রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে নানান প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। বিশ্ব শিল্পের ইতিহাসে বিরল এ ঘটনার ১০০ দিন পার হয়ে গেলেও সেসব প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগই পালিত হয়নি। এমনকি এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত নিখোঁজ শ্রমিকের সংখ্যাও ৬০০ এর উপরে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় বঞ্চিত হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত গার্মেন্ট শ্রমিকরা। হতাহতদের সার্বিক সহায়তা করতে একটি সমন্বিত কমিশন গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সব পক্ষ নিয়ে গঠিত এ কমিটি তাত্ক্ষণিকতা ও অগ্রাধিকারের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে কাজ করবে।
গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এ প্রস্তাব করেন। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার ১০০ দিন: প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়ন পরিস্থিতি শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের, বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এছাড়া সেমিনারের সহ আয়োজক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের বলেন, দেশের সব সমস্যার মূল সমস্যা সুশাসন। সুশাসন নেই বলেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যার তৈরি হচ্ছে। সমন্বিত কমিশন গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, রানা প্লাজার সমস্যাগুলো সমাধানে সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর এসব সমস্যা সমাধানে কমিশন গঠনের জন্য যদি কেউ প্রস্তাব নিয়ে আসে সরকার তা গ্রহণ করবে। এটা সরকারকে সহায়তা করা হবে বলেও জানান তিনি। শ্রমিকদের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন দেয়ার যে দাবি এসেছে সে বিষয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হবে। বিজিএমইএ তাদের নিজেদের প্রয়োজনে নিজস্ব ভাবে পরিচালিত (সেল্প রেগুলেটেড) হয়ে আসছে। গার্মেন্ট শিল্পকে এগিয়ে নিতে আরো বেশি সেল্প রেগুলেটেড হতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একটি দেশের শিল্পায়নের শুরুর সময় বিভিন্ন ধরনের সমস্যা থাকে। বাংলাদেশেরও সেসব সমস্যা রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা সুশাসনের। দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর চালকরা পেশাদার নয়। বর্তমান সময়ে নতুন ধারা সৃষ্টি হয়েছে। আগে ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদ হয়ে যেতেন। কিন্তু বর্তমানে রাজনীতিবিদরা রাতারাতি ব্যবসায়ী হয়ে যাচ্ছেন। তারা ব্যাংক, বিশ্ববিদ্যালয় ও বীমার মালিক হয়ে যাচ্ছেন।
সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সার্বিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিতে হবে। দেশে বর্তমানে ৪২/৪৩টি খাত থাকলেও শুধুমাত্র গার্মেন্ট সেক্টরে যেন অস্বাভাবিকভাবে বেতন বৃদ্ধি করা না হয় সে বিষয়ে সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
সিপিডির পক্ষ থেকে মূল প্রবন্ধে ড. মোয়াজ্জেম হোসেন দেখান যে, রানা প্লাজা ধসের পর সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কি পরিমাণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং তার বাস্তবায়নের বর্তমান পরিস্থিতি। প্রতিশ্রুতির মধ্যে সবচেয়ে কম পালিত হয়েছে আহত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার বিষয়টি। এছাড়া সবচেয়ে বিপদে রয়েছে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি তাদের পরিবারগুলো।
রানা প্লাজা ধসে আহত কয়েকজন গার্মেন্ট শ্রমিক সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন। একমাসের বেতন ও সামান্য অনুদান ছাড়া আর কোন সহায়তা না পাওয়ায় চিকিত্সার ব্যয় মিটিয়ে পরিবার পরিচালনা করতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন সেমিনারে তাদের কথা তুলে ধরেন।
এ সেমিনারের সহ আয়োজক ছিলেন, ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট, বাংলাদেশ (আইএবি), আইন ও শালিস কেন্দ (আশক), আহসানিয়া মিশন, অ্যাকশান এইড বাংলাদেশ, গণসাক্ষরতা অভিযান, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), ডেইলি স্টার, নারীপক্ষ, নিজেরা করি, প্রথম আলো, বাংলাদেশ এনভাইরনমেন্টার লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেলা), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)
