পুরস্কার নয়, কাজ নিয়ে ভাবনা

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৩, ২২:০০
অস্ট্রেলিয়া টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক হিসেবেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেছিলেন জর্জ বেইলি। একটা দিক থেকে বেইলির এই রেকর্ড অনেক আগেই ছুঁয়ে রেখেছেন আমাদের নাঈম ইসলাম। জিম্বাবুয়ে ‘এ’ দলের বিপক্ষে প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে অভিষেক হয়েছিল তার অধিনায়ক হিসেবে! জর্জ বেইলির সঙ্গে নাঈম ইসলামের আরো একটু মিল আছে—দুই জনই দলের জন্য দারুণ কার্যকর ক্রিকেটার; কিন্তু কী অদ্ভূত ভাগ্যের ফেরে ঠিক তারকা স্বীকৃতি মেলে না তাদের। নাঈমের সমস্যাটা তো আরো একটু বেশি—রানের পর রান করেই ওই ভাগ্যের ফেরে পড়ে জাতীয় দলে নিয়মিতই হতে পারছেন না! গতকাল প্রসঙ্গ তুলতেই নাঈম একটু হাসলেন। তিনি আসলে ভাগ্যের ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে খুব একটা কথা বলতে রাজি নন। ভাগ্যকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়েই বললেন, ‘ধরুন, কখনো ইনজুরি, কখনো টিম কম্বিনেশনের কারণে বাদ পড়ছি। এখন এগুলোর ওপরে আমার তো কোনো হাত নেই। আমার যেটা করার আছে, সেটাই করতে চাই—পারফরম করে যেতে চাই।’ এই পারফরম করার মন্ত্র নিয়েই আগামীকাল জাতীয় দলের তারকায় খচিত বাংলাদেশ ‘এ’ দলের সহ-অধিনায়ক হিসেবে দীর্ঘ ইংল্যান্ড সফরে রওনা দেবেন নাঈম ইসলাম। অন্য কেউ হলে অনায়াসে বলে দিতেন, এখানে ভালো করে আবার জাতীয় দলে ফেরার লক্ষ্য নিয়ে ইংল্যান্ডে যাচ্ছেন। কিন্তু নাঈম ইসলাম এভাবে ভাবতেই চান না। তার হিসাব সোজা সাপটা। ইংল্যান্ড সফরে কী করতে চান, সেটা পরিষ্কার। কিন্তু পুরস্কার হিসেবে কী পাবেন, তা ভাবেন না, ‘ব্যাটিংয়ে ৪০ থেকে ৫০ গড়ে কমপক্ষে রান করতে চাই এবং বল হাতে যতো বেশি সম্ভব উইকেট নিতে চাই। আসল কথা, আমাকে ভালো খেলতে হবে। কিন্তু ভালো খেললে পুরস্কার হিসেবে কী পাবো, সেটা ভাবা আমার কাজ না। আমার কাজ ব্যাটে-বলে পারফরম করা।’ পারফরম করতে নাঈম ইসলামের সেই ছোটবেলা থেকেই কোন কসুর নেই। প্রথম নজর কেড়েছিলেন ২০০৩ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশ সেবার প্লেট চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল এই নাঈমেরই এক মারদাঙ্গা ইনিংসে ভর করে। ঘরোয়া ক্রিকেটে শুরুতে মারাদাঙ্গা ব্যাটিং আর পার্টটাইম অফস্পিনার বলেই পরিচিত ছিলেন। বড় বড় ছক্কা মারতেন বলে ঘরোয়া ক্রিকেটে লোকজন তাকে ‘ছক্কা নাঈম’ বলে ডাকতেও শুরু করল। আবার প্রথম শ্রেণির ঘরোয়া ক্রিকেট শুরু করার পর একেবারে অন্য এক চেহারায় আবির্ভূত হলেন নাঈম। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য যেটা বিরল উদাহরণ, সেই উইকেটে এক-দুই দিন কাটিয়ে দেয়াটাকে অভ্যেসে পরিণত করে ফেললেন। ফলও পেলেন; ২০০৪ সালে অভিষেকের পর থেকে ৬৮টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে ৩৯০৯ রান করেছেন; এর মধ্যে ১০টি সেঞ্চুরি ও ২০টি ফিফটি আছে নাঈমের! নাঈমের এই দুই রূপই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দেখেছে। ২০০৮ সালে আইসিএল কান্ডের পর ওয়ানডে অভিষেক। তারপর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই ঝড়ো ৭৩ রানের ইনিংস থেকে শুরু করে সর্বশেষ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজেই পঞ্চাশ রানের ম্যাচ জেতানো অপরাজিত ইনিংস। টেস্টেও ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরম্যান্সের অনুবাদ খানিকটা হলেও করতে পেরেছেন। ৮ ম্যাচে ৩২ গড়ে ১১১০ রান; একটি ফিফটি ও একটি সেঞ্চুরি। সেঞ্চুরিটি করেছেন সর্বশেষ সিরিজেই; ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। একটা ব্যাপার তাহলে দেখুন—নিজের খেলা সর্বশেষ সিরিজেই দুটো বলার মতো ইনিংস; একটা টেস্ট সেঞ্চুরি। তারপরও পরের দুটো সফর; শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়েগামী দলে নেই নাঈম! কেন? প্রথমে ইনজুরি, তারপর টিম কম্বিনেশন। ওই সেই ভাগ্য! নাঈম অবশ্য ভালো করেই জানেন, তার পারফরম্যান্স যদি এমন চলতেই থাকে, তাহলে ভাগ্য একটা সময় নিয়মিতই তার দিকে ফিরে আসবে, ‘দেখুন, আমি আসলে এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে; এমন করে ভাবিই না। আমি যদি ভালো পারফরম করতে পারি, তাহলে এমনিই জাতীয় দলে নিয়মিত হবো।’ এখন এই পারফরম করার ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা হল ইংল্যান্ডের কন্ডিশন। বাংলাদেশি একজন স্পিনিং অলরাউন্ডারের জন্য, পুরো দলের জন্যই এটা যে বিরাট চ্যালেঞ্জিং একটা ব্যাপার হবে তা নাঈম জানেন। তারপরও আশাবাদী তিনি, ‘ইংল্যান্ডে গ্রীষ্মের এই সময়টায় খেলা তুলনামূলক আমাদের জন্য একটু সহজ। এ সময় অতো বেশি নতুন বল মুভ করবে না, কিছুটা টার্নও কোথাও কোথাও পাওয়া যাবে। আর মূল সিরিজের আগে আমরা বেশ কয়েকটা ম্যাচ খেলবো। ফলে আমি ভালো ফলাফলের ব্যাপারে আশাবাদী।’ নাঈম দলের সহ-অধিনায়ক। ফলে আশাবাদী তাকে হতেই হবে। নাঈম দল নিয়ে নানারকমেই আশাবাদী। বিশেষ করে তার অধিনায়কের ব্যাপারে খুবই উচ্চকণ্ঠ এই অলরাউন্ডার, ‘অমি (জহুরুল ইসলাম) খুবই ভালো ছেলে, অধিনায়ক হিসেবেও খুব ভালো। ও অনেক ভালো করবে বলেই আমার বিশ্বাস। আমাদের সর্বোচ্চ সমর্থন পাবে সে।’ সবমিলিয়ে আশাবাদী এই নাঈমের কাছ থেকে আরেকটা আশা জাগানিয়া সময় দেখার অপেক্ষা এখন।