নজরুল ইসলামের যে পরিবারে জন্ম, সে পরিবা¬রের একটি সাধারণ ছবি আঁকলে তা নিয়ে সত্যিই দারুণ বিস্ময় জাগে। তাঁর পিতার নাম ছিল কাজী ফকির আহমেদ। আমরা সাধারণত যে ধরনের আর্থিক অবস্থার মানুষকে ফকির বলে উল্লেখ করি, নজরুলের বাবা ছিলেন প্রায় সেই ধরনেরই একজন দরিদ্র মানুষ; তার ওপর তিনি কোনো লেখাপড়াও জানতেন না। দুইটি বিয়ে করেছিলেন, সন্তান হয়েছিল নয়টি। নজরুলের মা ছিলেন তাঁর বাবার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী, নাম জাহেদা খাতুন। নজরুলের জন্মের আগে এই মায়ের চারটি সন্তান মারা যায়। নজরুল ছিলেন তাঁর মায়ের ষষ্ঠ সন্তান। তাঁর নাম যে দুখু মিয়া রাখা হয়েছিল, তা ছিল পুরোপুরি যথার্থ। তাঁর এই নামকরণ সম্পর্কে অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের একটি মন্তব্য দারুণ আকর্ষণীয়। তাঁর মতে, ‘এ মানুষটির জীবনে আর যা কিছুরই অভাব হোক দুঃখের অভাব কোনদিন হয়নি।’ দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, বহুসন্তান, শিশুমৃত্যু, নিরক্ষরতা—যে পরিবারের সাথে এতগুলো পশ্চাত্পদ বৈশিষ্ট্য যুক্ত থাকে, সেখানে যে একজন মহত্ কবি জন্মাবেন এবং উত্তরকালে তিনি একটি স্বাধীন দেশের জাতীয় কবির স্বীকৃতি পাবেন, অস্বাভাবিক কল্পনাপ্রবণ না হলে কারও পক্ষে সে রকম ভাবা সম্ভব নয়।
নজরুলের জন্মস্থান চুরুলিয়া গ্রামটি হিন্দু এবং মুসলিম ঐতিহ্যের দুটি ঐতিহাসিক নিদর্শনের জন্য পরিচিত ছিল। এর একটি হলো রাজা নরোত্তম সিংহের দুর্গ, নজরুলের বাড়ির পূর্ব দিকে এটি অবস্থিত ছিল। ১৯১৭ সালে নজরুল ভগ্নস্তূপ নামে যে কবিতা লেখেন, সেখানে এই স্থাপনার প্রভাব পাওয়া যায়। নজরুলের বাড়ির দক্ষিণ দিকে ছিল পীরপুকুর নামে একটি বিরাট পুকুর। একজন মুসলিম সাধক এই পুকুরটি খনন করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। তবে এই সাধকের নাম পরিচয় বা কোন সময় তিনি এই পুকুর খনন করেছিলেন, তা জানা যায় না। পুকুরের পূর্ব পাড়ে ওই সাধকের একটি মাজার ছিল, পশ্চিম পারে ছিল একটি মসজিদ। নজরুলের পিতামহ থেকে বংশানুক্রমে এই মাজার এবং মসজিদের দেখাশোনার ভার ছিল এই পরিবারের ওপর। এই দেখাশোনার কাজটির জন্য পরিবারটিকে ওই মাজারের খাদেম বলা হতো। ১৯০৮ সালে নজরুলের পিতা মারা যাওয়ার পর দশ বছর বয়সের নজরুল ওই মসজিদের মুয়াজ্জিনের কাজ করতেন বলে নজরুলের অধিকাংশ জীবনীতে দেখা যায়। নজরুলের লেখাপড়া হয়েছিল গ্রাম্য মক্তবে। এই মক্তবে তিনি আরবি, ফারসি এবং উর্দু ভাষা এবং কিছু ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করেছিলেন বলে নজরুলের জীবনী লেখকরা উল্লেখ করেন। কিন্তু তারপরও এ নিয়ে সংশয় যায় না। বর্ধমানের একটি অজ পাড়াগাঁয়ে হাতুড়ে শিক্ষকের কাছে একটি দশ বছরের শিশুর পক্ষে একসঙ্গে এই তিনটি ভাষা শেখা কতটুকু সম্ভব, সেটি যুক্তিযুক্তভাবে ভাবা দরকার। এমনকি নজরুলের সেইসব ভাষা শিক্ষকদেরও এই ভাষাগুলো কতটুকু এবং কোন মাত্রায় জানা সম্ভব ছিল, সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নও করা যেতে পারে। তার ওপর নজরুলের বাড়িতে বই পড়িয়ে দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। ফলে বড়জোর ওইসব ভাষার গুটিকতক শব্দ একপ্রকার না বুঝে মুখস্থ করা ছাড়া নজরুলের বিশেষ কোনো ভাষাগত জ্ঞান অর্জিত হয়েছিল বলে মনে হয় না। যা-ই হোক, লেখাপড়া যেমনই হোক না কেন, মক্তবের পাঠ শেষ করার পরপরই তিনি ওই মক্তবে একজন মোল্লার চাকরি পেয়েছিলেন। তখন তাঁর বয়স সবে দশ পেরিয়েছে। দশ বছর বয়সের একটি শিশু মক্তবে ইসলামি জ্ঞান শিক্ষা দিচ্ছে, এবং তা ওই গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ মুসলিমরা মেনে নিচ্ছে—ঘটনার মধ্যে কিছু অতিরঞ্জন ঘটেছে কি না, সন্দেহ হয়। এখানে একটা সম্ভাবনা প্রবল। সম্ভাবনাটি হলো, গ্রামের মক্তবটির লেখাপড়া ছিল নেহায়েতই দায়সারা গোছের। ফলে খাদেম পরিবারের একজন কোনো রকমে ঠেকা দিয়ে মক্তবটি চালিয়ে নিচ্ছে, এটুকুতেই হয়তো গ্রামবাসীরা তুষ্ট ছিল। চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণীর জ্ঞান নিয়ে সে সময় অনেকেই গ্রাম্য পাঠশালা কিংবা মক্তবে শিক্ষকতা করতেন। নজরুলের ক্ষেত্রেও সে রকম ঘটে থাকবে। আর ধর্মীয় জ্ঞানের ব্যাপারে বর্তমান সময়ের মতো এত সচেতনতা ও বাছবিচার তখনকার অভিভাবকদের ছিল না; ফলে গ্রামবাসীরা যে তাঁকে মক্তব্যের শিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন, তা তেমন অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। যা-ই হোক, এই সময়ে উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি আরেকটি কাজ পেয়েছিলেন। সেটি হলো মসজিদে আজান দেওয়া। তবে তাঁর এই মোল্লাগিরি ছিল নিতান্তই অল্প সময়ের এবং আক্ষরিক অর্থেই অল্প বয়সের ব্যাপার। পরিণত বয়সে তাঁর মধ্যে এই জাতীয় কোনো প্রচেষ্টা দেখা যায় না। বরং একপ্রকার উল্টোপথে যাত্রা এবং উল্টোরথে আরোহণকেই তিনি তাঁর ভবিতব্য বলে বেছে নিয়েছিলেন।
জীবত্কালে বা আরও খোলসা করে বললে ১৯২২-২৩ সাল থেকে আরম্ভ করে পরবর্তী এক দশকে তিনি প্রায় হঠাত্ করে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠেছিলেন। প্রত্যেক যুগেই এ রকম দুই-একজন প্রতিভাবানের দেখা মেলে যারা বছর দশেক তীব্র আলোড়ন তুলে তারপর একপ্রকার হারিয়ে যান। পরবর্তী যুগে এসব হঠাত্ উত্তেজনা সৃষ্টিকারীদের অনেকের নামও লোকে মনে করতে পারে না। নজরুল এক্ষেত্রে শুধু ব্যতিক্রমই ছিলেন না, ছিলেন একবারে অনন্য। অথচ এই লোকটির সাহিত্যচর্চার মেয়াদ ছিল সাকুল্যে মাত্র বিশ বছর। ১৯৪২ সালের পরে তিনি সাহিত্যচর্চা তো দূরের ব্যাপার, মুখের কথাটি পর্যন্ত বলতে পারতেন না। শারীরিকভাবে এরপর তিনি ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। ব্রিটিশ আমলে বাকরুদ্ধ এবং বুদ্ধিরুদ্ধ হয়ে গোটা পাকিস্তান আমলের চব্বিশ বছর এবং এবং বাংলাদেশ আমলের পাঁচ বছর তিনি বেঁচে থাকলেন নির্বাক হয়ে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়, মহাত্মা গান্ধী এবং বঙ্গবন্ধুর মতো মানুষের হত্যাকাণ্ড—রাজনীতি ও সংস্কৃতি জগতের এসব বিরাট পালাবদল চোখের সামনে ঘটতে দেখেও তিনি হয়তো এর কিছুই বুঝতে পারেননি। তিনি নিজে যে বাংলাদেশের জাতীয় কবির সম্মান পেয়েছেন, তাও বুঝতে পেরেছিলেন কি না, সন্দেহ হয়। জীবনের সবচেয়ে পরিণত ও ফলবান সময়টিতেই তিনি চিন্তা ও ভাষা প্রকাশের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্ত যে অল্প সময় তিনি লিখতে ও বলতে পেরেছিলেন, তা তুমুল নিন্দা ও প্রশংসা কুড়ায়। তাঁর যুগপত্ এই নাম ও বদনামের একটি উপলক্ষ ছিল ধর্ম। তিনি কতবড় মাপের প্রতিভাবান, একসময় সেই আলোচনার চেয়ে প্রধান হয়ে উঠেছিল তিনি আর পাঁচজনের মতো ধর্মকর্ম করেন কি না। এই বিতর্ক এমনই স্থূল এবং রুচিহীন হয়ে পড়েছিল যে, নজরুল নিজেই এর একটা জবাব দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। তাঁর ‘কৈফিয়ত’ কবিতাটি লেখা হয়েছিল আসলে একরকম ব্যক্তিগত কৈফিয়ত দেওয়ার জন্যই। এই কবিতায় তিনি বলেছিলেন যে, ধর্মান্ধ মুসলমানরা তাঁকে কাফের বলে ফতোয়া দেয়। কিন্তু এই কারণে ধর্মান্ধ হিন্দুদের কাছ থেকে তিনি বাহবা পান না। বরং তাদের বিবেচনায় তিনি একটা ‘পাতি নেড়ে’!
