লোপামুদ্রা মিত্র। কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী। তার গান শুধু কলকাতাতেই নয়, এ দেশেও বেশ জনপ্রিয়। এ দেশের একাধিক অ্যালবামে কণ্ঠও দিয়েছেন তিনি। ঘুরেও গেছেন একাধিকবার। সম্প্রতি তিনি দেশ টিভির উদ্যোগে ‘কলের গান’ অনুষ্ঠানে সরাসরি গান গাইতে আবারও ঢাকায় আসেন। উঠেন ঢাকা ক্লাবে। সেই সুযোগে ঢাকা ক্লাবের গেস্ট হাউজে ইত্তেফাক বিনোদন প্রতিদিন-এর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন রবি হাসান, ছবি তুলেছেন দীপঙ্কর দীপু
আপনি তো বাংলাদেশে প্রায়ই আসেন। এই দেশ প্রসঙ্গে আপনার অভিজ্ঞতা বলুন।
আমি তো বাংলা ভাষারই মানুষ, বাংলাতেই গান করি। তাই বাংলাদেশকে আমার নিজের দেশ বলেই মনে হয়। খুব একটা আলাদা করতে পারি না কলকাতা ও এ দেশের মধ্যে। যতক্ষণ বাংলাদেশে থাকি, মনেই হয় না আমি বিদেশে আছি। যেন নিজের দেশেই আছি। বিশেষ করে দেশ টিভির লাইভে এ দেশের দর্শকদের যে পরিমাণ রেসপন্স পেয়েছি তা আসলেই অবিশ্বাস্য। এই দেশের মানুষের মধ্যে অনেক আবেগ ও ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। শুধু এ দেশে প্রোগ্রাম করেছি বলেই কিন্তু নয়, আমাদের দেশের চ্যানেলেও লাইভ অনুষ্ঠানে ঢাকা থেকে অনেক ফোন আসে।
কিছুদিন আগে তো আপনাদের একটি শীর্ষ অডিও প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, আপনাদের ওখানকার বর্তমান অডিও শিল্প প্রসঙ্গে একটু বলুন।
আমাদের দেশে অডিওর অবস্থা যে খুব ভালো তা কিন্তু নয়। গান হচ্ছে অনেক, আলোচনাতেও আসছে। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির কোনো লাভ হচ্ছে না। পাইরেসিটা যেন অডিও শিল্পকে চারপাশ থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। ইউটিউবসহ ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইটে এখন গান অহরহ ফ্রিতে ডাউনলোড হচ্ছে। যাতে শিল্পী বা শিল্পের কোনো লাভ হচ্ছে না। আর এসব কারণেই শীর্ষ অডিও প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অবস্থান ধরে রাখতে না পেরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চেষ্টা কিন্তু কেউ কম করছে না। কিন্তু কী হবে? যথাযথ কর্তৃপক্ষের সেই উদ্যোগ নেই। তারপর কয়েকদিন আগে খবরে দেখলাম যে, কিছু পাইরেটেড ও ফ্রি ডাউনলোডের সাইট নাকি বন্ধ করা হয়েছে। এটা যদি হয়ে থাকে তাহলে তো শিল্পী এবং শিল্প উভয়ের জন্যই সুখবর। আর যারা শ্রোতা রয়েছে, তাদেরও মূল সাউন্ড শোনার প্রতি আগ্রহ নেই। সিডি থেকে তারা যেই সাউন্ডটা পাচ্ছে, ডাউনলোডে কিন্তু তা নেই, অনেকাংশেই নষ্ট হয়ে তারপর আপলোড হয়। কিন্তু তারা তো এতেই সন্তুষ্ট। তারা যদি একটু সচেতন হয় তাহলে আরও ভালো।
ভারতজুড়ে হিন্দি গানের আগ্রাসন বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। সেই আগ্রাসনের প্রভাব রয়েছে বাংলাদেশেও। কলকাতায় হিন্দি গানের সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলা গানের টিকে থাকা প্রসঙ্গে কিছু বলুন।
আমরা বাংলা ভাষায় কথা বললেও আমাদের জাতীয় ভাষা কিন্তু হিন্দি। আর দশটা ভাষার মতো বাংলাও আমাদের আঞ্চলিক ভাষা। সেদিক থেকে হিন্দির প্রভাবটা আমাদের এখানে থাকাটা একটু স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের বিষয়টা একটু ভিন্ন হওয়া উচিত। আর বলিউড তার কাজ ও গতি দিয়ে এরইমধ্যে বিশ্বে ভালো একটি অবস্থান তৈরি করেছে। আমাদের বাংলা গানের জায়গাটা সীমিত হলে কী বাংলায় গাইব না? এটা আমাদের নিজের ভাষা। এর চর্চাটা নিয়মিতই করতে হবে। শ্রোতা-দর্শকদের ভালো কাজ উপহার দিয়ে, অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হবে।
মাঝে একবার আপনার এবং আপনার স্বামী বিশিষ্ট সুরকার জয় সরকারের সঙ্গে দাম্পত্য কলহ বা শীতল সম্পর্কের কথা কলকাতার বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। এই বিষয়ে কী বলবেন?
এটা নিয়ে আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি। জয় সরকার শুধুই আমার স্বামী নয়, আমার উত্সাহ, প্রেরণা ও বন্ধুও বটে। মান-অভিমান সব জায়গায় থাকে। কিন্তু বিষয়টিকে যেভাবে তেলে-বেগুনে বিভিন্ন জনেরা ভেজেছে তা আসলেই অবাক করার মতো। আর এ তো বহু আগের কথা।
বাংলাদেশের গান প্রসঙ্গে আপনার মতামত জানতে চাই।
বাংলাদেশের গান নিয়মিতই শোনা হয়। বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত। আর এ দেশের অনেক রবীন্দ্র তারকাই তো আমাদের দেশে জনপ্রিয়। যেমন, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে ছাড়া তো আমাদের এখানে কোনো রবীন্দ্রানুষ্ঠান কল্পনাই করা যায় না। ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশের গান শুনছি। ফোক গান, লোকগান, লালন সংগীত আমার কাছে ভালো লাগে। তবে আধুনিক গানে সমসাময়িকদের মধ্যে অর্ণব, শায়ান, কৃষ্ণকলির গান ভালো লাগে। কিছু ব্যান্ড আছে এদের গানও অসম্ভব ভালো লাগে।
আপনার গানের মধ্যে কবিতার প্রভাব লক্ষ করা যায়। এই বিষয়টা একটু শেয়ার করুন।
আমার গানের মধ্যে সৌমিক চট্টোপাধ্যায়ের একটা ছায়া আছে এমনটা বলতে পারেন। আমি খুব ছোটবেলা থেকেই থিয়েটারে যুক্ত ছিলাম। যখন বয়স ১২ কি ১৩ তখন থেকেই কবিতা থেকে গান করতাম। আমার শুরুটাই হয়েছিল কবিতা দিয়ে। তাই পরবর্তীতে এসে আমার গানে কবিতার প্রভাবটা একটু বেশি পাওয়া যায়। পরবর্তীতে আমি কিছু গীতিকার পাই যারা কবিতার মতো করেই গান লিখতেন। তাই বিষয়টি আরও একটু সহজ হয়। এখনও আমার পছন্দের অনেক কবিতা রয়েছে, যেগুলো থেকে গান করলে অনেক সুন্দর ও ভালো হয়। তবে একটা কথা বলে রাখি, সব কবিতা দিয়ে কিন্তু ভালো গান হয় না। কবিতাটা যতই ভালো হোক।
