যোগের সংযোগ

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৩, ১৯:৩৯
শিল্পীরা মূলত দর্শকদের সামনে দৃশ্য হাজির করেন। সেই দৃশ্য কখনো গতিশীল আবার কখনো বা স্থির। দৃশ্ ধাতু যার অর্থ দেখা। দৃশ্যের সাথে দেখার সম্পর্ক তাই অতীব ঘনিষ্ঠ। দেখার সাথে যেমন সামান্য এবং বিশেষ আছে, তেমনি দৃশ্যের ক্ষেত্রেও একই বিচার। শিল্পীরা সামান্যকে বিশেষ হিসেবে যেমন দেখাতে পারেন, তেমনি বিশেষকে দেখাতে পারেন প্রান্তিক রেখার ওপর দাঁড় করিয়ে। এরকম এক দেখার মুখোমুখি হয়েছি আমরা ঢাকা আর্ট সেন্টারে। চট্টগ্রামের আর্ট গ্রুপ ‘যোগ’-এর এবারকার আয়োজন ছিল ‘বকশির হাট’-এর ওপর। বকশির হাট চট্টগ্রামের অনেকগুলো পুরোনো বাজারের একটি। এর স্থাপত্যিক আদল কোনোক্রমেই হাট অর্থে আমরা যে ধারণা পোষণ করি তার সঙ্গে মেলে না। আসলে হাট কিংবা বাজারের ধারণাকে অতিক্রম করে যতটুকু আমরা দেখেছি, জায়গাটি মূলত বিবিধ কাঁচামাল-মশলার আড়ত হিসেবেই সমধিক খ্যাত। শিল্পীরা চেয়েছেন হাটের ঐতিহ্য এবং বর্তমান হাল হকিকতের সাথে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং নতুন অর্থ উত্পাদনের ক্ষেত্র সৃষ্টিতে ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি ওয়ার্কশপের মাধ্যমে ভিন্নতর কথোপকথন সৃষ্টি করা। রূপায়ন বড়ুয়া একজন মূকাভিনেতা। বকশির হাটের ওপর তিনি ফটোগ্রাফি করেছেন। শাসুল আলম, তাঁর দুই ছেলে, সবজির দোকান এবং ক্রেতাদের সাথে তাঁর সম্পর্ক চর্চার ডকুমেন্ট—এই হচ্ছে রূপায়নের ছবির বিষয়। ছবিগুলোতে আলো-আঁধারির খেলা বেশ চমত্কার। কিন্তু বিন্যাসের দিক থেকে ছবিগুলোতে তেমন উত্কর্ষতা সাধিত হয়নি। এছাড়া প্রত্যেকটি ফ্রেম অনেক বেশি স্বাতন্ত্রিক। এই ক্ষেত্রে মূলত কানেকটিং লিংক কম্পোজিশনই ঘটনার থেকে গল্পটি বের করে আনতে পারে। রিয়াদ মাহমুদ এখনো শিক্ষানবিশ। তাঁর ছবির বিষয়বস্তু পথ হলেও মেঘদূতের মতো রয়েছে পথের দুই ধারের বর্ণনা। দোকানের সামনে ক্ষান্ত ঠেলাগাড়ি। দোকানের সাটার নামানো। ঠেলাগাড়ির সামনে জালালি কবুতরের থমকে দাঁড়ানো, অর্ধচেতনের-অচেতনের মতো বৃদ্ধের ঘুমিয়ে থাকা, কর্মব্যস্ততার ভেতর মানুষের আবাসস্থলের দৃশ্য এইসব মানুষকে বড় বেশি নিঃসঙ্গ করে তোলে শান্তিপ্রিয় নাগরিক চোখ। জুবলী দেওয়ানের কাজের বিষয়বস্তু মাছ বিক্রেতা মালতি দাশ। সাবঅলটার্ন মহিলার দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততার নানান মুহূর্তকে তুলে এনেছেন