সমপ্রতি ধর্মকর্ম নিয়ে এমন একটা পুরোনো হাওয়া আবার বইতে শুরু করেছে। যে কেউই এখন যাকেতাকে চট করে প্রশ্ন করে বসছে যে সে ধর্মকর্ম করে কি না? যদি কোনোভাবে প্রশ্নকারীর মনে হয় যে, অমুক ঠিকঠাকমতো ধর্ম পালন করেন না—তা তিনি যত বড় প্রতিভাবান বা মেধাবী মানুষ হন না কেন—তাহলে রাস্তায় মিছিল করে তাঁর ফাঁসি পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। অস্বস্তিকর এই ধর্মান্ধ হট্টগোলে নজরুলের জীবনাচারণে ধর্ম কীভাবে অনুসৃত হতো, তা নিয়ে একদফা আলোচনা করা যেতে পারে। এই আলোচনায় নজরুলকে বেছে নেওয়ার অবশ্য একটি কারণ রয়েছে। সমপ্রতি দেখা যাচ্ছে, ধর্মান্ধ বা জেহাদি কিংবা মুক্তমনা মানুষ এরা অনেকেই নজরুলের নানা পঙিক্ত তাদের ভাবাদর্শের অনুকূলে কোট করছেন। ফলে নজরুলের ধর্ম পালন যে ঠিক কেমন ছিল এবং তিনি যে ঠিক কোন অধ্যাত্ম চেতনার লোক ছিলেন, অনেক ক্ষেত্রেই তা বোঝা মুশকিল হয়ে পড়েছে। নজরুলের ধর্ম জীবন নিয়ে তাই একদফা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
আগেই বলা হয়েছে, নজরুলের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল একরকম মক্তবের শিক্ষক হিসেবে। অল্প বয়সে পিতা হারানোয় তাঁকে অকালে এই আয়ের পথে নামতে হয়েছিল। দশ-এগারো বছরের নজরুল মাথায় একটা মুসলমানি টুপি পরে সামনে বসে থাকা কতিপয় গ্রাম্য ছাত্রকে আরবি, ফারসি ও উর্দু পড়াচ্ছেন; আর তার ছাত্ররা শরীরে দোল দিয়ে দিয়ে তা মুখস্থ করছে—নজরুলের সারা জীবনের বিদ্রোহী বা প্রেমিক বা সৈনিক কোনো ধরনের ইমেজের সাথে এই দৃশ্য মেলানো যায় না। কিন্তু অবস্থার ফেরে পড়ে তাঁকে তা-ই করতে হয়েছিল। অনুমান করা যায়, এ সময় তিনি নিয়মিত নামাজ পড়তেন। মাত্র বছরখানেক পরেই তিনি এই কাজ ছেড়ে দেন; বলা চলে আজীবনের জন্য ছেড়ে দেন। এরপর যেখানে তিনি যোগ দেন, সেটা মোটেই ইসলামিক জায়গা ছিল না। বরং গোঁড়া কোনো মুসলমান জায়গাটিকে রীতিমতো কাফেরি জায়গা বলে ফতোয়া দিতে পারেন। সেটি হলো ‘লেটোর দল’। লেটোর দল হলো গ্রাম্যভাবে গড়ে ওঠা যাত্রা গানের দলের মতো একপ্রকার পালা গানের দল। এরা বিভিন্ন পর্ব উপলক্ষে গ্রামে গ্রামে মজুরির বিনিময়ে বিভিন্ন পালা অভিনয় করে দেখাত। নাচ, গান, অভিনয়, বাদ্যযন্ত্র বাজানো এসব নানা রকম মনোহারি বিনোদন উপকরণ দিয়ে সাজানো এই লেটোর গান ছিল তত্কালীন বর্ধমান এলাকার অন্যতম গ্রামীণ বিনোদন। লেটোর আসর গ্রাম্য লোকশিল্পীদের একরকম কেরামতি দেখানোর জায়গাও ছিল। নজরুল প্রতিভার প্রথম কেরামতিও এই লেটোর দলেই শুরু হয়। এখানে তাঁর মূল ভূমিকা ছিল গান গাওয়া এবং নাচা। তবে অল্প দিনের মধ্যেই তিনি নিজেই একজন জাঁদরেল পালাকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সাধারণত লেটো গানের বিষয় ছিল হিন্দু পুরাণের নানা কাহিনি। নজরুলও মোটামুটি এইসব পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে পালা লিখতে শুরু করেছিলেন। যেসব পালা তিনি লিখেছিলেন তার মধ্যে মেঘনাদ বধ, দাতাকর্ণ, শকুনীবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ নামক চারটি পালা অন্যতম। এসব পৌরাণিক পালার পাশাপাশি আকবর বাদশা এবং চাষার সঙ নামে দুটি পালাও তিনি লেখেন। এই সময় নজরুল ইসলামের ধর্মীয় জীবন যাপনের কোনো প্রমাণ মেলে না। পরিবার থেকেও তিনি অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে একরকম বাউণ্ডুলে ধরনের স্বাধীন জীবন বেছে নিয়েছিলেন। এরপর কিশোর বয়সেই অন্তত তিনটি পেশায় তিনি জড়ান, যার একটিও মর্যাদার দিক দিয়ে উঁচু দরের নয়। প্রথমটি হলো রুটির দোকানের সহকারীর চাকরি, দ্বিতীয়টি রেলওয়ের গার্ডের ভৃত্য এবং তৃতীয়টি এক দারোগার বাড়ির কাজের লোকের চাকরি।
১৯১৭ সালেই তিনি প্রথমবারের মতো, লোকের কাছে বলা যায়—এমন একটা চাকরি পান। চাকরিটি হলো সেনাবাহিনীর চাকরি। ব্রিটিশ বাহিনীর হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি এই চাকরিতে যোগ দেন। নজরুল জানতেন যে, ব্রিটিশ বাহিনী খিলাফতের সমর্থকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তাঁর যে ইরাকে যুদ্ধ করতে যাওয়ার কথা ছিল এবং সেটি করতে হলে মুসলমান হয়ে তাঁকে যে খিলাফতের বিরুদ্ধে লড়তে হবে—এ ব্যাপারেও তিনি সচেতন ছিলেন। সমগ্র ভারতের মুসলমানেরা তখন খিলাফতের হেফাজতের জন্য রাজপথে নেমেছে; নজরুল এই গণউন্মাদনায় অংশ তো নিলেনই না, বরং প্রকারান্তরে খিলাফতের উচ্ছেদের জন্য অস্ত্র ধরতে গেলেন। তবে আমাদের সৌভাগ্য যে, নজরুলকে ইরাকেও যেতে হয়নি, যুদ্ধও করতে হয়নি। তাহলে শত্রুর গোলার আঘাতে অকালে তিনি মারাও পড়তে পারতেন। প্রাত্যহিক পিটি প্যারেডের বাইরে একরকম শুয়ে বসেই তিনি তাঁর সৈনিক জীবন পার করে দিয়েছিলেন। এ সময় তিনি এক মৌলভির কাছে ফারসি ভাষা শেখেন। ভারতবর্ষে চাকরির ক্ষেত্রে তখন ফারসি ভাষার কানাকড়িও মূল্য ছিল না, তবু ইংরেজি না শিখে তিনি ফারসি শেখেন সম্ভবত ফারসি সাহিত্য পাঠ ও অনুবাদ করার জন্য। ক্যান্টনমেন্টে বসে তিনি আর যা যা করেন, তার একটিও যুদ্ধবিদ্যার সাথে যুক্ত ছিল না, বরং ছিল উল্টো। নিয়মিত তিনি নানান বাদ্য-বাজনা সহযোগে গানের আসর বসাতেন, কবিতা লিখতেন, লিখতেন গদ্যও। নিয়মিত সাহিত্য পত্রিকা পাঠ করতেন। এসবের কোনোটিই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য অপেক্ষমান কোনো সৈনিকের কাজ হতে পারে না। সৈনিক মেসও ছাত্রদের মেসের মতো গান-বাজনা ও আকাশ কুসুম কল্পনার অলস নিবাস হয়ে উঠতে পারে, নজরুল ইসলাম সৈনিক না হলে আমাদের তাও অজানা রয়ে যেতো।
সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থায় তিনি যেসব কবিতা লিখেছিলেন, তার প্রায় সবই ছিল ইসলামি ধাঁচের। সৈনিক জীবন থেকে ফিরে এসে পরবর্তী এক বছরও তিনি মূলত এই ধারাতেই কবিতা লিখেছেন। ‘শাতিল আরব’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘কোরবানী’, ‘মোহররম’, ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজদহম’ প্রভৃতি কবিতাগুলো এই সময়েই লেখা। মক্তবে পড়া হতদরিদ্র মাজারের খাদেম পরিবারের একটি ছেলের জন্য এ রকম ইসলামি ধারায় কবিতা লিখে নিছক মুসলমানদের মধ্যে খানিকটা বাহবা কুড়িয়ে জীবন কাটিয়ে দেওয়াই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু নজরুলের প্রতিভা ছিল এমন অসাধারণদের দলে যে, সাধারণ এসব হিসাব নিকাশ উল্টে তিনি চলতে থাকেন সম্পূর্ণ নিজের তৈরি করা এক পথে। ১৯২১ সাল অবধি যিনি মূলত ইসলামি কবিতা লিখছেন, ১৯২২ সালে এসে তিনি একপ্রকার হঠাত্ করেই লিখে ফেললেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। এই কবিতার ভাষা, ছন্দ, উপস্থাপন ভঙ্গি এবং মিথ-এর ব্যবহার ছিল এককথায় অনন্য; চর্যাপদ থেকে শুরু করে প্রায় হাজার বছরের বাংলা কবিতার ইতিহাসে এমন তেজোদ্দীপ্ত ভঙ্গির কবিতা আর একটিও লেখা হয়নি। এই কবিতার আরেকটি তাত্পর্যপূর্ণ দিক ছিল এর অসামপ্রদায়িক চরিত্র। ভারতীয় ও গ্রিক পুরাণের পাশাপাশি এই কবিতায় ইসলামি ঐতিহ্যের সমান্তরাল ব্যবহার হয়েছে। এই কবিতায় যেভাবে ভগবানের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দেওয়া কিংবা খোদার আসন আরস ছেদিয়া উঠবার ঘোষণা এসেছে, তাতে তাঁকে ধর্মনিরপেক্ষ বা ছিদ্রান্বেষীদের ভাষায় বলতে গেলে ধর্মদ্রোহী হিসেবে শনাক্ত করা চলে। বিশ শতকের শুরুর দিকে বাংলাদেশের কোনো ঘোষিত নাস্তিকও এতটা বলার সাহস দেখাননি।
অথচ নজরুল ইসলামকে নাস্তিক হিসেবে শনাক্ত করা চলে না। তাঁর অসংখ্য লেখা থেকে এবং ব্যক্তিগত আচরণ থেকে প্রমাণ দেওয়া যায় যে, সৃষ্টিকর্তায় তাঁর বিশ্বাস ছিল। তবে সে বিশ্বাস যে আর দশজন মুসলমানের মতো ছিল না, তা একপ্রকার নিশ্চিত করে বলা যায়। নইলে বিশ শতকের ভারতবর্ষে তিনি ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনো মুসলমান ছিল কি না সন্দেহ, যিনি নিঃসংকোচে ঘাষণা দিতে পারেন, তাঁর মনের দোতারার একটি তার শ্যামের এবং আরেকটি শ্যামার? তাঁর এই ঘোষণা নিছক একটা কথার কথা ছিল না, বস্তুত তিনি একই হাতে এতো উত্কৃষ্ট শ্যামা সংগীত এবং শ্রীকৃষ্ণের ভজন লিখেছেন যে, শ্যামা কিংবা শ্যামের আজন্ম কোনো বাঙালি ভক্তও তা পারেননি। একটি গানে তিনি লিখেছেন :
শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে জপি আমি শ্যামের নাম।
মা হলেন মোর মন্ত্রগুরু ঠাকুর হলেন রাধেশ্যাম।
পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের সাধক কবির-এর মধ্যে ছাড়া সমগ্র ভারতবর্ষের ভক্তিমূলক সাহিত্যে এমন অগতানুগতিক ভক্তির নজির মেলে না। এসব গান তিনি শুধুমাত্র গ্রামোফোন কোম্পানির কাঁচা টাকার আকর্ষণে লিখেছিলেন—এমন নয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হিন্দুধর্মের শাক্ত পদ্ধতির উপাসনা পর্যন্ত করেছেন। বিশেষত পুত্র অরিন্দম খালেদ, যাকে কবি বুলবুল নামে ডাকতেন, মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সে মারা যাওয়ার পর তিনি শোকে অধীর হয়ে কালীর উপাসনার মাধ্যমে শান্তি খুঁজেছিলেন। কালীর উপাসনার জন্য তিনি মুর্শিদাবাদের বরদাচরণ মজুমদারকে (১৮৮৬—১৯৪৭) গুরু হিসেবে গ্রহণও করেছিলেন। এই গৃহযোগীর কাছ থেকে নজরুল যোগ সাধনা শিখেছিলেন। গুরুর কথামতো শ্মশানে গিয়ে সাধনাও করেছিলেন। এমনকি বাড়িতে কালীর প্রতিমা স্থাপন করে তার পূজা পর্যন্ত করেছিলেন। ধর্মের এমন প্রথাবিরোধী চর্চা অবশ্য তাঁর আগে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব (১৮৩৬—১৮৮৬) হাতে কলমে করে দেখিয়েছিলেন। নজরুল নিজে রামকৃষ্ণের অনুরাগী ছিলেন কি না তা জানা যায় না, কিন্তু কলকাতার শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্তের ধর্মভাবনায় তখন যেভাবে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ স্থান করে নিচ্ছিল, তার খবর নজরুল নিশ্চয়ই জেনে থাকবেন। রামকৃষ্ণ মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েছিলেন, খ্রিষ্টীয় পদ্ধতিতে প্রার্থনাও করেছিলেন। নজরুল কি এই উদাহরণ দ্বারা প্রভাবিত হননি?
