আমেরিকার সর্বোচ্চ সাহিত্যপুরস্কারের তালিকায় ইউক্রেনের কবি
আমেরিকার সর্ববৃহত্ পুরস্কার ‘নিউস্ট্যাড ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর লিটারেচার’-এর জন্য মনোনীতদের মধ্যে সংক্ষিপ্ত তালিকায় রয়েছেন ইউক্রেনের অডেসায় জন্মগ্রহণকারী কবি ইলিয়া ক্যামিনস্কি। তিনিই প্রথম ইউক্রেনের অধিবাসী হয়ে এ কৃতিত্ব অর্জন করেন। ১৮ জুলাই ‘নিউস্ট্যাড ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর লিটারেচার’-এর ওয়েবসাইটে এ ঘোষণা প্রদান করা হয়। তিনি ওডেসিতে ১৯৭৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৩ সালে বাবা-মায়ের সাথে আমেরিকায় উদ্বাস্তু হিসেবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর ‘ড্যান্সিং ইন ওডেসা’ প্রথম প্রকাশিত ইংরেজি কবিতার বই। ২০০৪-এ প্রকাশিত হওয়ার পর তা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এমনকি তখন ক্যামিনস্কিকে রাশিয়ার বিখ্যাত কবি ‘জোসেফ ব্রডস্কি’র সাথে তুলনা করা হয়। এ পুরস্কারের আর্থিক পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার ডলার। আগামী ১ নভেম্বর পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে।
পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় সাইন্স ফিকশন
অবাক হবার বিষয়, কীভাবে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত ‘প্যাপার মিন্যাজিরেই’ সাইন্স ফিকশন চার লক্ষ কপি বিক্রি হয়? লিউ সিজিন-এর ‘থ্রি বডি ট্রিউলজি’ এ ধরনের উজ্জল দৃষ্টান্ত। ‘ক্যান লিউ’-এর প্রথম ব্যাতিক্রমধর্মী তারায় বসবাসরত জাতিকে নিয়ে লেখা সাইন্স ফিকশন ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়ার পূর্বে তেমন বিক্রি হয়নি। ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়ার পরপরই ক্যান লুই-এর ‘প্যাপার মিন্যাজিরেই’ প্রথম প্রকাশনা হিসেবে পৃথিবীর সাইন্স ফিকশনের তিনটি বড় বড় পুরস্কার ‘নেবুলা’, ‘হুগো’ ও ‘ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ড, জিতে নেয়। তিনিই প্রথম ‘দ্য থ্রি বডি প্রবলেম’ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন, যা সাইন্স ফিকশন জগতের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
সুইডেনের নকল থ্রিলারের নকল আলোচনা
সুইডেনের মেট্রো রেল-এ বিজ্ঞাপনী পোস্টার থেকে শুরু করে পত্রিকায়, সর্বত্র—জনপ্রিয় সুইডিশ থ্রিলার ‘টসবেত বলি ক্র্যাসনে’ ‘রেড ইজ দ্য কালার আব পেইন’ ইভা হেনসনের লিখিত বইয়ের আলোচনা দেখা যায়। অনুবাদ করা এই নকল সুইডিস থ্রিলারগুলো হয়তো ল্যাটিন বা রাশিয়ার কোনো লেখকের লেখা। এমনকি এর গ্রন্থসত্ত্বও রাশিয়া বা অন্যদেশের, যা এক দেখাতেই সহজেই বোঝা যায়। ‘ইভা হ্যানসন’ নামে সুইডিস কোনো লেখক নেই। অথচ তার নামে অসংখ্য বই প্রকাশিত হচ্ছে। একটু ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, বইয়ের কভারে পত্রিকার আলোচনা ও উদ্ধৃতি সবকিছুই নকল। এভাবে সুইডেনে অনেক বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে যে, বইটি নিউ ইর্য়ক টাইমসের সর্বোচ্চ বিক্রির তালিকায়। আর কেউ এটা লক্ষ করে না যে, এসব সত্য নয়।
