ঈদের তৃতীয় দিনে রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ছিল নগরবাসীর উপচেপড়া ভিড়। উত্সব প্রিয় হিসাবে বাঙালি জাতির রয়েছে সুখ্যাতি। ঈদুল ফিতরকে কেন্দ করে রাজধানীর চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক, শিশুমেলা, জাতীয় ফ্যান্টাসি কিংডম, জাতীয় জাদুঘর, বলধা গার্ডেন, আহছান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্ল¬া, জাতীয় সংসদ ভবন চত্বর, সাভার স্মৃতিসৌধ, টিএসসি, নন্দন পার্ক, চন্দ্রিমা উদ্যান, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ধানমন্ডি লেক, বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে প্রচণ্ড ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
শিশুদের সবচেয়ে আনন্দের জায়গা হলো শিশুপার্ক। বর্তমানে এখানে ১১টি রাইডস রয়েছে। প্রত্যেক রাইডসে চড়ে শিশুরা আনন্দ উপভোগ করছে। প্রবেশ মূল্য মাথাপিছু ১০ টাকা। শিশুপার্কের উল্টোপাশে জাতীয় জাদুঘরে একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। দেশের প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক, সংগ্রাহক ও প্রদর্শক এ জাদুঘর। এখানেও প্রচুর ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। রাজধানীর চিড়িয়াখানায় ঈদের দিন ও ঈদের পরের দিন দেখা গেছে মানুষের উপচেপড়া ভিড়। এখানে অনেকে তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে আসেন। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও সাদা পোশাকধারী ডিবি, র্যাব, পুলিশ বিভিন্ন স্থানে টহলরত অবস্থায় আছেন।
রাজধানী ও ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে বিভিন্ন বয়সের মানুষ চিড়িয়াখানায় প্রবেশ করে আনন্দ উপভোগ করে। প্রবেশ মূল্য মাথাপিছু ১০ টাকা করে নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে এখানে প্রাণী সংখ্যা রয়েছে ২০ হাজার ৫০টি। ঢাকার অদূরে সাভারের আশুলিয়ায় রয়েছে ফ্যান্টাসি কিংডম, আর জিরানীতে নন্দন পার্ক। এসব পার্কে দেখা গেছে দর্শনার্থীদের ভিড়। এই পার্কগুলোতে রোমাঞ্চকর ও মজাদার রাইড ছাড়াও ঈদ উপলক্ষে দর্শনার্থীদের কথা বিবেচনা করে পার্ক কর্তৃপক্ষ বিশেষ প্রমোশনের ব্যবস্থা রেখেছে। এর মধ্যে আকর্ষণীয় কনসার্ট শো, ড্যান্স শো, ডিজে শো ও এ্যাক্রোবেটিক শো। শিশুদের জন্য ঈদ উত্সবকে আরও রঙিন করতে বর্ণিল সাজে সজ্জিত করা হয়েছে নানা ধরনের মাসকাট, যা অফুরন্ত আনন্দ দিচ্ছে শিশুদের। উল্লিখিত ভ্রমণ স্পট ছাড়াও ঈদের ছুটিতে বিনোদন পাগল মানুষের ভিড় দেখা গেছে সাভারের জাতীয় স্মৃতি সৌধ, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, বলধা গার্ডেন, আহছান মঞ্জিল, জাতীয় সংসদ ভবন এবং বিভিন্ন বিনোদন কেন্দে ।
ঈদের রঙে রঙিন বিনোদন কেন্দ্র
প্রতিটি ঈদেই রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলো সাজে নবরূপে। নতুন রঙে রঞ্জিত এসব বিনোদন কেন্দ্র আরো রঙিন করে তোলে শিশুরা। বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ছিল উপচেপড়া ভিড়। সব বয়সী মানুষের ভিড় জমলেও সিংহভাগ দখল করে রাখে শিশুরা। শাহবাগের শিশুপার্ক, মিরপুরের চিড়িয়াখানা, শ্যামলীর শিশুমেলা ঘুরে দেখা গেছে একই চিত্র। ঈদের কারণে চিরচেনা ঢাকা অনেকটাই ফাঁকা। কিন্তু সেই চিত্রের রেশ পাওয়া যায়নি বিনোদন কেন্দ্রগুলোর সামনে বা তার আশপাশের এলাকাগুলোতে।
ঈদে শিশুদের আনন্দ থাকে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বড়রাও তাদের চেয়ে কোন অংশে কম ছিলো না। কেউ এক ঝাঁক বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আবার কেউ প্রিয়জনের হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফাঁকা ঢাকার এপার ওপার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, ধানমন্ডি লেক, বিভিন্ন পার্ক-উদ্যানে ছিলো বড়দের সরব উপস্থিতি।