নজরুল ইসলাম যখন কালীপূজা করছেন, ভারতবর্ষের আবহাওয়া তখন ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। হিন্দুরা তাদের ধর্ম নিয়ে ঊনবিংশ শতকব্যাপী প্রবল হট্টগোল সেরে কিছুটা দুনিয়াদারির দিকে মন দিতে শুরু করেছে। অন্যদিকে মুসলমানদের মধ্যে শুরু হয়েছে ‘হিন্দুয়ানি’ ঝেড়ে ফেলা। রাজনৈতিকভাবে তাদের কাছে মুসলমানি পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—শিক্ষিত মুসলমানদের নাম থেকে ‘শ্রী’ অথবা ‘শ্রীমান’ বিশেষণটি উঠে যেতে শুরু করেছে, পোশাক হিসেবে মুসলমানেরা ধুতি ত্যাগ করতে শুরু করেছে, পাকিস্তান আন্দোলন জোরদার হতে শুরু করেছে। ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের এই প্রবল ডামাডোলের মধ্যে নজরুল অংশগ্রহণ তো করলেনই না, বরং চলতে লাগলেন একেবারে উল্টোপথে। ১৯৪০ সালে লাহোরে যখন ফজলুল হক (১৮৭৩—১৯৬২) দ্বিজাতি তত্ত্ব উত্থাপন করছেন, তখন নজরুল বরদা মজুমদারকে নিয়ে একপ্রকার গুরুবন্দনা করছেন। ওই বছর বরদাচরণের লেখা যোগ সাধনা বিষয়ক একটি বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে তিনি অকপটে বলছেন যে, বরদাচরণ তাঁর যোগ সাধনার গুরু এবং তাঁর যাবতীয় অর্জনের প্রকৃত অনুপ্রেরণা। এ রকম অদ্ভুত সব কাণ্ড শুধু নজরুলের পক্ষেই ঘটানো সম্ভব ছিল।
জীবনের কয়েকটি বছর হিন্দুধর্মের শাক্ত, যোগ প্রভৃতি পদ্ধতিতে উপাসনা করলেও বাল্যকাল থেকে ইসলাম ধর্মকে নজরুল গুরুত্বের সাথে অনুসরণ করেছেন। তবে সেই অনুসরণের স্টাইলও ছিল একান্তই নজরুলের নিজস্ব। যেমন, ত্রিশের দশকের শেষ দিকে যখন তিনি কালী সাধনা ও শ্যামা সংগীত রচনায় মগ্ন হয়ে আছেন, একই সময়ে তিনি কোরআনের অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবনের জন্য একজন মুসলিম মরমী সুফি সাধককে অনুসরণ করছেন। ১৯৩৩ সালে কয়েকজন ইসলামি লেখকের সাথে নজরুল কোরআনের আটত্রিশটি সুরা অনুবাদ করে ‘কাব্য আমপারা’ নামে প্রকাশও করেন। এই গ্রন্থটি মৌলবিদের উদ্দেশে নিবেদন করে নিজেকে তিনি ইসলামের খাদেম (খাদেমুল ইসলাম) বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া অসংখ্য কবিতায় ইসলামের প্রতি তাঁর অনুরাগ ও আবেগ প্রকাশ পেয়েছে। যেমন :
আল্লা পরম প্রিয়তম মোর আল্লা তো দূরে নয়।
নিত্য আমারে জড়াইয়া থাকে পরম সে প্রেমময়।
আল্লাহ সম্পর্কে এখানে প্রেম ও ভক্তিময় অনুভূতিতে নজরুল নম্র; এই প্রেমময় ভাবের পাশাপাশি কিছু ধর্মীয় কবিতায় তাঁর তেজোদ্দীপ্ত ভাবও প্রকাশ পেয়েছে। যেমন :
আমি আল্লার সৈনিক, মোর কোন বাধা-ভয় নাই।
তাঁহার তেজের তলোয়ারে সব বন্ধন কেটে যাই।
তুফান আমার জন্মের সাথী, আমি বিপ্লবী হাওয়া
‘জেহাদ’, ‘জেহাদ’, ‘বিপ্লব’, ‘বিদ্রোহ’, মোর গান গাওয়া!
বিপ্লব কিংবা বিদ্রোহের আওয়াজ এখন তরুণদের মধ্যে তেমন দেখা যায় না, তবে জেহাদি জোশের দেখা মিলছে যত্রতত্র। নজরুলের এই পঙিক্তগুলোকে তারা হয়তো তাদের মনমতো ‘জেহাদের’ সাথে একদিন চালিয়ে দেবে। যা-ই হোক, কবিতার মতো অসংখ্য গানেও ইসলাম ধর্মের প্রতি তাঁর গভীর আবেগের প্রকাশ ঘটেছে। এরকম অনেকগুলো গান এত জনপ্রিয় যে, নতুন করে সেগুলোর উদাহরণ দেওয়াও বাহুল্য মনে হতে পারে। বিশেষত ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’—ঈদের চাঁদ দেখার পর থেকে সমগ্র বাঙালি মুসলমান এই গানের অনন্য লহরীতে যেভাবে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে, তার তুলনা নেই। ঈদের আনন্দের যথার্থ প্রকাশের জন্য পৃথিবীর কোনো ভাষায় কি এমন অসাধারণ একটি গানও আছে? অথচ এই গানের রচয়িতা হয়েও নজরুল তাঁর লেখক জীবনের পুরোটাই গোঁড়া মোল্লাদের ফতোয়ার মুখে পড়েছিলেন।
বিদ্রোহী কবিতা প্রকাশের পর থেকে এই ফতোয়াবাজির সূচনা হয়। ১৯২২ সালে (১৩২৯ সনের কার্তিক সংখ্যা) ‘ইসলাম দর্শন’ পত্রিকায় মুন্সী মোহম্মদ রেয়াজউদ্দিন আহমদ নামক একজন ইসলামি লেখক নজরুল সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘লোকটা মুসলমান না শয়তান’। তিনি ফতোয়া দেন যে নজরুলকে আর মুসলমান বলে স্বীকার করা যায় না। ভারতবর্ষে যদি ইসলামি শাসন থাকত, তাহলে এই ‘নমরুদ’ ও ‘ফেরাউন’-এর গলা কেটে হত্যা করা হতো বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। ১৯২৫ সালে (১৩৩২ সনের ভাদ্র সংখ্যা) ‘মোসলেম দর্শন’ পত্রিকা নজরুলকে নিয়ে ‘ইসলাম-বৈরী মুসলমান কবি’ শিরোনাম দিয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে। ১৯২৮ সালে (১৩৩৪ সনের মাঘ সংখ্যা) ‘ইসলাম-দর্শন’ পত্রিকায় জনৈক শেখ হবিবর রহমান ‘কাজির কেরদানী’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে নজরুলকে আক্রমণ করেন। ১৯২৮ সালের ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় প্রকাশিত নজির আহমেদ চৌধুরি নামক একজন লেখক নজরুল সম্পর্কে লেখেন, ‘যে কবিতাগুলির মধ্যে দিয়া তাঁহার কবি প্রতিভা স্ফূরণ লাভ করিয়াছে বলিয়া বলা হয় সেখানে তাঁহার প্রধান কৃতিত্ব হইতেছে খোদাকে অস্বীকার করিয়া, অমান্য করিয়া, অপমান করিয়া।’ অগ্নিবীণা কাব্য সম্পর্কে এই লেখক লেখেন, ‘খোদা তাআলার প্রতি অতি জঘন্য ভাষায় বিদ্রোহ ঘোষণা করাই তাঁহার এই পুস্তকের বিশেষত্ব। কবি সেখানে নিজের বিদ্রোহ রূপের পরিচয় দিতে দিতে মোছলেম বাঙ্গলার সম্মুখে যে আদর্শ উপস্থিত করিয়াছেন কোন আজাজীলই আজ পর্যন্ত ততটা করিতে সাহসী হয় নাই। ... এছলামের প্রতি এক রতি মাসা পরিমাণ শ্রদ্ধা ভক্তি বিদ্যমান থাকিতে কোন মুসলমানই তাঁহাকে আপন বলিয়া গ্রহণ করা তো দূরে থাকুক অন্তর হইতে ধিক্কার না দিয়া পারে না। এছলামের চোখে এ অপরাধ অমার্জনীয়। সুতরাং বর্তমান যুগে তিনি যে এছলামের প্রধান শত্রু, তাহাতে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই।’ ইসলাম দর্শন পত্রিকার সম্পাদক মু. আবদুল হাকিমও (মৃ. ১৯৫৭) নজরুলের বিরুদ্ধে বেজায় ক্ষেপেছিলেন। তিনি তাঁর পত্রিকায় ‘বিদ্রোহ দমন’ নামে একটি কবিতা লিখে নজরুলকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন; এছাড়া একজন মুসলমান কবি হিসেবে নজরুলের কেমনভাবে সাহিত্য রচনা করা উচিত তারও সবক দেন। বিদ্রোহী কবিতার আরেকটি পাল্টা কবিতা লেখেন কবি গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭—১৯৬৪); নজরুলকে তিনি কেয়ামতের ময়দানের চরম শাস্তির কথা মনে করিয়ে দেন। নজরুলের বিরুদ্ধে ইসলাম বিরোধিতার অভিযোগ এনে যেসব লেখা প্রকাশিত হয়েছিল, এ তার কয়েকটি নজির মাত্র। মো. আজিজুর রহমান, বিএসসি নামক একজন লেখক নজরুলকে ব্লাসফেমির দায়ে অভিযুক্ত করেছিলেন। এমনকি মাওলানা আকরাম খাঁ, যিনি বর্তমান কালেও অনেকের কাছে একজন ইসলামি চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত, তিনিও ধারাবাহিকভাবে ইসলাম বিরোধিতার কারণ দেখিয়ে নজরুল ইসলামের তীব্র সমালোচনা করে গেছেন। সৈয়দ এমদাদ আলী (১৮৫৭-১৯৫৬) তো নজরুলকে মানসিক ভারসাম্যহীন এবং ইসলাম ধর্মকে বিপদাপন্ন করার দায়ে অভিযুক্ত করে ফেলেন। এভাবে বিশের দশকের অধিকাংশ সময় গোঁড়া মুসলমানরা এমনকি প্রতিষ্ঠিত মুসলিম কিছু লেখক নজরুলকে ইসলামবিরোধী বলে ধারাবাহিকভাবে গালিগালাজ করে গেছেন।
পত্র-পত্রিকার এসব সমালোচনার বাইরে গোঁড়া মোল্লা-মৌলভিদের দ্বারা নজরুল অনেকবার দৃষ্টিকটু আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছিলেন। ১৯২৮ সালে সিলেটে মুসলিম ছাত্রদের একটি প্রাদেশিক সম্মেলনে এ রকম একটি ঘটনা ঘটে। সম্মেলনের এক পর্যায়ে নজরুল ইসলাম গান শুরু করতে যাবেন, এমন সময় দর্শক সারিতে বসে থাকা একজন মৌলভি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন যে, ইসলামে গান গাওয়া জায়েজ কি না। উত্তরে নজরুল বলেন, ‘বসন্তে কোকিল গাছের ডালে বসে আপনার মনে গান গায়। সে কারো তোয়াক্কা করে না। কাক এসে তাকে তাড়া করলে সে উড়ে যায়। আমিও আমার মনের আনন্দেই গান করবো, যদি আপনারা কাকের মতো আমায় তাড়া করেন, তা হলে চলে যাবো।’ মৌলভির এই অপ্রত্যাশিত প্রশ্ন এবং কবির এই অভিনব উত্তরে সভায় তখন কিছুটা শোরগোল লেগে গেছে। সেই শোরগোল ছাপিয়ে হঠাত্ আরেকজন মৌলভি চেঁচিয়ে প্রশ্ন করেন যে, নজরুল নামাজ পড়ে কি না। এই প্রশ্ন আমাদের লালসালু উপন্যাসের কাঠমোল্লা মজিদের এই জাতীয় একটি প্রশ্নের কথা মনে করিয়ে দেয়। যা-ই হোক, নজরুল দৃঢ়ভাবে বলেন যে, নামাজ পড়া না পড়া তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার এবং এটা অন্য কারও দেখার বিষয় নয়। সভায় তখন তাঁর পাশে বসে ছিলেন এ কে ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২)। বলাবাহুল্য, সেদিন এবং তার পরের দিন নজরুল এই সম্মেলনে অনেকগুলো গান গেয়ে শোনান।
