এবারের লিগটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ১৯৮৬ সালের পর এই প্রথম ইউনাইটেডের প্রবাদ প্রতীম কোচ ৭১ বছর বয়সী স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনকে মাঠের ধারে দেখা যাবে না। তিনি দূর থেকে দেখবেন ইউনাইটেড রেকর্ড ২১তম লিগ শিরোপার জন্য লড়াই শুরু করবে এবার।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ম্যানেজার ডেভিড ময়েস মনে করছেন আজ শনিবার শুরু হতে যাওয়া ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগটি হচ্ছে তার দলের জন্য ‘২০ বছরের মধ্যে সবচাইতে কঠিন।’ প্রিমিয়ার লিগের উদ্বোধনী দিনে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লিভারপুল ও আর্সেনালের খেলা থাকলেও শিরোপা পুনরুদ্ধারে মরিয়া চেলসি আগামীকাল এবং রানার্স আপ ম্যানচেস্টার সিটি মাঠে নামবে মঙ্গলবার।
এবারের লিগটির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ১৯৮৬ সালের পর এই প্রথম ইউনাইটেডের প্রবাদ প্রতীম কোচ ৭১ বছর বয়সী স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনকে মাঠের ধারে দেখা যাবে না। তিনি দূর থেকে দেখবেন ইউনাইটেড রেকর্ড ২১তম লিগ শিরোপার জন্য লড়াই শুরু করবে এবার। দলটির প্রথম খেলা সোয়ানসি সিটির মাঠে। বরাবরের মতোই ম্যান ইউ’র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকবে চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটি, আর্সেনাল, টটেনহ্যাম হটস্পার ও লিভারপুল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের আর কোন লিগে শিরোপা লড়াই এতটা বহুমুখী হতে দেখা যায়নি।
হোসে মরিনহোর আবার চেলসিতে ফেরার কারণেও ফুটবল দুনিয়ার শীর্ষ এ লিগটি এবার বাড়তি মনোযোগ আকর্ষণ করবে। ইন্টার মিলান ও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ট্রফি জয়ের পর ‘ক্যারিসম্যাটিক’ এই পর্তুগীজ কোচ আবার প্রিমিয়ারশিপে ফিরে এসেছেন। শিরোপার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে অন্যতম মরু ধনকুবেরদের দল ম্যানচেস্টার সিটিও আঁটঘাট বেঁধে নামছে নতুন কোচ ৫৯ বছরের ম্যানুয়েল পেলিগ্রিনির অধীনে।
চিলির এই কোচ এসেছেন স্পেনের মালাগা থেকে। কোচ ব্রেন্ডন রজার্সের অধীনে ইউরোপে এক সময় সবচাইতে বেশি খ্যাতি ছড়ানো ক্লাব লিভারপুলও চাইবে শেষ চারে জায়গা করে নিতে। কেননা বেশ ক’বছর ধরে ইউরোপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারা দলটি এ ব্যাপারে এবার মরিয়া। আরেক পর্তুগীজ কোচ আন্দ্রে ভিলাস বোয়েসের অধীনে টটেনহ্যাম হটস্পার্স তো গেল বছর থেকে শীর্ষ চারে থাকার জন্য বড় দলগুলোকে কঠিন চাপের মধ্যে রেখেছে। বিশেষ করে আর্সেনালকে। এবারো যে তার ব্যতিক্রম কিছু হবে না তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়।
ময়েস ১১ বছর ধরে এভার্টনকে সামলানোর পর ফার্গুসনের পছন্দের ভিত্তিতেই শিরোপাধারী ইউনাইটেডের নতুন ম্যানেজার হয়েছেন। এভার্টনে তার কোন শিরোপা সাফল্য নেই। তাই দলটির অধিনায়ক নেমানজা ভিডিচও স্বীকার করছেন,‘লোকজন জানতে চাইছে আমরা আবার ট্রফি জিততে পারবো কিনা। আমরা আবারো চ্যাম্পিয়ন হতে পারবো কিনা?’
