আ ব হ মা ন

আমার আছে জল

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৩, ১৯:৩৯
গাড়ির গ্যাস আর অর্কিড কিনতে কিংশুক নার্সারিতে গিয়েছিলাম। সেখানই চোখে পড়ে Love Bird, যার বাংলা নাম বাজগিরী। মনে হয় নানা রংয়ে রাঙানো কিছু পাখি। দোকানি বলল, স্যার নিতে পারেন ভালো পাখি। ওরা মাঝে মাঝে চুমো খায় যার জন্য ওদের নাম Love Bird। সেখান থেকে দুটো পাখি কিনে নিই। বারান্দায় কিছু অকির্ডের কাছে ওদের খাঁচাটি রেখে দিলাম। এরপর আরও দুটো। সকালে ঘুম থেকে উঠে ওদের খাবারটা নিজ হাতে দিই। একটু চেয়ে থাকি। মনে হয়, কাজটা বোধহয় নির্মম। এটা ভেবে নিজের কাছে খারাপ লাগে। মনে হয়, ওরা তো চায় আকাশের নীল। আবার কিংশুকে গেলাম। কথা প্রসঙ্গে বললাম, পাখিগুলো ছেড়ে দিই, দোকানি পাল্টা জবাব দিল, কেন? ওরা তো আপনাদের ভালো লাগার জন্য। আকাশে ছেড়ে দিলে ওদের বড় পাখিরা খেয়ে ফেলে। স্যার, আরও এক জোড়া দিয়ে দিই, ওরা আরও দুটো পাখি দিল। আকাশি আর সাদা রংয়ের, সাথে কিছু টিপ্স। মনে পড়ে যায় প্রায় চৌদ্দ বছর আগের কথা। তখন আমি মহসীন হলে থাকি। কাটাবন হয়ে ইস্টার্ন প্লাজার সামনে যাব। কনকনে শীতে সাথে ভালোবাসার মানুষ, কফি খাব বলে। হঠাত্ চোখ আটকে যায় গোলাপি রংয়ের একটা পাখির ওপর। রিকশা থামিয়ে কাছে গেলাম। হাতে নিলাম। সাথে থাকা মানুষটিকে বললাম, দেখ কী সুন্দর, একদম তোমার মতো। লজ্জায় হাসল সে। দোকানি বলল, রাজগিরী ভাই। দাম কত? একশ, আপনি নিলে একদাম আশি। সাথের মানুষটির দিকে তাকালাম। নেগেটিভ অ্যাটিচ্যুড। আবার রিকশায় উঠলাম। তার চুলের ঘ্রাণ আমার নাকে। হেসে বলল, নিজের থাকার জায়গা নেই, আবার পাখি পোষার শখ! দোকানির সেই ভাই এখন স্যার। ৪৬-এ পা দিয়েও একা। শরীরে নানা রোগের পদধ্বনি। বিদেশের ডাক্তারের পরামর্শ, একা থাকবেন না। মনে মনে ভাবি, ওই বুঝি ওরা আসছে। দূরের আকাশ দেখি। কিংশুকে যাওয়া আর অর্কিড কেনার সাথে আমার Love Bird-এর সংখ্যা ১০ ছাড়িয়ে গেল। Love Bird, সম্পর্কিত আরও কিছু টিপ্স নিলাম। শুক্রবারে নিজ হাতে গোসল করাই। প্রায়ই ব্যবসা বা অন্যান্য কাজের জন্য আমার দেশের বাইরে যেতে হয়। বাসার বুয়া আর ছেলেটিকে দোকানিদের দেওয়া পাখিদের যত্ন নেবার টিপ্সগুলো দিলাম। ছুটির দিনে একা বিষণ্ন মনে চা খেতে খেতে ওদের দেখি। আনমনে কথা বলি। মনে পড়ে যায়। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর লেখা গাছেদের নিয়ে লেখা বইটির কথা। তিনি নাকি গাছের সাথে কথা বলতেন। প্রায় ১৫ দিন দেশের বাইরে কাটিয়ে ঢাকায় এসে দেখি, পাখিগুলো অনেক শুকিয়ে গেছে। ওদের চেঁচামেচির শব্দ পেলাম। খাবারগুলো বুয়াকে দিলাম আর টিপুকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা কি পাখিগুলোর একটু যত্ন নাওনি? বুয়া আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, আপনি না থাকলে মামা ওরা খালি কাঁদে। আমি হাসলাম—একি কথা! আমি একটা ফ্ল্যাটে একা থাকি। নিচে বড় ভাই ও ভাইয়ের মেয়েরা বিভিন্ন ফ্ল্যাটে থাকে। টিপু আর বুয়া আমার ঘর পরিষ্কার করে। রাতে ফিরতে অনেক সময় ১১টা বেজে যায়। ঘরে এসে টাইয়ের নট খুলতে খুলতে পাখিদের কাছে যাই। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ওরা আমার পানে। অজানা শিহরণে অচেনা ভালোলাগা। এক সকালে অচেনা এক সুর আমার কানে আসে। এসি অন করে জানালার দিকে তাকাই। দেখি, পাখিগুলো আমাকে দেখছে। এবার মনে হলো, ওরা বুঝি আমার আসার প্রহর গুনে। বিছানায় এসে হাসলাম, যাক পাখি হলেও ওরা আমার পায়ের শব্দ শোনার অপেক্ষায় থাকে। বাইরে বের হবার আগে টিপুকে মনে করিয়ে দিলাম—পাখিদের রোদে ঢেকে দিবি আর বৃষ্টিতেও। এক শুক্রবার শুনি চিঁচিঁ ধরনের আলাদা একটা শব্দ। একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি, মাটির বাসার মধ্যে ফুটফুটে দুটো বাচ্চা। সে এক অদ্ভুত আনন্দ-অনুভূতি, ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। কী মায়াবী। আমি ওদের খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিলাম। বেশ কিছুদিন পর দেখলাম বাচ্চা দুটো দু-রংয়ের। একটা আকাশি আর একটা হলদে। নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারজানা আমার ভাইজি। ওর মেয়ের নাম পারমিতা। ও প্রায়ই বলে, দাদা ভাই, পাখির ছানা দুটো বের করো। আমি বলি, দাদা ভাই, ওদের বের করব, আর একটু বড় হোক। তারপর কেক কাটব। ঢাকা থেকে দক্ষিণে ২৫০ কিলোমিটার দূরে আমি একটি বাগান বাড়ি বানানোর চেষ্টা করছি। নাম দিয়েছি ‘স্বপ্ন চূড়া’। সেখানে আমি সাধারণ মানুষের জন্য কিছু ব্যবস্থা রাখার চেষ্টা করছি। যেমন—ফ্রি এডুকেশন ফ্রি হেলপ কেয়ার আরও সামান্য কিছু, যা সবই মানুষের জন্য। এখন ভাবছি ‘স্বপ্ন চূড়া’র কিছু অংশে রাখব আমার Love Bird-এর অভয়ারণ্যের জন্য জায়গা। কি জানি বিধাতা কতটুকু করতে দেয়। তারপরেও মনে হয়, মানুষ যেমন মানুষের জন্য তেমনি যেন মানুষ হয় প্রাণিকূলের জন্যও। হুমায়ূন আহমেদ-এর ‘আমার আছে জল’ উপন্যাসটা পড়েছিলাম। সেখানে নায়িকা বোধ হয় ভালোবাসা জনিত কারণে পুকুরে ঝাঁপিয়ে মারা যায়। এবারের ইউরোপের সেরা গান ‘Tears of my Eye’, তাও চোখের জল নিয়ে। মাঝরাতে আমি যখন আমার Love Bird-গুলোর কাছে যাই, আমার চোখ দুটো জলে ভিজে যায়। এর কারণ আমি জানি না। কিন্তু চোখের জল তো বাঁধ মানে না। আর সে জল নিয়েই রাত ভোর করে লিখলাম, ‘আমার আছে জল’।