীল চিরন্তন রূপ। আবার তাঁর এ ধরনের কবিতায় নিহিত থাকে তাঁর জীবনভাবনা ও দেশ-সমাজ-প্রকৃতি-পরিবেশের কথাও। দুঃসহ সমাজজীবন, সভ্যতাবিধ্বংসী প্রকৃতি এবং মানুষের বিরূপ পরিপার্শ্বের কথা মহাদেব কখনো ভুলে থাকেন না। তাই নববর্ষের শুভেচ্ছা দেওয়ার আগে তাঁকে ভাবতে হয় : যে মেঘ থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হওয়ার কথা সেই মেঘ থেকে হয় বজ্রপাত, বলো, আমি তোমাকে এই নববর্ষে কী সুসংবাদ দেবো? চৈত্র শেষ না-হতেই এবার কালবৈশাখীর মাতামাতি টর্নেডো, শিলাবৃষ্টি, তুফান ... ... ... ... আমি যখনই ভালোবেসে হাত বাড়াই সবকিছু ভেঙে পড়ে; এই নববর্ষে আমি তোমাকে কী আনন্দবার্তা পাঠাবো? (নববর্ষে তোমাকে কী বার্তা পাঠাবো, কালো মেঘের ওপারে পূর্ণিমা) বিদীর্ণ জীবনে, বিধ্বস্ত সমাজে কোনো সুখবর নেই; নেই কোনো আনন্দের বার্তা—কেবলই বিলয়, বিনাশ এবং ভাঙনের পদধ্বনি চারপাশে। কোথাও স্বস্তি নেই, শুভ্রতা নেই, সুন্দরের শঙ্খধ্বনি নেই। কিন্তু কবির মনে প্রত্যাশা আছে স্বপ্নময় নতুন দিনের। আগামী নববর্ষে নতুন সূর্যোদয়ের প্রতীক্ষায় তিনি উন্মুখ—যখন যুগের চাকা ঘুরবে, নতজানু মানুষেরা মাথা তুলে দাঁড়াবে এবং শোষিত-বঞ্চিতরা পাবে শস্যের অধিকার। তাই নববর্ষে কবির প্রত্যাশা : বলো না কখন এই ক্ষীণ হাতে ঘুরবে যুগের চাকা কখন সত্যি- নতুন বছরে আসবে নতুন দিন, তুলবে তাদের গর্বিত মাথা যারা আজ নতজানু ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... কখন মানুষ পাবে এই দেশে শস্যের অধিকার নতুন বছরে সেই অনাগত নতুনের প্রত্যাশা বন্ধু, তোমাকে নববর্ষের সাদর সম্ভাষণ! (নববর্ষের চিঠি, কাব্যসমগ্র/১ \ পৃ. ২১৮) এসব কবিতায় কখনোবা মৃত্যুচিন্তাও উঁকি দেয়। বিরহের জীবন দীর্ঘ কিন্তু প্রেমময় জীবন সংক্ষিপ্ত। বিরহের আছে অন্তর্দহন আর প্রেমের পুষ্পিত কানন। প্রেম-বিরহের সমান্তরাল যৌগসত্তার কবি মহাদেব সাহা তাই ‘হলুদ পাতার উড়ো চিঠি’ কবিতায় বলেন : হলুদ পাতার এই উড়ো চিঠি পেয়ে মনে পড়ে গেল আজ পয়লা ফাল্গুন ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ... বকুল কুড়াতে কার দিন চলে যায়, চলে যায় সকাল-দুপুর; এইখানে হয়েছিলো ভালোবাসা, বিরহ বিষাদ সেই কাব্য লেখা আছে বসন্তের দোলপূর্ণিমায় আর কী চাওয়ার থাকে? বলেছে হলুদ পাতা এবার বিদায়। (কাব্যসমগ্র/৪ \ পৃ. ৩৫৯) প্রেমানুভূতি, ভালোবাসার