সবুজ শিল্পায়নের অনন্য উদাহরণ দেশের একমাত্র বেসরকারি ইপিজেডের উন্নয়ন কার্যক্রম ঝুলে আছে দেড় যুগ ধরে। দিন যায়, সরকার বদল হয়; কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগের এই ইপিজেডের ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসে না। অথচ সরকারই ডেকে এনে জায়গা দিয়েছে। আইন করেছে বেসরকারি ইপিজেডের জন্য। এখন বাস্তবায়ন করতে দিচ্ছে না। সরকারেরই নানা বিভাগ থেকে নানারকম ঝামেলা সৃষ্টি করায় উন্নয়ন বঞ্চিত কোরীয় এই ইপিজেডের সম্ভাব্য বিনিয়োগ চলে যাচ্ছে মায়ানমার, চীন ও ভিয়েতনামে। কিন্তু কেন? এর কোন সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কর্ণফুলি নদীর তীরে কোরীয় ইপিজেডের কার্যক্রম পুরোদমে শুরু করা গেলে প্রায় ৬ লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হতো। এখনো বিদ্যমান কারখানাগুলোতে যারা কাজ করছেন তাদের প্রায় সবাই স্থানীয়। এরা হয়তো দীর্ঘদিন বেকার ছিলেন কিংবা স্বল্প শ্রমে মজুরি বিক্রি করতেন। এরকম আরো বহু লোকের কর্মসংস্থান হতে বঞ্চিত রেখে দেশের কি লাভ হচ্ছে সে প্রশ্নটি কার কাছে কে রাখবে? যেখানে একথা স্বতঃসিদ্ধ যে, বিদ্যমান বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যদি সন্তুষ্ট হয় তবেই অন্যরা বিনিয়োগে এদেশে এগিয়ে আসবে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেড় যুগেও জমির মালিকানাস্বত্ব পায়নি এই ইপিজেড। ফলে নামি-দামি বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এ শিল্প পার্কে বিনিয়োগ করতে এসে ফিরে যাচ্ছে। ইপিজেডটি পরিচালনার অনুমতি (অপারেশনাল লাইসেন্স) পাওয়ার ছয় বছর পরও এখানে গ্যাস সংযোগ দেয়া হয়নি। সমপ্রতি বিদ্যুত্ সংযোগ দিলেও ছয়দিনের মাথায় তা বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। নানামুখী বাধার কারণে প্রকল্প এলাকায় কারখানা ভবন ও শ্রমিকদের জন্য আবাসন নির্মাণের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সময়মতো ভূমির মালিকানাস্বত্ব পাওয়া গেলে এবং শুরু থেকে এ ক্রমাগত বাধার সম্মুখীন না হলে গত দেড় দশকে কোরিয়ান ইপিজেডে এক লাখ লোকের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হতো। আরও প্রায় দুই লাখ লোক পরোক্ষভাবে এই ইপিজেড থেকে উপকৃত হতো। ২০১০ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের বোর্ড অব গভর্নরের সভায় লিজের আওতায় জমির মালিকানা কোরিয়ান ইপিজেডের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু সে সিদ্ধান্ত আজও কার্যকর হয়নি।
বাংলাদেশ প্রাইভেট ইপিজেড এ্যাক্ট- ১৯৯৬ অনুসারে কোরিয়ান ইপিজেড গঠন করার পর ১৯৯৯ সালে জমি হস্তান্তর করা হয় এ ইপিজেডের কাছে। তারও প্রায় আট বছর পর ২০০৭ সালের মে মাসে এ ইপিজেডে বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার (অপারেশনাল) লাইসেন্স প্রদান করা হয়। কিন্তু বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হলে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী প্রয়োজন পরিবেশ ছাড়পত্র। ইয়াংওয়ান কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করে ২০০৩ সালে। তারা সেই লাইসেন্স পায় আবেদনের ছয় বছর পর ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে। এরপর ২০১২ সালের মার্চ মাসে পরিবেশ লাইসেন্স বা ছাড়পত্র বাতিল করা হয়। সেইসঙ্গে পাহাড় কাটার অভিযোগে ইপিজেডের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। অথচ ইপিজেড কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা কোন পাহাড় কাটেনি। বরং সরকারি নির্দেশিত পরিমাপের চেয়েও বেশি উচ্চতা বজায় রেখে তারা উন্নয়ন কাজ চালাচ্ছিল। তবে পরিবেশের লাইসেন্স ফেরত দিলেও এখন পর্যন্ত মামলা প্রত্যাহার করেনি। বরং প্রতিনিয়ত হুমকি দেয়া হচ্ছে মামলার চার্জশিট দেয়া হবে মর্মে।