মরিনহোকে এক সময় ফার্গুসনের উত্তরসূরী হিসেবে ভাবা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। নিজের প্রজন্মের সবচাইতে মেজাজী কোচ হিসেবে সুবিদিত মরিনহো ও ময়েস অবশ্য একে অপরকে পরখ করার সুযোগ পাবেন লিগের শুরুর সপ্তাহগুলোতেই। চেলসি ডিফেন্ডার ব্রানিস্লাভ ইভানোভিচ অবশ্য বলেছেন,‘খেলাটি দিয়ে চ্যাম্পিয়নশিপের ফয়সালা হবে না। তবে এটা আত্মবিশ্বাসের বিচারে অনেক কিছুর সুরাহা করবে।’
চেলসি ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের খেলাটির আগে মরিনহো কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবেন। কেননা এ খেলার আগে তার দল ময়েসের তুলনায় একটি ম্যাচ বেশি খেলে ফেলবে। ময়েস ইতোমধ্যে এরকম সূচির সমালোচনা করেছেন। তার মধ্যে আবার প্রথম পাঁচ খেলার মধ্যেই ময়েসকে মোকাবেলা করতে হবে লিভারপুল ও ম্যানচেস্টার সিটিকে। এরকম পরিস্থিতির মধ্যেই কথার লড়াইয়ের জন্য বিখ্যাত এবং ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি ও পর্তুগালে শিরোপা জেতা মরিনহো প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে স্নায়ুর যুদ্ধ শুরু করেছেন।
এ কারণেই মরিনহো বলেন, ‘ক্লাবে গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার হলো জয়ের সংস্কৃতি চালু করা, ফলে আপনি দরজা দিয়ে প্রবেশের সময়েই সাফল্যের গন্ধ পাবেন। ডেভিড বড় একটা ক্লাবে আছেন এবং সেটাও একটা বড় সুবিধা। নইলে সবাই জানে কিভাবে জিততে হয়। অবশ্য ব্যাপারটা এখন তার হাতে। পাশাপাশি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো ক্লাবকে সামলানোর কারণেই ভীতির উপাদানও থাকে।’
গণমাধ্যম দৃশ্যত এদের নিয়েই ব্যস্ত থাকবে বলে পেলেগ্রিনি কিছুটা শান্তিতে তার প্রথম ইংলিশ ব্যবস্থাপনার কাজটি শুরু করতে পারবেন। রবার্তো মানচিনি ২০১১-১২ মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটির শিরোপা ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে বরখাস্ত হলে তাকে লা লিগা থেকে নিয়ে আসা হয়। সিটি গেলবার নগর প্রতিদ্বন্দ্বী ইউনাইটেড থেকে ১১ পয়েন্ট পেছনে ছিল। পেলিগ্রেনি এসে ১৩ কোটি ডলার ব্যয় করেছেন খেলোয়াড় ক্রয় বাবদ।
খেলোয়াড় কেনার দিক থেকে ইউনাইটেড বার্সেলোনার সেসক ফেব্রেগাসকে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও সফল হয়নি। স্ট্রাইকার ওয়েন রুনিকে আনার ব্যাপারে চেলসি এখনো সফল হতে না পারলেও ইতোমধ্যে খেলোয়াড় কেনা বাবদ চার কোটি ডলার খরচ করেছে।
আর্সেনাল গেল মৌসুমে চেলসির পেছনে থেকে চতুর্থ স্থান নিশ্চিত করতে কঠিন লড়াইয়ের মধ্যে পড়েছিল। তাই এবার তারা দলবদলের বাজারে তত্পর থাকলেও এখন পর্যন্ত কাউকে কিনতে পারেনি এবং দলটির কানাকড়িও খরচ হয়নি। লুইস সুয়ারেজের ব্যাপারে ছয় কোটির বেশি দিতে চাইলেও লিভারপুল তা প্রত্যাখ্যান করায় ধারণা করা হচ্ছে উরুগুয়ের এ স্ট্রাইকারটি হয়তো মত বদলেছেন। বিশেষ করে ক্লাবটি তাকে বর্ণবাদী পরিস্থিতি ও বিপক্ষের খেলোয়াড়কে কামড় দেয়ার পরও তাকে সমর্থন দিয়ে গিয়েছিল বলে।