পাল্টে গেছে ঢাকা
যানজট কবলিত, ভিড়ে ভরা তিলোত্তমা ঢাকা ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। পাল্টে গেছে নগরীর চেহারা। ঈদের পর ঢাকা প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে। যারা এই সময়ে ঢাকাতেই থেকে গেছেন ফাঁকা এই পরিবেশ তারা অনেকেই বেশ উপভোগ করছেন। ঢাকার রাজপথগুলোতে নেই দুর্বিষহ যানজট। নেই উদয়াস্ত মানুষের ছুটে চলা। ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে ঈদের ছুটির সাথে এই শান্ত ঢাকা শহর যেন এক বাড়তি পাওনা। ব্যস্ত নগরীর এই অবসর নগরবাসীকে দিয়েছে স্বস্তির অনুভূতি। ঢাকার ফাঁকা নির্জন রাস্তাগুলোতে ঘুরে বেড়ানোই হয়ে উঠেছিল নগরবাসীর বিনোদনের প্রধান অংশ।
ঈদের দিন থেকেই নগরের রেস্টুরেন্ট, বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে মানুষের আনাগোনা ছিল বেশ। বিশেষ করে ঈদের খুশির জোয়ারে ভাসতে দেখা গেছে তরুণ-তরুণীদের। রিকশা, গাড়ি বা মোটর সাইকেল নিয়ে ঢাকার রাজপথে দল বেঁধে দাপিয়ে নিজেদের আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে তারা।
ঈদের পরদিন শহরের আবাসিক এলাকাতে মানুষের চলাফেরা থাকলেও অফিসপাড়া মতিঝিল, দিলকুশায় ভর করেছিল শূন্যতা। হকারদের হাঁকডাকে সরগরম হয়ে থাকা ফুটপাতগুলো ছিল নির্জীব, জনমানবহীন। তবে জ্যামের পুরানো ঐতিহ্য বজায় রেখে জমজমাট রয়েছে শাহবাগ, টিএসসি চত্বর। শিশুপার্কের সামনে রয়েছে সীমাহীন মানুষের ভিড়। শাহবাগ আর সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান যেন বন্ধুদের মিলন কেন্দ্র। বন্ধুদের জটলায় চলেছে তাদের আড্ডা।
ঈদের ছুটি কাটিয়ে রবিবার থেকে আবার শুরু হয়েছে নগরীর ব্যস্ততা। খুলেছে ব্যাংক, অফিস, আদালত। তিলোত্তমা ঢাকাও ফিরে পাবে তার সেই চিরচেনা চেহারা।
বিনোদন কেন্দ্র শিশুদের দখলে
ঈদ বয়ে আনে আনন্দ। এ আনন্দ কোমলমতি শিশুদের হূদয় ছুঁয়ে যায় সবচেয়ে বেশি। ঈদের দিন যদি বাবা-মার হাত ধরে বিভিন্ন বিনোদন পার্কে না যাওয়া হয়, তাহলে তাদের আনন্দের ঈদ পরিণত হয় বিষাদের ঈদে। আগের সব ঈদের মতো এ ঈদেও রাজধানীর বিনোদন পার্কগুলো ভরে উঠে শিশুদের কোলাহলে! দুপুরের পরে শাহবাগের শিশুপার্ক, মিরপুরের চিড়িয়াখানা, শ্যামলীর শিশু মেলায় গিয়ে দেখা যায় শিশুদের কলোরবে রঙিন সব খেলনাগুলো আরো বেশি রঙিন হয়ে উঠেছে। ঈদ উপলক্ষে সারা ঢাকা যে ফাঁকা হয়ে আছে তা বোঝার উপায় নেই এসব বিনোদন কেন্দ্র ও তার আশপাশের এলাকায় গেলে।
শিশুপার্ক
অন্যান্য ঈদের দিনের মতোই শিশুপার্কে লক্ষ্য করা গেছে ব্যাপক ভিড়। রোমাঞ্চ চক্র, আনন্দ ঘূর্ণি, উড়ন্ত বিমান, উড়ন্ত নভোযান, ফুলদানি আমেজ, ঝুলন্ত চেয়ার, লম্ফঝম্ফ, ব্যাটারি কার, রেলগাড়ি ও বিস্ময়চক্র ১১টি রাইডারেই ছিলো ব্যাপক ভিড়।
ঢাকা চিড়িয়াখানা
‘আমি এখানে বাঘ দেখবো, হাতি দেখবো আর সিংহ মামা দেখবো’- চিড়িয়াখানায় এসে এমনভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করলো কল্যাণপুর থেকে আসা আট বছরের শিশু লামিয়া। পাশে দাঁড়ানো তার মা শাহনাজ বেগম হেসে জানালেন, সারাবছর স্কুল আর নানা ব্যস্ততার কারণে ঘর থেকে বাইরে বেরোতেই পারে না তার মেয়ে। তাই এখানে এসে একেবারে বাঁধনছাড়া হয়ে গেছে। লামিয়ার মতোই অবস্থা এখানে আসা প্রায় সব শিশুরই। শুধু শিশুরাই নয়, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখরিত ছিল পুরো চিড়িয়াখানা প্রাঙ্গণ।
শিশুমেলা
নগরীর বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা শিশু-কিশোরদের আনন্দ আর উল্লাসে পুরো শিশুমেলার পরিবেশের তুলনা চলে শুধু রূপকথার জাদুর রাজ্যের। হৈ-হুল্লোড়, আনন্দঘন পরিবেশে দোলনা, ব্যাটারি কারসহ বিভিন্ন রাইডে সারিবদ্ধ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের মধ্যে ছিলো না কোন কষ্ট। সবকিছুতেই ছিলো ঈদের আমেজ।