স্মৃতি অক্ষয় ও মৃত্যুঞ্জয়। সার্থক প্রেমের আছে চিন্ময় প্রাপ্তি ও প্রশান্তির স্মৃতি আর ব্যর্থ প্রেমের বিরহবোধে থাকে জীবনভর নিরন্তর দহনজ্বালা। উভয় হূদয়ানুভূতিই আজীবন তাড়িত করে মানুষকে। রবীন্দ্র-প্রেমবোধের অমর বাণী—‘যদি পুরাতন প্রেম বাঁধা পড়ে যায় নবপ্রেমজালে’—সত্য হয় প্রেমিকের জীবনে তবে কী বোধ জন্মে তার মনে? পরিণত বয়সে সেই কৈশোরিক প্রথম প্রেমের স্মৃতি মানুষকে কীভাবে তাড়িত করে তার বর্ণনা দিয়েছেন কবি। বিভিন্ন সাক্ষাত্কারে, স্মৃতিচারণমূলক লেখায়, ব্যক্তিগত রচনায় বারবার মহাদেব সাহা বলেছেন, তাঁর কবিতা জীবন থেকে পাঠ-গ্রহণ-করা বোধের উত্সারণ, জীবনেরই কাব্যিক ভাষ্য। তাই এই কৈশোরিক প্রেমানুভূতিকে কবির নিজের জীবনাভিজ্ঞতার কাব্যরূপায়ণই বলা যেতে পারে। পরিণত বয়সে অতীত প্রেমের স্মৃতিচারণে কবির বোধ এরকম : হঠাত্ সেদিন হাতে পেয়ে চিরকুট নিমিষে সময় হয়ে গেল যেন লুট; পার হয়ে বহু বছরের ব্যবধান কানে ভেসে এলো হারানো দিনের গান। মনে পড়ে গেলো তোমার প্রথম খাম আদ্যক্ষরে লেখা ছিলো শুধু নাম, একটি গোলাপ আঁকা ছিলো এক কোণে র-ফলাবিহীন প্রিয় লেখা পড়ে মনে; খুব সাধারণ খাতার কাগজে লেখা লুকিয়ে পড়েছি, হয়নি সেভাবে দেখা তবু মনে আছে কোথায় কি ছিলো তাতে, এতোদিন পর চিরকুট পেয়ে হাতে আবার হঠাত্ কেঁপে ওঠে যেন বুক নিজেই তখন লুকাই নিজের মুখ; এই বয়সে একখানি চিরকুট তোলে শিহরণ, কম্পিত করপুট! (চিরকুট, কাব্যসমগ্র/২ \ পৃ. ৪৫) এভাবেই মহাদেব সাহা তাঁর চিঠি-বিষয়ক কবিতায় হারিয়ে যাওয়া পত্রালি-প্রেমের স্বরূপ চিত্রিত করেছেন। বর্তমানে মধ্যবয়সী প্রতিটি বাঙালির জীবনে অমলিন হয়ে থাকা প্রেমের স্মৃতিপুঞ্জ অক্ষয় হয়ে আছে তাঁর কবিতায় এবং তিনি উসকে দিয়েছেন সেই ছাইচাপা আগুন—উজ্জীবিত করেছেন প্রেমিক বাঙালি মনের সুপ্ত অগ্নিগিরি। তিন. চিঠিপত্র, নীল খাম, হলুদ কার্ড, ঠিকানা, ডাকঘর, ডাকবাক্সগুলো কবি মহাদেব সাহার খুব প্রিয় প্রসঙ্গ—মন-আনচান-করা বিষয়। এর ভেতরে থাকে মানুষের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হতাশা-প্রত্যাশার নিভৃত মনের কথা। তাই পত্রের মধ্যে তিনি পান প্রাণের গুঞ্জন, চিঠিতে চিত্তের চঞ্চল অভিব্যক্তি। প্রসঙ্গত চিঠিপত্র সম্পর্কে তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি উল্লেখযোগ্য : ‘চিঠি