ঈদের টিভি অনুষ্ঠান নিয়ে এক বাক্যে কোনো কথা বলতে গেলে বলা যায়, নতুন কোনো বৈচিত্র্য নেই। সেই একই ফর্মেটেই চলেছে এবারের ঈদ আয়োজন। বিটিভি তার সবেধন নীলমণি হানিফ সংকেতের জনপ্রিয় টিভি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ নিয়েই দর্শক ধরে রেখেছিল। তবে এতে কোনোভাবেই বিটিভির কোনো মুন্সিয়ানা নেই। বরং হানিফ সংকেত তার মেধার জাদুবলে এবারেও তার দর্শককে বিমুগ্ধ করে ধরে রেখেছেন। ইউটিউব ও ফেসবুকে ঈদ ‘ইত্যাদি’র ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে হিন্দি টিভি সিরিয়াল নিয়ে স্যাটায়ারের বিষয়টি। তবে এবারের ‘ইত্যাদি’তে অর্বাচীন ও আনকোরা সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়া শিল্পীদের পারফর্ম করানোর বিষয়টা দৃষ্টিকটু লেগেছে। ‘ইত্যাদি’র মতো এত বড় একটি প্লাটফর্মে দু-একজন অর্বাচীন শিল্পীর পারফর্মেন্স তাই বেমানান লেগেছে। বাকি সবটুকুই যেন অনবদ্য যথার্থ নিয়মিত ছন্দেই দর্শকদের সেরা অনুষ্ঠান হিসেবেই বিবেচনায় রাখার মতো। অন্যদিকে কবে, কিভাবে ‘আনন্দমেলা’ গিয়েছে তা জানা মুশকিল। বরং গেল কয়েক বছরের তুলনায় এবারে একেবারেই নিমজ্জিত আলোচনায় চলে গেছে এবারের ‘আনন্দমেলা’। আনকোরা এক উপস্থাপককে দিয়ে সেই ‘আনন্দমেলা’ এবারে প্রচারের চেষ্টা চালালেও বৈচিত্র্যের পাওনা সিকি আনাও পায়নি দর্শকেরা।
যথারীতি নাটক প্রচারের সংখ্যায় এবারে গত বারের রেকর্ড ভেঙেছে। আর এইভাবে নাটকের সংখ্যা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলতে থাকলে বলা মুশকিল কবে না জানি বৈচিত্র্য খুঁজতে ঈদের টানা ৭ দিন শুধু নাটকই প্রচার হবে।
অবাক করার মতো ঘটনা হলো চ্যানেল টুয়েন্টিফোর ঈদের বেশ আগে নিউজ চ্যানেল হিসেবে অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ করলেও এবারের ঈদে হুট করে চ্যানেলের চরিত্র বদলে গেছে। এমনিতেই আমাদের অধিকাংশ (দু-একটি নিউজ চ্যানেল ছাড়া) চ্যানেলের কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নেই। অর্থাত্ চ্যানেলের লোগো উধাও করে দিলে বোঝা মুশকিল কোনটি কোন চ্যানেলের অনুষ্ঠান। ধরা যাক রাতের অবধারিত লাইভ অনুষ্ঠানের কথাই, আজ নওশীন বা ফারিয়া আরটিভিতে এলআরবির সাথে তো পরদিন এসএটিভির লাইভ অনুষ্ঠানে। এবারের ঈদে বেশ আঁটসাঁট বেঁধে নেমেছিল এলআরবি ও দলছুট। দুটি ব্যান্ডদলকেই প্রায় সব চ্যানেলে দর্শকদের ফোনের সামনে গান গাইতে দেখা গেছে। দীর্ঘদিন পর এলআরবির এই রাজকীয় কামব্যাক দর্শকদের জন্য ভালোবাসার বৃষ্টির মতো। আর এবারের লাইভেই এলআরবি ‘রাখে আল্লা মারে কে’ নামের নতুন একটি গান রিলিজ করেছে। যা এক কথায় অনবদ্য। বৈশাখী টিভিতে সারাবছর থেকে শুরু করে এই ঈদে এসেও মনে হয়েছে যেন একজন নারী উপস্থাপকের বাইরে কেউ নেই