মু খো মু খি

এই দেশের গান আমাদের কলকাতার চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৩, ২০:৪৩
শ্রীকান্ত আচার্য। ওপার বাংলার প্রখ্যাত জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী। গত দুই দশক ধরে অসংখ্য বাংলা গান উপহার দিয়েছেন তিনি। আর নিজের গানের জনপ্রিয়তা শুধু কলকাতায় নয়, বাংলাদেশেও ব্যাপক হারে বিরাজ করছে। তার কণ্ঠে গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় গান হলো ‘আমার সারাটা দিন মেঘলা আকাশ বৃষ্টি তোমাকে দিলাম’। সম্প্রতি দেশ টিভির আয়োজনে ‘কলের গান’ শিরোনামের সরাসরি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দুই দিনের সফরে ঢাকায় আসেন তিনি। সেই সুযোগে ঢাকা ক্লাবের গেস্ট হাউজে আড্ডা দেন বিনোদন প্রতিদিন-এর সঙ্গে। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন রবি হাসান, ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু এর আগেও তো বাংলাদেশে এসেছেন, বাংলা গানের সবচেয়ে বড় দেশে গান করতে আলাদা কিছু অনুভব করেন কি? প্রশ্নটা অনেক সুন্দরভাবে বললে। হ্যাঁ আমি শতভাগ একমত। বাংলা ভাষার প্রধান জায়গা বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে তো আমি আমার নিজের দেশই মনে করি। আমার মায়ের বাড়ি বিক্রমপুরে। ছোটবেলা থেকেই এই দেশের প্রতি এক অন্যরকম টান-ভালোবাসা রয়েছে। মামাবাড়ি বলে এই দেশের সঙ্গে যোগাযোগটা নিয়মিত থাকাটাও স্বাভাবিক। এই দেশের মানুষগুলোকে বেশ ভালো লাগে, তাদের মধ্যে অনেক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে। আর বাংলাদেশ-কলকাতাকে আমরা আলাদা করেও দেখি না। একই ভাষাভাষীর মানুষ আমরা, দেশও মাঝে মাঝে একই মনে হয়। আমাদের টিভি চ্যানেল এমনকি গানের শ্রোতাও এই দেশে বেশি। আপনার গাওয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ‘আমার সারাটা দিন মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি তোমাকে দিলাম’ প্রসঙ্গে কিছু বলুন। এই গানটির প্রশংসা আমি অনেক পেয়েছি। আমার নিজের কাছেও গানটি অনেক ভালো লাগে। এই গানটিও আমার মনে হয়, কলকাতার চেয়ে বাংলাদেশিরাই বেশি শোনেন। গানটি লিখেছেন লীলাময় পাত্র আর সুর করেছেন লোপামুদ্রা মিত্রর স্বামী জয় সরকার। আজ থেকে বহু বছর আগে, ১৯৯৯ সালের দিকে এই গানটির দুইটি লাইনের সুর করেন জয়। ওই দুই লাইনের পর প্রায় ৮ থেকে ৯ মাস পার হয়ে গেল, গানটি শেষ করতে পারলেন না তিনি। একদিন আমার বাসায় এলেন তিনি, আমি জয়কে বলি যে, এই মুহূর্তেই গানটির সুরের কাজ শেষ করতে হবে। এরপর এই পুরো গানটির সুর জয় আমার সামনেই করে এবং পরবর্তী দুই মাসের মধ্যেই এর রেকর্ডিং হয়। ২০০০ সালে ‘বৃষ্টি তোমাকে দিলাম’ অ্যালবামে এই গানটি প্রকাশ করি। তারপরের গল্পটা শ্রোতাদের হাতেই। এই