টটেনহ্যাম হটস্পার তাদের উত্তর লন্ডনের পড়শি গানার্সদের উপর চাপ বাড়িয়ে চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত সাড়ে ছয় কোটি ডলারের মতো বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু কোচ ভিলাস বোয়াস এখনো গেরেথ বেলকে হারানোর শংকায় আছেন। প্রিমিয়ার লিগের সবচাইতে সম্ভাবনাময় এই খেলোয়াড়টিকে দলে ভেড়ানোর জন্য রিয়াল মাদ্রিদ রীতিমতো ওত পেতে আছে। তবে ২ সেপ্টেম্বর দলবদলের সময়সীমা উত্তীর্ণ হওয়ার আগে ওয়েলশ ফরোয়ার্ডটির ব্যাপারে কিছু বলা যাচ্ছে না। বেল এমন এক সময়ে প্রিমিয়ারশিপ ছেড়ে যাইতে চাইছেন যখন সোয়ানসি সিটির সাথে আরো একটি ওয়েলশ ক্লাব কার্ডিফ লিগটিতে এসে হাজির। ফলে কার্ডিফ-সোয়ানসি’র সুবাদেও ‘ডার্বি’ ম্যাচের সংখ্যা বাড়বে। উভয় দলের ম্যানেজারদের উপরও নজর থাকবে ফুটবলামোদীদের। একদিকে আছেন ডেনমার্কের মাইকেল লড্রাপ, অপরদিকে ইতালিয়ান পাওলো ডি ক্যানিও যিনি গেল মৌসুমে সান্ডারল্যান্ডকে প্রিমিয়ার লিগে ধরে রাখতে অবদান রাখেন। সোয়ানসি গেল মৌসুমে ১১তম হয়ে এবং লিগ কাপ জয়ের সুবাদে সবার নজর কাড়ে।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর মালিকানা বদলও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আলোচিত বিষয়। সান্ডারল্যান্ডকে নিয়ে ছয়টি প্রিমিয়ার ক্লাবের মালিক এখন আমেরিকানরা। বাকিগুলো হলো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, লিভারপুল, আর্সেনাল, অ্যাস্টন ভিলা ও ফুলহ্যাম। এর মধ্যে সর্বশেষ ফুলহ্যামটি কেনেন পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত আমেরিকান শাহিদ খান। আমেরিকানদের এমন আগ্রহের কারণ যুক্তরাষ্ট্রে এনবিসি টেলিভিশন প্রিমিয়ার লিগের সম্প্রচারের দায়িত্ব পাওয়া এবং নিউইয়র্কের সাবওয়ে ট্রেনগুলোয় চ্যানেলটির বিজ্ঞাপনের সুবাদে খেলাগুলো দেখা যাবে বলে।
নতুন টিভি সম্প্রচার স্বত্বের সুবাদে প্রিমিয়ার লিগটি আগামী তিন বছরে ৮৫০ কোটি ডলার রাজস্ব আয় করবে। ফলে লিগে নবাগত ক্রিস্টাল প্যালেস, কার্ডিফ ও হাল সিটি যারা হয়তো টিকে থাকতে পারবে না বলেই মনে করা হচ্ছে, এই রাজস্ব থেকে ন্যূনতম মৌসুম প্রতি নয় কোটি ডলার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা পাচ্ছে। কেবল অর্থকড়ির দিক থেকেই নয়, কি পরিমাণে লিগটি আন্তর্জাতিক রূপ পরিগ্রহ করছে তা বোঝা যায় কেনিয়ার প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে সাউদাম্পটনে নাম লেখানো ভিক্টর ওয়েনিয়ামার অংশগ্রহণ। তাকে নিয়ে বৃটেনের বাইরে এ পর্যন্ত ১০০টি দেশের খেলোয়াড় অংশ নিয়েছে প্রিমিয়ার লিগটিতে।