সাহিত্যে পারিবারিক নিন্দার খেসারত
নরওয়ের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক কার্ল অভ নুসগার্ড নিজ পরিবার নিয়ে ‘মাইন ক্যাম্প’ উপন্যাস রচনা করেন ২০০৯ সালে। ৪০ বছর পর্যন্ত তিনি সাহিত্যচর্চা করেও ততটা খ্যাতি লাভ করেননি। তারপর হঠাত্ সিদ্ধান্ত নিয়ে লেখা এই বইয়ে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তিনি বইতে তাঁর খিটখিটে মাদকাসক্ত দাদি, পিতার ঠান্ডা পৈশাচিক চরিত্র, স্ত্রীর ভয়ঙ্কর হতাশামূলক চরিত্রসহ পারিবারিক জীবনের অনেক বিষয়ই তুলে ধরেন। লেখার সময় তাঁর মা বলেন, ‘অনেক হয়েছে। নিজের পরিবারের সম্মান নিয়ে একটু ভাবো’। লেখা শেষ হলে তিনি পরিবারের সদস্যদের পাণ্ডুলিপিটি দেখান। বাবার বিতর্কিত চরিত্রটি রেখে সবার নাম পরিবর্তনের অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি এতে অস্বীকৃতি জানান। এতে পরিবারের সকলের সাথে তাঁর সর্ম্পক ছিন্ন হয়। এমনকি তাঁর ভাইও সর্ম্পক ছিন্ন করে। আর স্ত্রী রেডিওতে এর বিরুদ্ধে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে জানায় যে, ‘নুসগার্ড ও আমার মাঝে কোনোদিন প্রেমের সর্ম্পক ছিল না’।
অনেক সমালোচক নরওয়ের এই লেখকের ‘মাইন ক্যাম্প’-কে আত্মরতি বলে উল্লেখ করে। তারপরও বইটি প্রকাশিত হলে চার লক্ষ পঞ্চাশ হাজার কপি বিক্রি হয়। নরওয়ের অন্যতম সর্বোচ্চ বিক্রিত এই বই ইতিহাসে শক্ত অবস্থান দখল করে নিয়েছে।
‘দ্য ম্যান বুকার প্রাইজ’-এর রাজনীতি
২৩ জুলাই সকালে ‘দ্য ম্যান বুকার প্রাইজ’-এর জন্য প্রস্তাবিত পুরস্কার গ্রহীতার তালিকা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রাথমিক বিচারে মোট ১৫১টি উপন্যাসের নাম তালিকায় স্থান পেয়েছে। প্রাশাসনিক ঘোষণায় জানানো হয়েছে, এত বড় তালিকা বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে না। অন্যরকম আয়োজনের এই প্রচেষ্টার মাঝে একধরনের অসদুদ্দেশ্য আছে। কারণ পুরস্কার বিজয়ীকে ৫০,০০০ ইউরো প্রদান করা হয়। আর এ ব্যাপারে গুঞ্জনও রয়েছে—পুরস্কার বিজেতাকে প্রাপ্ত অর্থের একটি বিশাল অংশ বিচারকদের সম্মানী স্বরূপ দিতে হয়। গার্ডেয়িনারে প্রকাশিত ২০১১ সালের রিপোর্টে এর সত্যতা প্রমাণিত হয়। অন্যদিকে এ পুরস্কার প্রাপিতে লেখকের ক্ষমতাও বেড়ে যায়। কেননা পুরস্কার প্রাপ্তির পর উপন্যাসের সাহিত্যিক মান বৃদ্ধির তুলনায় লেখকের বই বিক্রি বেড়ে যায়। যেমন—২০০২ সালে ইয়ান মার্টাল-এর বই ‘দ্য লাইফ অব পাই’ বিক্রি পুরস্কার প্রাপ্তির সপ্তাহে ১১১৮% বাড়ে। ২০১০ সালে হাওয়ার্ড জ্যাকবসন-এর বই বিক্রি ১৯১৮% বাড়ে। ২০০৮ সালে অ্যারাভিন্দ অ্যারিগা-এর বই ১৬৩৫%বাড়ে। কিন্তু নোবেল পুরস্কার বিজয়ীও এ সুযোগ পান না। কেননা, তিনি হয়তো অন্য কোনো ভাষার, আর তাঁর লেখার একজন ভালো অনুবাদকের প্রয়োজন পড়ে। তাই সাহিত্যের উত্কর্ষতার তুলনায় বাণিজ্যই ‘দ্য ম্যান বুকার প্রাইজ’-এর প্রধান বিষয়।
গ্রন্থনা ও অনুবাদ :শামস আরেফিন