কোরিয়ান ইপিজেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান নাসির বলেন, বাংলাদেশের পরিবেশ আইনে কোনটা পাহাড়, আর কোনটা টিলা-ঢিবি তা চিহ্নিত করা নেই। তবে কেইপিজেডকে দেয়া ছাড়পত্রের নির্দেশনায় কোন পাহাড়-ঢিবি বা টিলা কতটা কাটা যাবে তা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আমরা কোন পাহাড় কাটছি না। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য রেখে দিয়েছি। এগুলোতে গাছ লাগানো হয়েছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে প্রকল্প এলাকায় ছয়টি ভবনে শতভাগ রফতানিমুখী জুতা কারখানা চালু করা হয়েছে। উল্লেখ্য, কোরিয়ান ইপিজেডের উদ্যোক্তা হচ্ছে বাংলাদেশে কোরিয়ার শীর্ষ বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইয়াংওয়ান কর্পোরেশন। বাংলাদেশের দুইটি ইপিজেডে এ পর্যন্ত এ কোম্পানি ৪০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম ও ঢাকা ইপিজেডে এ কোম্পানির ১৭টি রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব কারখানায় ইয়াংওয়ান কর্পোরেশন প্রায় ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান করেছে।
শুধু সরকারি বাধা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতায়ই কোরিয়ান ইপিজেডের কাজ বিলম্বিত হচ্ছে না, স্থানীয় মাস্তানদের বাধার কারণেও প্রকল্প এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ প্রকল্প এলাকায় শ্রমিকদের থাকার জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ১২টি ডরমেটরি নির্মাণের পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু স্থানীয় মাস্তানরা ওই ডরমেটরি নির্মাণরত ঢাকার ঠিকাদারদের জোর করে এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রকল্প এলাকায় বিদ্যুত্ সরবরাহ নিয়ে বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের মধ্যে রশি টানাটানি এ ইপিজেডের কার্যক্রমকে মারাত্মক ব্যাহত করছে। গত বছর পাঁচ কিলোমিটার বিদ্যুত্ লাইন টেনে প্রকল্প এলাকায় বিদ্যুত্ সংযোগ দেয়া হয়। প্রায় ২৪ লাখ ডলার খরচ করে বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের কাছ থেকে এই বিদ্যুত্ সংযোগ নেয়া হয়। এজন্য পিডিবির অনুকূলে ৮৪ লাখ টাকা জামানতও প্রদান করা হয়। কিন্তু বিদ্যুত্ সংযোগ দেয়ার ১৩ দিন পর পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এসে বিদ্যুত্ লাইন কেটে দেয়। তারা দাবি করে, তাদের এলাকায় পিডিবি জোর করে বিদ্যুত্ দিচ্ছে। সরকারের এ দুই সংস্থার দ্বন্দ্বে বর্তমানে কোরিয়ান ইপিজেডে বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন আছে। কর্তৃপক্ষের ডিজেলচালিত বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে উত্পাদিত বিদ্যুত্ দিয়ে বিদ্যমান শিল্প-কারখানায় বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু ডিজেলের উচ্চ মূল্যের কারণে পণ্যের উত্পাদন খরচ অনেক বেশি পড়ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্যকে বেশি প্রতিযোগী করে তুলছে।
উল্লেখ্য, কোরিয়ান ইপিজেডে মোট জমির পরিমাণ ২৫শ’ ৮৪ হেক্টর। এর মধ্যে ৩৩ শতাংশ এলাকা থাকবে সবুজ বনায়নের জন্য। বাকি অংশে শিল্প-কারখানা ও আবাসিক এলাকা নির্মাণ করা হবে। ইতিমধ্যে প্রকল্প এলাকায় ১০টি কারখানা ইউনিটের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ ১০টি কারখানার ভবনের মধ্যে চারটিতে জুতা কারখানা চালু করা হয়েছে। সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, এসব ইউনিটে মার্কিন পুমা ব্রান্ডের জুতা উত্পাদিত হচ্ছে, যা কোরিয়া, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হচ্ছে। এই ইপিজেডে আধুনিক মানের ডিজাইন সেন্টার করা হচ্ছে। এ সকল ডিজাইন সেন্টারে বিভিন্ন পণ্যের জন্য ডিজাইন উদ্ভাবন করা হবে। এছাড়া ২০ হাজার লোক একযোগে কাজ করতে পারে এমন আইটি পার্ক করা হবে।