আমার খুব প্রিয়। চিঠি নিয়ে আমি অনেক কবিতা লিখেছি। সব মানুষই চিঠি পেতে পছন্দ করে, কিন্তু নিজে প্রায়শই চিঠি লিখতে চায় না। ব্যতিক্রম রবীন্দ্রনাথ, চিঠি যেমন পেয়েছেন, তেমনি লিখেছেনও। অন্তিম বয়সেও সকলের চিঠিরই তিনি সযত্নে উত্তর দিয়েছেন, আর প্রতিটি চিঠিই সাহিত্যমূল্যে ঋদ্ধ। সাধারণ চিঠিও তাঁর হাতে হয়ে উঠেছে অসাধারণ। এখনো তাঁর এই সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতে ও মৃত্যুর পর প্রায় সত্তর বছরের মাথায়ও তাঁর অজস্র অপ্রকাশিত চিঠি ছাপা হচ্ছে। দেখে কেবল বিস্ময়ই জাগে, বিশ্বাস হতে চায় না। মাঝে মাঝে কৌতুক করি, এসব চিঠি তো তাঁরই লেখা! আমাদের, বিশেষত একালের মানুষের, কর্মবিমুখতা, অলসতা ও অনীহা সীমাহীন। আমার মতো অলস লোকের যেখানে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় কাজই করা হয় না, সেখানে চিঠি লেখার তো কথাই ওঠে না। কত বছর যে চিঠি লিখি না, তা এখন স্মরণ করাও দুঃসাধ্য। স্কুলে যে লেটার রাইটিং বা পত্ররচনা শিখেছিলাম, মনে হয় আজ তাও ভুলে গেছি। এখন এই সেলফোনের যুগে চিঠি যেন হারানো দিনের স্মৃতি। কিন্তু ডাকঘর ও চিঠি—এই দুটি শব্দ আমাকে এখনো আগের মতোই আচ্ছন্ন করে, চিঠি ও ডাকঘরের মুখ আমি ভুলতে পারি না। আমার সংগৃহীত চিঠির ভাণ্ডার এমন কিছু নয়। বাক্সভর্তি চিঠির বান্ডিল আছে ঠিকই, কিন্তু বিখ্যাত লোকদের সঙ্গে আমার তো যোগাযোগের সুযোগই হয়নি, চিঠিও লিখিনি বিখ্যাত কাউকে। এমনকি যে দু-একজন গুণীজনের দুর্লভ ভালোবাসা ও চিঠি পেয়েছি, আমি এমনই অসামাজিক ও অলস প্রকৃতির লোক যে, তারও উত্তর দিয়েছি কি না সন্দেহ। এমন মানুষের কাছ থেকে কোনো পত্রসাহিত্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার আশা করা যায় না।’ (অপ্রকাশিত চিঠিপত্রের ভূমিকা, কালের কণ্ঠ, ঈদসংখ্যা ২০১০) এরই সঙ্গে বিগত ১৮ ফেব্রুয়ারি (২০০৮) নিউ ইয়র্ক থেকে কবিকে লেখা প্রাবন্ধিক ও গবেষক আবেদীন কাদেরের একটি চিঠির অংশবিশেষ তুলে দেওয়া হলো। এই ব্যক্তিগত পত্রে মহাদেব সাহার মতো আত্মনিমগ্ন, নির্জনতাপ্রিয় একজন কবির বিধ্বস্ত জীবন ও বিষাদগ্রস্ত মনের খানিকটা বস্তুনিষ্ঠ পরিচয় পাওয়া যাবে। প্রবাসী লেখক আবেদীন কাদের লিখেছেন : “...