সময়ের গান প্রসঙ্গে বলুন। এই সময়ের গান প্রসঙ্গে বলতে গেলে আমি একটা কথাই বলব যে, সবাই একই প্যাটার্নে হাঁটার চেষ্টা করছে। শিল্পীভিত্তিক গানও খুব কম হচ্ছে, যা হচ্ছে সিচ্যুয়েশনভিত্তিক। সব গানেই দেখা যায় কথা বা শব্দচয়ন একই রকম। সুর, কম্পোজিশনও প্রায় একই রকম হচ্ছে। অর্থাত্ একই গান বিভিন্ন শিল্পীকে দিয়ে গাওয়ালেও এর পার্থক্য খুব একটা খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই বিষয়টা আসলে কোন দিকে যাচ্ছে ঠিক বুঝতে পারছি না। একটা সময়তো গান শুধু পেশাদার গীতিকাররাই লিখতেন, আর সেই গীতিকাররাই এখন গান লেখা থেকে অনেক দূরে। অন্যদিকে এখন সাংবাদিকরা গীতিকার হয়ে উঠছেন, অনেকে লবিং মেনটেইন গীতিকারও। এই প্রসঙ্গে কী বলবেন? এটা খুব ভালো প্রশ্ন। আগের সেই গীতিকারদের এখন আর পাচ্ছি না। তারা শুধু গীতিকবি বলে, কাজের প্রতি তাদের গুরুত্ব ও নিষ্ঠাও ছিল অনেক বেশি। যেসব বাক্য তারা লিখতেন, ভাবতে ভাবতেই দিন কেটে যেত। সেগুলো এখন আর ওভাবে পাওয়া যায় না। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে, বিশেষ করে গীতিকারদের সম্মানী। একটি গানের পেছনে, কণ্ঠশিল্পীর যতটুকু ভূমিকা আছে, ঠিক ততটুকুই ভূমিকা আছে সুরকারের, ঠিক ততটুকুই আছে একজন গীতিকারের। কিন্তু প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো গীতিকারদেরকে একজন শিল্পী বা সুরকারের তুলনায় ২০ শতাংশও মূল্য দেন না। তারা গান লিখে কী করবেন, টাকা-পয়সা ঠিকমতো পান না। গানটা লিখছেন গীতিকার, আর মোটা অঙ্কের সম্মানী পাচ্ছে অন্যজন। এইসব জায়গা থেকেই আসলে পেশাদার গীতিকারদের আমরা হারাচ্ছি। হারিয়েছিও বটে। এ দেশের বাংলা গান ও শ্রোতা প্রসঙ্গে বলুন? আমি মনে করি, এই দেশের গান আমাদের কলকাতার চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। আর শ্রোতাদের বেলায় তো কথাই নেই। আমাদের গানের ৭০ শতাংশ শ্রোতা তো এই দেশেরই। বরং আমি এটাও বলতে চাই যে, একমাত্র বাংলাদেশিরাই বাংলা গান মনোযোগসহকারে পরিপূর্ণ আবেগ দিয়ে শোনে ও বুঝে। যা আমাদের কলকাতার শ্রোতাদের মধ্যে নেই। আমাদের দেশে বড় কোনো ইভেন্ট কিংবা স্টেজ শো হলেই ভারত থেকে আপনারা নিমন্ত্রিত হন। আপনাদের ওখানকার শোয়ে আমাদের শিল্পীদের নিমন্ত্রণের বিষয়ে জানতে চাই। হ্যাঁ, এই দেশের অধিকাংশ শোয়েই কলকাতা থেকে আমাদের বিভিন্ন শিল্পী নিমন্ত্রণ পায়। এই দেশের আয়োজকরা আমাদের বেশ কদর করে, শ্রোতরাও আমাদের গান শুনতে আগ্রহী। কিন্তু আমাদের দেশের ইভেন্টে এই দেশ থেকে তেমন কোনো শিল্পী নিমন্ত্রিত হয় না, শুধুমাত্র রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ছাড়া। আমাদের দেশের আয়োজকরা কেন অন্য শিল্পীদের নিমন্ত্রণ দেন না ঠিক জানি না, এই দেশের অনেক শিল্পীই আমাদের দেশে জনপ্রিয়।