‘প্যানেলে বা ট্রাইব্যুনালে যারাই থাকুন, এই অপরাধের অবশ্যই কঠোর বিচার হওয়া উচিত। কেউ নিজেকে নিরাপরাধ প্রমাণ করতে পারলে ভিন্ন কথা। নইলে দেশের ভাবমূর্তি ঠিক রাখার স্বার্থেই কঠোর সাজা হওয়া দরকার এসব অপরাধে।’
বলা হয়ে থাকে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ-উত্সব করার উপলক্ষ এনে দিয়েছে ক্রিকেট। আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের গৌরবময় একটা পরিচিতি তৈরি করে দিয়েছে এই খেলাটি। ফলে ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত হোন আর নাই হোন; দেশে প্রত্যেক নাগরিকেরই বড় গর্বের জায়গা ছিল এই ক্রিকেট।
কিন্তু সেই গর্বের জায়গা থেকেই ছিটে এসেছে এবার একটা কালির দাগ—ফিক্সিং কেলেঙ্কারি। আর এই দাগটা সরানো জাতীয় ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের জন্যই অত্যন্ত জরুরী বলে মনে করছেন সমাজের বিভিন্ন পেশার সম্মানীয় নাগরিকরা।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) দ্বিতীয় আসরে কমপক্ষে গোটা দুয়েক ম্যাচে যে ফিক্সিং করা হয়েছিল এবং বাংলাদেশের কয়েকটি আন্তর্জাতিক ম্যাচেও এই কালো স্পর্শ লেগেছিল, সেটা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য। এর মধ্যে বিপিএল নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অনুরোধে দীর্ঘ তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিয়ে গেছে আইসিসির দুর্নীতি দমন ও নিরাপত্তা ইউনিট (আকসু)। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিযুক্ত নয় জনের বিচার করতে একটি ডিসিপ্লিনারি প্যানেল গঠনের দ্বারপ্রান্তে এখন বিসিবি। ইতিমধ্যে প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্যানেলের বাকী কমপক্ষে ১০ জন সদস্য নিয়োগ দেবেন চেয়ারম্যান নিজেই। নিয়ম অনুযায়ী সমাজের বিশিষ্ট নাগরিক, সাবেক ক্রিকেটার ও সাবেক বিচারকদের নিয়ে গঠিত হবে এই প্যানেল। প্যানেল সদস্যদের এই নিয়োগ এখনও সম্পন্ন হয়নি। তবে বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্যানেলের সম্ভাব্য ১০ সদস্যর সঙ্গেই মৌখিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে।
মৌখিকভাবে এই প্রস্তাব পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশের প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হকও। এ বিষয়ে এটুকুর চেয়ে বেশি কিছু আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি বলতে অবশ্য রাজী হলেন না। কারণ, এখনও ব্যাপারটা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
তবে দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আর সবার মতোই ক্রিকেট খেলায় এই ফিক্সিংয়ের মতো ব্যাপারগুলো যে খুবই অনাকাঙ্খিত সেটা বলতে দ্বিধা করলেন না সর্বজনশ্রদ্ধেয় এই আইনজীবী। শুধু ফিক্সিং অনাকাঙ্খিত, তাই নয়; ব্যারিস্টার রফিকুল হক মনে করছেন, এই ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ‘ক্রিকেট খেলার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মন্ডলে একটা সুনাম তৈরি হয়েছিল। সেই সুনামেই খুব আঘাত হেনেছে ব্যাপারটা। একজন ক্রিকেটার প্রকাশ্যে এরকম অন্যায় করার কথা স্বীকারও করেছেন বলে জানা গেছে। এটা তো খুব লজ্জার একটা ব্যাপার।’
এই লজ্জা থেকে মুক্তি পেতেই কঠোর একটি বিচার হওয়া উচিত বলেও মনে করছেন ব্যারিস্টার রফিকুল হক। তার মতে, ‘প্যানেলে বা ট্রাইব্যুনালে যারাই থাকুন, এই অপরাধের অবশ্যই কঠোর বিচার হওয়া উচিত। কেউ নিজেকে নিরাপরাধ প্রমাণ করতে পারলে ভিন্ন কথা। নইলে দেশের ভাবমূর্তি ঠিক রাখার স্বার্থেই কঠোর সাজা হওয়া দরকার এসব অপরাধে।’
ঠিক একই মত দিলেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও আন্তর্জাতিক ম্যাচ রেফারি রকিবুল হাসান। তিনিও বললেন, তিনি প্যানেল সদস্য হওয়ার প্রস্তাব পেয়েছেন এবং সে ব্যাপারে সম্মতিও দিয়েছেন। তবে প্যানেল সদস্য হওয়াটা রকিবুল হাসানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনিও মনে করেন, ক্রিকেটকে বাঁচাতেই এই বিচারটা ভালোভাবে শেষ হওয়া দরকার, ‘বাংলাদেশে খুব কম রিপোর্টই আলোর মুখ দেখে। ফলে এই তদন্তটা শেষ করে একটা রিপোর্ট পর্যন্ত পৌঁছাবে বিসিবি ও আইসিসি যে উদ্যমী ভূমিকা রেখেছে, তাতে তারা একটা ধন্যবাদ পেতে পারে। এবার প্যানেল ও ট্রাইব্যুনাল গঠন হবে। এখানে বিচার বিভাগের অভিজ্ঞ জনেরা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা, ক্রিকেট অভিজ্ঞরা থাকবেন। এখান থেকে অপরাধীরা কঠোর সাজা পেলে ভবিষ্যতে আর কেউ ক্রিকেটে এ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাবে না। একই সঙ্গে দেশের যে সম্মান নষ্ট হয়েছে, সেটা উদ্ধার হবে।’