সেদিন রাতে আপনার বাড়ি থেকে এতটাই বিধ্বস্ত মনে ফিরেছি যে আর কোনোকিছুই করতে মন সায় দেয়নি। প্রায় পনেরো বছর পর আপনাকে এতটা বিষাদাক্রান্ত দেখব, ভাবিনি। প্রায় জীবন্মৃত অবস্থায় একজন কবির কঙ্কাল যেন হাঁটাচলা করছে। এ দৃশ্য সত্যিই অসহনীয় ছিল আমার জন্য। ... অন্যদিকে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ, প্রিয়তম কবি, ব্যক্তিগত শোকে এতটাই আচ্ছন্ন যে, তাঁর জীবন প্রায় বিপন্ন হতে চলছে, কিন্তু সেখানে আমার বাড়ানো হাত অনুপস্থিত, মানসিক উত্তাপটুকু থেকেও তিনি বঞ্চিত। এটা যে কতটা কষ্টের ও লজ্জার, তা লিখে বোঝানো যাবে না। এ বিষয়ে কোনো কিছু বলতে যাওয়াও হবে নির্লজ্জের অজুহাত প্রদর্শন, তাই সেদিকে না যাওয়াই ভালো। বরং নিজের ভেতরের বেদনাকে বাড়তে দেওয়া ভালো। যে জীবন থেকে আমি পালিয়েছি, তাকে নিয়ে কথা বলতে যাওয়া হবে আরও বড় অপরাধ, অক্ষমার্হ। আমরা অনেকেই হয়তো জলাশয় বলতে বুঝি মায়ের চোখ, কিন্তু হয়তো আপনার মতো করে নয়। পুরো দেশটাকে যদি মায়ের চিত্রকল্পে মুড়ে দেওয়া যেত, তাহলে হয়তো ভিন্নার্থ বাঙ্ময় হতে পারত। ... জগত্, পরিপার্শ্ব, বন্ধু-সান্নিধ্য ইত্যাদি থেকে সার্বক্ষণিক নির্বাসন নিয়ে আপনি ভালো করেছেন, নাকি নিজের ক্ষতি করেছেন, সে বিচার আমি করব না। তবে আমি মনে করি, এ নির্বাসন সত্যিই গভীরভাবে অর্থময় হয়ে উঠবে একমাত্র কবি-কর্মের মধ্য দিয়েই। কবির জীবন, সংসার, পিতৃসত্তা—এসব যতই বেদনার আকর হোক, কবিকে এসব উজিয়েই তো এগোতে হয়। নইলে কবির সঙ্গে সাধারণ মানুষের সত্তার বিভাজন রেখা একেবারেই ক্ষীণ অথবা অদৃশ্য হয়ে যায়। শিল্পের দাবি পিতৃত্বের দাবির চেয়ে মোটেই কম নয়, কিন্তু মানবিক শিল্পী হয়তো কখনোই এই দোলাচলতা থেকে রেহাই পায় না। আমার এখনো বিশ্বাস, আপনার জীবনের সীমাহীন দুর্বিপাকের পরও ‘কবির মুহূর্তগুলো’ এখনো ভীষণভাবে ফলদায়ক।” (মহাদেব সাহাকে লেখা চিঠি, ঐ) কবির আরও কয়েকটি স্মরণযোগ্য পত্র-বিষয়ক পঙিক্ত, যাতে আছে দেশান্তরী স্বজনদের জন্যে স্মৃতিকাতরতা ও দীর্ঘ অদর্শন তৃষ্ণা : তোমাকে লম্বা চিঠি লিখবো বলে পেপার মিলে/ছুটে গেলাম সেকথা কেউ জানলো না, এখন এখান থেকে ডাকঘরই উঠে যাচ্ছে পৃথিবীর মানচিত্রে শুধু কাঁটাতারের বেড়া সীমান্তে দাঁড়িয়ে তোমার জন্য রুমাল উড়াই, ভিসা অফিসের সামনে কতো কোটি কোটি/বছর দাঁড়িয়ে আছি আমার হাতে বৃষ্টির মতো ঝরে পড়েছে অন্ধকার এই নগণ্য কবির জন্য কে বলো/ফেসবুক খুঁজবে? (জলের কারুকাজ, মাটির মলাট)