তাঁর ক্যামেরায়। এত ব্যস্ততা এবং সকাল-সন্ধ্যা খাটুনির পরেও সদা হাস্যোজ্জল মালতি দাশ। চাঁদের কষ্ট শিরোনামে ফারহানা প্রিয়া তুলেছেন শিশুশ্রমের অমানবিক চিত্র, শিশুর যাপিত জীবনের গল্প। মিশুক এহসানের টাইম প্যাকেট। মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে বায়োস্কেপ লাইট কাচ এবং আলোকচিত্র। সনাতনি ফ্রেমের ভেতর যে অভিনবত্ব স্থাপনের সুযোগ ছিল, সে বিষয়ে শিল্পীর আরও কিছুটা অভিনিবেশের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়। সুচয়ন পালের আলোকচিত্রে উঠে এসেছে মানুষের ধর্মবোধ, ধর্মীয় স্থাপত্যের ধরন এবং ধর্মকেন্দ্রিক মানুষের জীবন যাপন সংস্কৃতি। হোসাইন মাহমুদ রকি-র কাজের টাইটেল চমত্কার—‘শামুকের খোলে লেখা থাকে সভ্যতার ইতিহাস’। মানুষের আবাস স্থল, ঘর-বাড়ির সম্মুখভাগ, দরজা-জানালা ইত্যাদির আলোকচিত্র। সোহরাব জাহান এবং রাজু আচার্য্যের কাজে উঠে এসেছে মাছ বিক্রেতার আলেখ্য, গীতালী ব্যান্ড পার্টির গল্প এসেছে কুমার বিশ্বাসের কাজে।ওমর ফারুকের কাজে ধরা আছে বকশির হাটের কতক মানুষের পোর্ট্রেটের গল্প। শায়লা শারমিন স্বাতীর কাজের শিরোনাম ‘পিতাম্বরের মশলার দোকান’। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পিতাম্বরের দোকানের ক্যারেকটার চিত্রণের মধ্যে দিয়ে শিল্পী তুলে এনেছেন দোকানের ঐতিহ্য এবং একই সাথে তার আভিজাত্যের গল্প। টাইটেল ছবির কম্পোজিশন অত্যন্ত চমত্কার। জিহান করিমের কাজের মাধ্যম ভিডিও। বিষয়—আলো। শুরুটা চমত্কার হলেও ধীরে ধীরে ক্লিশে উপস্থাপনের দিকে এগিয়ে গেছে কাজটি। টুকরো টুকরো আলোর উপস্থিতি শেষ পর্যন্ত আর প্রতীকে সীমাবদ্ধ না থেকে ন্যারেশন এবং ফর্মের পুনরাবৃত্তিতে ক্লান্তিকর ঠেকেছে। সময়টা এই ক্ষেত্রে আরও কিছুটা সংক্ষিপ্ত করার সুযোগ থাকতে পারত। এছাড়াও পুরো ছবিতে আলোটাই মুখ্য হয়েছে। আলোর ধরন থেকে উত্স বের করা ততটা সহজসাধ্য হয়নি। জাহেদ আলী চৌধুরী যুবরাজের কাজের শিরোনাম ‘সময় কি বিপদজনক/ নাকি সম্ভাবনাময়’। বাম হাতের দুটো আঙুল দিয়ে বিবিধ বস্তুর ওপর ফ্রেমিং করে বস্তুর মাত্রা এবং অস্তিত্ব ও তার আইডেনটিফিকেশনের চরিত্র শনাক্তকরণের দিকে এগিয়েছে গল্পটি। কাজটির সম্ভাবনা অত্যন্ত পরিষ্কার। সাইন অ্যান্ড সিগনিফিকেন্টের এক দুর্লভ মিথস্ক্রিয়া এই স্থাপনা শিল্পটি। ১৯ জুলাই শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি শেষ হয়েছে গত ২৯ জুলাই ২০১৩।