কুচবিহারের একটি মিলাদ মাহফিলে নজরুল এরও চেয়ে গুরুতর একটি আক্রমণের মুখে পড়েছিলেন। বিখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমদ (১৯০১-৫৯) ছিলেন এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। মাহফিলে নজরুলকে বক্তব্য দিতে আহ্বান জানানো হয়। তিনি বলেন যে, তিনি কথার মাধ্যমে তাঁর মনের ভাব ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারবেন না, তাঁর ভাব প্রকাশের যথার্থ মাধ্যম হলো গান। অনুমান করি, মিলাদের মতো একটি অনুষ্ঠানে তাঁর এই গান গাওয়ার আগ্রহ উপস্থিত মোল্লা-মৌলভিদের পছন্দ হয়নি। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে আসর-এর নামাজের সময় আসে। যথারীতি সকলেই সমবেতভাবে এই নামাজে অংশ নেন। ব্যতিক্রম ছিলেন শুধু নজরুল; তিনি এই নামাজে অংশগ্রহণ করেননি। অনেকেই এই ব্যাপারটা খেয়াল করেন এবং এই কারণে তাঁর ওপর রাগ জমতে থাকে। নামাজ শেষে আবার আলোচনা শুরু হলে এই রাগ উন্মাদনার রূপ নেয়। এ সময় নজরুল বক্তব্য দিচ্ছিলেন। তাঁর বক্তব্যে তিনি বলেন যে, এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তাঁর ধর্ম নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই; তাঁর ধর্ম হলো তারুণ্য। ব্রিটিশ শাসনের ওই সময়ে সকলের কী করা উচিত সে ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বলেন যে, এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় ধর্ম হলো দেশের জন্য কাজ করা। একটি পরাধীন দেশে তিনি কীভাবে নামাজ পড়বেন এই প্রশ্ন তুলে তিনি তাঁর নামাজ না পড়ার একটি ব্যাখ্যা দিতেও শুরু করেন। এর ফল হলো ভয়ঙ্কর। মাহফিলে উপস্থিত সমবেত ‘ধার্মিকরা’ প্রথমে নজরুলকে গালি দেওয়া শুরু করে; এরপর তারা নজরুলের দিকে তেড়ে আসে ঠেঙিয়ে শায়েস্তা করার জন্য। এই ধর্মরোষ থেকে বাঁচানোর জন্য কতিপয় তরুণ দ্রুত নজরুলকে ঘিরে ধরে তাঁকে অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে অন্যত্র নিয়ে যান। বস্তুত গোঁড়া মুসলমানরা বিরামহীনভাবে নজরুলের বিরোধিতা করে গেলেও প্রগতিশীল এবং আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ মুসলমান সমাজ নজরুলকে সবসময় সমর্থন দিয়ে গেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাচারণের ক্ষেত্রে নজরুল কখনোই তেমন সক্রিয় ছিলেন না। নামাজ-রোজসহ ধর্মের অন্যান্য অনুষঙ্গও তিনি তেমন অনুসরণ করতেন না। ফলে অতবড় লেখক হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে বারবার ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের রোষের মুখে পড়তে হয়েছিল। ওই একই সময়ে অর্থাত্ ত্রিশের দশকের আধুনিক কবিদের কয়েকজন ঘোষিত নাস্তিক ছিলেন, জন্মসূত্রে হিন্দু হলেও তারা হিন্দু ধর্মের কোনো আচার তেমন পালন করতেন না। তবু এঁরা কেউই ধর্মীয় কারণে গোঁড়া হিন্দুদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হননি। নজরুলের জন্য এ ছিল এক যাত্রায় ভিন্ন ফলের মতো। তথাপি ব্যক্তিগত জীবনযাপনে নজরুল এমন কিছু নজির স্থাপন করেছেন, ত্রিশের দশকের ‘মহত্ আধুনিকেরাও’ যা দেখাতে পারেননি। এর একটি উদাহরণ হলো প্রমীলা সেনগুপ্তের (১৯০৮-৬২) সাথে তাঁর বিবাহ। হিন্দু-মুসলিম বিবাহ ওই যুগে সামাজিকভাবে মোটেই সহজ ছিল না। এই ধরনের ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে হিন্দু পাত্র বা পাত্রীকে নিজ ধর্ম ত্যাগ করতে হতো। প্রমীলার ক্ষেত্রেও সে প্রশ্ন উঠেছিল, কিন্তু নজরুল দৃঢ়ভাবে এর বিরোধিতা করেছিলেন। বস্তুত তাঁর এই দৃঢ় অবস্থানের কারণে আজীবন প্রমীলা সেনগুপ্ত স্বধর্মে থাকতে পেরেছিলেন। উল্লেখ্য, নজরুল কেন প্রমীলা সেনগুপ্তকে মুসলমান বানালেন না, তা নিয়েও তখনকার কয়েকটি পত্রিকায় বেশ সমালোচনা হয়েছিল।
আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও আরেকটি উদাহরণ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। সেটি হলো নজরুলের সন্তানদের নামকরণ। নজরুল যথাক্রমে তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তানের নাম রেখেছিলেন কৃষ্ণ মোহাম্মদ (১৯২৪-২৪) ও অরিন্দম খালেদ (১৯২৬-১৯৩০)। এই দুটি সন্তান অবশ্য শিশু বয়সেই মারা যায়। পরবর্তীতে তাঁর যে দুটি সন্তান বেঁচে ছিল তাদের একজনের নাম কাজী অনিরুদ্ধ ইসলাম (১৯২৯-৭৪) এবং অপরজন কাজী সব্যসাচী ইসলাম (১৯৩১-৭৯)। নজরুলের সন্তানদের নাম তিনি নিজেই রাখতেন এবং যেসব পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের নামের সাথে মিলিয়ে তিনি ছেলেদের নাম ঠিক করতেন, তা থেকে কোন ধরনের ব্যক্তিদের প্রতি নজরুলের অনুরাগ ছিল তা বোঝা যায়। যেমন, প্রথম ছেলের নামের কৃষ্ণ হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান অবতার, আর মো?