সেখানে। তিনিই সংবাদ পাঠ করছেন আবার তিনি যাবতীয় অনুষ্ঠান উপস্থাপনায়। মাকসুদের উপস্থাপনায় দু-একটি অনুষ্ঠান সঞ্চালিত হলেও আনপ্লাগড কনসার্টের মতো নতুন ধারণায় ক’জন বেসুরো আনকোরা শিল্পী অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য ধূলিসাত্ করে দিয়েছে। এর বাইরে এই রাতের গানের চর্চা নিয়ে বিশেষ কিছু বলা যায় কি? পাঠকেরা নিজেরাও এর উত্তর খুঁজে পাবেন কি না তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। সেই একই গান, আজ ওই চ্যানেলে তো কাল অন্য চ্যানেলে। প্রকাশ ও প্রচারের ঢংও সেই একই। মাঝে মাঝে বৈচিত্র্য খুঁজতে গিয়ে কেউ কেউ ভারতীয় শিল্পীদের এনেছেন। কিন্তু সেও তো বেশ ক’বছরের পুরোনো ফর্মেট। প্রারম্ভিক রাত থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত গানের লাইভ অনুষ্ঠানই যে এ দেশের সেরা বিনোদন এই তত্ত্বটা কে বা কারা অনুষ্ঠান প্রধানদের ঢুকিয়েছে সেটিই বলা মুশকিল। তবে শ পাঁচেক নাটকের ভেতরে বেশ কিছু ভালো নাটক দর্শকেরা দেখতে বসলেও বিজ্ঞাপনের অতিরিক্ত যন্ত্রণায় তা কে কতটুকু দেখতে পেরেছে! পাশাপাশি এবারের ঈদে নতুনভাবে শুরু হয়েছে ‘বিশেষ বিরতি’। এই ‘বিশেষ বিরতি’র মানে কী তা বোঝা মুশকিল। তাই অধিকাংশ দর্শকেরা নাকি এখন অপেক্ষায় থাকেন কখন তার অনুষ্ঠানটি ইউটিউবে আপলোড হবে, তখন তারা দেখবে। টিভি লাইভ কনসার্টে মাছরাঙায় গেয়েছেন এসআই টুটুল। উপস্থাপকের একই উত্তর গান শেষে সব ক’টি চ্যানেলে। ‘বাহ, চমত্কার। অসাধারণ। ...তা এরপর কি শুনছি...’ এই মুখস্থ কথা, এই একঘেঁয়ে উপস্থাপনার চর্বিতচর্বন আর কতকাল চলবে! টুটুল বললেন এরপর গাইব ‘পাষানী’। কিন্তু যে পাষানী গানটি তার গুরু আইয়ূব বাচ্চু সুর করে তাকে গাওয়ালেন সেই গীতিকারের নাম বা সুরকারের নাম বলার কোনো প্রয়োজন মনে করলেন না তিনি। শুধু টুটুল নয়, সবক’টি চ্যানেলেই বড়-ছোট সব শিল্পীরা কেউই গানের স্রষ্টার নাম উল্লেখ করলে জাত চলে যাবে এমন ভাব করেন। এ দিক দিয়ে ভারতীয় শিল্পীদের প্রশংসা করতেই হয়। কারণ তারা উল্টো গানের গীতিকারের সাথে তার সম্পর্ক, গান তৈরির গল্প সব বলে দিচ্ছেন। তবে হুমায়ূন আহমেদের শূন্যতা অনেকটা পূরণ করেছে শাওনের উপস্থিতি ও তার পরিচালিত নাটক। ফরিদুর রেজা সাগরের রচনায় আফজাল হোসেন অভিনীত ‘ছোটকাকু’র ব্যাপক প্রচার দর্শকদের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি রাতের প্রায় বিরক্তিকর লাইভ অনুষ্ঠান থেকে দূরে থেকে দর্শকদের রেহাই দিয়েছে চ্যানেল আই, এটিএন বাংলা, এশিয়ান টিভি, বিজয় টিভিসহ বেশ কটি চ্যানেল। তবে তারাও যে সেই স্লটে আহামরি চোখ ধাঁধানো কিছু প্রচার করেছেন তা বলা মুশকিল। টক শো’র ক্ষেত্রেও প্রায় একই তারকা শুধু পোশাক পাল্টে বিভিন্ন চ্যানেলে ঘুরেছেন।
