কলকাতায় আবহাওয়া খুব একটা অনুকূলে ছিল না সেদিন। সমরেশ মজুমদারের সময় নেওয়ার পর থেকেই। এর ভেতরে তিনি মুম্বাইতে যাবেন একটি কনফারেন্সে অংশ নিতে। সেখান থেকে ফিরে এসেই তিনি সময় দেবেন। অতঃপর কথা হলো বিকেলে রবীন্দ্র সদনে একটি অনুষ্ঠানের অতিথি হিসেবে থাকবেন তিনি। সেখানে অনুষ্ঠান শেষে কথা বলবেন।
—কেমন আছেন ?
—হ্যাঁ , ভালো আছি। ভালো না থেকে তো আর উপায় নেই। খুব সম্প্রতি আমর স্ক্রিপ্টে বেশ ক’টি ছবি তৈরি হচ্ছে। এই ছবিগুলোর সবক’টির নির্মাতা একেবারেই বয়সে তরুণ। তাই তাদের কাছে যেমন অগাধ স্বপ্ন, ঠিক তেমনই মনের কোণে খুব একটা ভরসাও রাখতে পারছি না।
—সেটি কেমন। এখন তো কলকাতার নির্মাতারা খুবই ভালো করছেন। সেখানে তো নিজের লেখাটা অন্য মাত্রা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
—দেখুন একটা লেখা যখন আমি লিখি , তখন সেটা পুরোটাই আমার। কিন্তু লেখাটা যখন একজন নির্মাতার হাতে যাই, সেই সিনেমাটা প্রায় পুরোটাই হয়ে যায় নির্মাতার। আমার নিজের বলে প্রায় কিছুই থাকে না। আমি তখন স্টোরি মেকার।
—কিন্তু সমরেশদা, কোনো লেখা যখন চলচ্চিত্রে রূপ পায়, তখন কি আপনার লেখার ভাবনার সাথে চলচ্চিত্রের নির্মাণ বা কথা বলার ভঙ্গি মেলে?
—এ কারণেই তো ছেলে-ছোকরাদের সাথে বসি। কারণ ওরা তো শুধু উঠতে বসতে ‘ভাঙতে চাই’। কী ভাঙা উচিত, আর কোনটা অক্ষুণ্ন রাখা উচিত সেটা মাথায় থাকে না। তারা শুধু ভাঙতে চায়।
—কলকাতায় সুনীল দা নেই, ঢাকায় হুমায়ূন নেই। দুই বাংলার এই শূন্যতা আপনাকে কতটা ভাবায়?
—হুমম... এটা নিয়ে কী বলব! লেখালেখির চাপ আর এই যে আনুষ্ঠানিকতার চাপটা বেড়ে গেছে। কখনও তো ভাবিনি ওরা দুজন আমার আগে চলে যাবে। এখনও তো বিশ্বাস হয় না। এখনও প্রতিবছরের মতো অপেক্ষা করি, এ বছরও হুমায়ূন তার নুহাশ পল্লীতে দাওয়াত দেবে। সবসময় যেতে পারিনি। কিন্তু এখন মনে হয়, এত ক্ষণজন্মা মানুষটির এ রকম নিমন্ত্রণ আমার একবারও মিস করা ঠিক হয়নি।
—দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি কতটা আছে বলে আপনি মনে করেন? প্রতি ঈদ সংখ্যায় আপনারা যতটা লেখেন, পূজা সংখ্যায় বাংলাদেশের লেখকদের তো সেভাবে দেখা যায় না।
—এটা হওয়া উচিত না। তবে তরুণ লেখকদের ভেতরে বাংলাদেশের অনেকেই খুব ভালো করছে। আর আমার মতে এই সম্প্রতি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। যতদ্দুর মনে পড়ে গত কয়েক মাসে যে ক’টি বড় ফেস্টিভ্যাল বা অনুষ্ঠানে জয়েন করেছি, তাতে প্রায় সবক’টিতে বাংলাদেশের কেউ না কেউ ছিলেন। আর ঈদ সংখ্যা বা পূজা সংখ্যা দিয়ে সাহিত্যমান মাপা মনে হয় না ঠিক হবে। এটা কোনো মূল্যায়নের জায়গা না। হ্যাঁ এটা ঠিক, আমিও এই সময়টাতে এইগুলো নিয়ে বেজায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু তাই বলে এটাকে আমাদের দুই বাংলার কবি-সাহিত্যিকদের বন্ধুত্বের কোনো প্রশ্ন আনা যাবে না।
—স্যাটেলাইট চ্যানেলেও তো একই বৈষম্য দেখা যায়।
— দেখুন, এই একই প্রশ্নের মুখোমুখি আমি প্রায়ই পড়ি। আমার মনে হয় না এটা সাংস্কৃতিক মানুষদের দূরত্ব। এটায় অন্য কোনো বিষয় থাকতে পারে। কিন্তু আমরা যারা সাংস্কৃতিক কর্মী আছি, তাদের ভেতরে কোনো বিরোধ বা সংঘাত নেই। বরং আমি মনে করি, বাংলা ভাষার চর্চা ও এর গৌরবের জায়গায় অনেক ওপরে অবস্থান বাংলাদেশের। এখানে তো পুরো এক জগাখিচুরি কালচার শুরু হয়েছে।
