আইসিসির মুষিক প্রসব!

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০১৩, ২১:৫০
পেছনে আইসিসি ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের লোগো সম্বলিত ব্যানার, মঞ্চের ডান পাশে অতিথিদের সারিতে বসা আইসিসির কর্মকর্তারা, সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করছেন আইসিসির মিডিয়া ম্যানেজার এবং সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন আইসিসির সর্বোচ্চ পদাধিকারী কর্মকর্তা! পুরো দৃশ্যটা দেখে মনে হয়, বাংলাদেশে এখনই বুঝি বিশ্বকাপের মতো কিছু একটা বড় আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। বড় আয়োজনই বটে, তবে বিশ্বকাপ নয়; আকসু রিপোর্ট নিয়ে আইসিসি ও বিসিবির যৌথ সংবাদ সম্মেলন এভাবেই হল গতকাল রাজধানীর অভিজাত এক হোটেলে। সকাল থেকে একটার পর একটা বৈঠক, খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথোপকথন ও উত্তেজনাপূর্ণ চালচলন শেষে এই সংবাদ সম্মেলন অবশ্য বাংলাদেশের মানুষের আগ্রহ মেটাতে পারলো না এতোটুকও। বরং আরও বিভ্রান্তি তৈরির সুযোগ হল তাদের এই পর্বত প্রমাণ আয়োজনের ভেতর দিয়ে! কোনো অভিযুক্তর নাম সংবাদ সম্মেলনে বলা হল না। শুধু বলা হয় নয় জন ‘ব্যক্তি’র বিপক্ষে ম্যাচ ফিক্সিং অথবা ম্যাচ ফিক্সিংয়ের তথ্য না দেয়ায় অভিযোগ এনেছে আইসিসির দুর্নীতি দমন ও নিরাপত্তা ইউনিট (আকসু)। এটুকু নিশ্চিত করা হল যে, সব অভিযুক্তকে তাদের বিপক্ষে অভিযোগ ও তাদের প্রাপ্য শাস্তি সম্পর্কে লিখিতভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন এই নয়জন অভিযুক্তর বিপক্ষে কি ব্যবস্থা নেয়া হবে; সে সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার বিসিবির গঠন করতে যাওয়া ট্রাইব্যুনালের। একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত এই ট্রাইব্যুনালের কাছেই অভিযুক্তরা চাইলে দোষ স্বীকার করতে পারবেন অথবা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করতে পারবেন। বিপিএলের দ্বিতীয় আসরে ঘটে যাওয়া ফিক্সিং কাণ্ড নিয়ে আকসুর রিপোর্ট নিয়ে মাসের পর মাস ধরে অপেক্ষা চলছে। বারবার শোনা যাচ্ছিল, এই রিপোর্ট আসলেই জানা যাবে, কে কে অপরাধী। গত পরশু রাতে সেই রিপোর্ট নিয়ে ঢাকায় এলেন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন আইসিসির এক দল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন আইসিসির প্রধান নির্বাহী ডেভ রিচার্ডসন। এ ছাড়া আইসিসির মিডিয়া ম্যানেজার সামি-উল হাসান, লিগ্যাল কমিটির প্রধান ইয়াইন হিগিন্স ও আকসু প্রধান ওয়াইপি সিং ছিলেন দলে। আইসিসির এই সদস্যরা পরশু রাতে এবং গতকাল সকালে দফায় দফায় সভা করে বিসিবিকে বুঝিয়ে দিলেন সে রিপোর্ট। বিসিবি ঠিকই জানতে পারল যে, অভিযুক্ত কারা। কিন্তু জানানো হল না সংবাদ মাধ্যমকে। এ ব্যাপারে ডেভ রিচার্ডসন পরিষ্কার বিসিবির দুর্নীতি বিরোধী আইনের দোহাই দিলেন, ‘বিসিবির এই আইনে বলা আছে, যতক্ষণ না পর্যন্ত কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, ততোক্ষণ পর্যন্ত কারো নাম প্রকাশ করা যাবে না। তাই আমরা বাধ্য হয়েই কাউকে দোষী বলতে পারছি না।’ বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বললে, ‘যতক্ষণ বিচার সম্পন্ন না হয়, ততোক্ষণ সবাই নির্দোষ বলেই গণ্য হবেন। তাই কারো নাম প্রকাশ্যে বলে তাকে হেয় করার অধিকার আমাদের নেই।’ তারমানে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্তদের নাম জানতে ট্রাইব্যুনালের রায় পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হচ্ছে। ডেভ রিচার্ডসনই বলে দিলেন, বিসিবি এখন একজন চেয়ারম্যানসহ একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করবে। এই ট্রাইব্যুনালই সিদ্ধান্ত নেবেন আইসিসির অভিযোগগুলো সঠিক কি না। তবে বিসিবির একটি সূত্র জানালো, আকসুর রিপোর্টেই আসলে প্রতিটি অভিযুক্তর নামে শাস্তি সুপারিশ করা আছে। ট্রাইব্যুনাল শুধু শুনানি শেষে সেই শাস্তির ঘোষণা দেবেন। যদিও কোনো সময়সীমার কথা ডেভ রিচার্ডসন উল্লেখ করতে চাইলেন না। তিনি বললেন, ‘এই পুরো প্রক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনালের সময় লাগবে। প্রথমে আকসু তার অভিযোপত্র ট্রাইব্যুনালের কাছে তুলে ধরবে। এরপর একে একে প্রত্যেক অভিযুক্তর এখানে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকবে। ফলে সময় লাগবে।’ অন্যদিকে বিসিবি সভাপতি বললেন, যতো দ্রুত সম্ভব গঠন করা হবে এই ট্রাইব্যুনাল। আর জানা গেল যে, অভিযুক্তদের দেয়া চিঠিতেই বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের কাছে ১৪ দিনের মধ্যে নিজের অবস্থান জানাতে হবে তাদের। শেষ পর্যন্ত এই যে পুরো ব্যাপারটা ট্রাইব্যুনালের জন্য অপেক্ষায় রাখা, না প্রকাশ করা; এসব নিয়ে আইসিসির ভূমিকাকে একটু ‘ধরি মাছ না ছুই পানি’ মনে হতে পারে। কিন্তু আইসিসি প্রধান নির্বাহী দাবি করছেন, বিসিবি ও আকসু অসাধারণ তত্পরতাই দেখিয়েছে এই পুরো ব্যাপারটায়। আর বিসিবি সভাপতি যদিও দুঃখিত দেশের ক্রিকেটে এমন একটা ধাক্কা লাগায়, তারপরও তিনি আশাবাদী এর ফলে ভবিষ্যতে অন্যায়ের প্রবণতা কমে আসবে, ‘আমি একই সঙ্গে খুশি ও অখুশি। অখুশি কারণ, দেশের অনেক পছন্দের ক্রিকেটার হয়তো এই প্রক্রিয়ায় দোষী প্রমাণিত হতে পারেন। অন্যদিকে আমরা এটা ভেবে খুশি যে, ভবিষ্যতে অন্তত এরকম কিছু করার ক্ষেত্রে সবাই সতর্ক থাকবে। এটা একটা দৃষ্টান্ত হবে।’