হাম্মদ ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক। দ্বিতীয় ছেলের নামের অরিন্দম শব্দের অর্থ শত্রুদমনকারী। রামায়ণে রাবণপুত্র মেঘনাদকে অরিন্দম বলা হয়েছে। মাইকেল মধুসূদন দত্তও (১৮২৪-১৮৭৩) মেঘনাদবধ মহাকাব্যে ‘অরিন্দম ইন্দ্রজিত্’ (মেঘনাদের আরেকটি নাম ইন্দ্রজিত্) শব্দদ্বয় ব্যবহার করেছেন। আর খালেদ হলো ইসলামের ইতিহাসের বিখ্যাত বীর খালেদ বিন ওয়ালিদ; খলিফা আবু বকরের সেনাপতি হিসেবে তিনি কিংবদন্তি বীরের মর্যাদা পেয়েছেন। একইভাবে অনিরুদ্ধ হলো শ্রীকৃষ্ণের পৌত্রের নাম এবং সব্যসাচী হলো মহাভারতের অর্জুন। কাজী অনিরুদ্ধর ডাক নাম ছিল লেনিন এবং সব্যসাচীর সান ইয়াত্-সেন/সানি। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন (১৮৭০-১৯২৪) রাশিয়ায় কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রাণপুরুষ এবং সান ইয়াত্-সেন (১৮৬৬-১৯২৫) ছিলেন চীনা জিংহাই বিপ্লবের (১৯১১) প্রধান নেতা, যিনি তখন চীনের জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃত। লক্ষ করলে দেখা যাবে, নজরুল তাঁর সন্তানদের নামের মধ্যে সচেতনভাবে হিন্দু ও মুসলিম ঐতিহ্য এবং তত্কালীন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বিপ্লবীদের নামের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন।
বস্তুত এই হিন্দু-মুসলিমের মিলনই তিনি আজীবন চেয়েছেন। এজন্য নিজে হিন্দু-মুসলমানের মিলনের জন্য অনেক কবিতা ও প্রবন্ধ লিখেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন গীতিকার হিসেবে একই হাতে তিনি ইসলামি গজল যেমন লিখেছেন, তেমনি শ্যামা সংগীত ও শ্রীকৃষ্ণের ভজনও লিখেছেন। আর আগের আলোচনা থেকে আমরা দেখেছি যে, শুধু হিন্দু ও মুসলমানের ঐতিহ্য এবং উপাসনা সম্পর্কিত কবিতা ও গান লিখেই তিনি দায়িত্ব শেষ করে বসে থাকেননি; বরং নিজেই একাধারে দুই ধর্মের উপাসনা পদ্ধতি চর্চা করেছেন। এই ধরনের উপাসনা চর্চা ভারতবর্ষের আর কোনো পুরোধা লেখকের মধ্যে দেখা যায়নি। আমরা জানি, হিন্দু ও মুসলমানের ধর্মীয় ক্ষেত্রে অনেক অবতার বা পয়গম্বর রয়েছে; কিন্তু নজরুল ছিলেন যেন এই দুই সমপ্রদায়ের এক নতুন ধাঁচের কবি-অবতার—যিনি বাণী দিয়েই মাত্র ক্ষান্ত হননি, নিজে জীবনে তা করে দেখিয়েছেন। এই কবি-অবতারের ধর্মটিও ছিল তাঁর মতো অনন্য। কোনো বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের নামে একে চিহ্নিত করা চলে না। গোলাম মুরশিদ নজরুলের এই ধর্মীয় বিশ্বাসের অভিনব একটি নাম দিয়েছেন : ‘দ্বীন-এ-নজরুল।’ বস্তুত ব্যক্তিজীবনে নজরুল যে ধরনের প্রথাবিরোধী ধর্মচর্চায় অভ্যস্ত ছিলেন, পৃথিবীর কোনো ভাষার কোনো প্রধান লেখকের মধ্যে তা দেখা যায় না।
নজরুল রাজনীতি-সচেতন ছিলেন, কিন্তু ধর্মের রাজনীতিকরণ এবং ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের মধ্যযুগীয় উন্মাদনায় সামিল হননি। তাঁর রাজনৈতিক চেতনার পুরোটাই জুড়ে ছিল মৌলবাদ বিরোধিতা; অসামপ্রদায়িক সেক্যুলার ও সাম্যবাদী রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর ছিল আজীবন পক্ষপাত। এজন্য তুরস্কের রক্ষণশীল সমাজ ভেঙে যখন মোস্তফা কামাল পাশা (১৮৮১-১৯৩৮) আধুনিক সেক্যুলার তুরস্কের স্বপ্ন দেখেন, তখন নজরুল তাঁকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত হন। ধর্মকে নজরুল করে তুলেছিলেন একান্তই ব্যক্তিগত অনুভব ও চর্চার ব্যাপার। তিনি যেমন একহাতে হিন্দুয়ানি ও মুসলমানি গান সফলভাবে লিখতে পেরেছিলেন, ধারণা করা যায়, বাংলায় তখন যদি খ্রিষ্টান কিংবা বৌদ্ধ ধর্মীয় ধারা শক্তিশালী থাকত, নজরুল হয়তো ওইসব ধর্মেরও উত্কৃষ্ট ভক্তিগীতি রচনা করতেন। কারণ মানবতা, প্রেম, অসামপ্রদায়িকতা, সাম্য প্রভৃতি ছিল তাঁর মূল চেতনা।
একুশ শতকের এই অগ্রসর পৃথিবীতে বাস করেও আমরা কি চেতনার দিক দিয়ে নজরুলের সমকক্ষ হতে পেরেছি? নাকি নিজেদের সংকীর্ণ ও সামপ্রদায়িক ধর্মবোধ নজরুলের ওপর আরোপ করে তাঁকে ‘নিজেদের লোক’ ভেবে অশ্লীল আনন্দ পাচ্ছি?
তথ্যসূত্র :গোলাম মুরশিদ। ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য : নজরুল মানস সন্ধানে’। মো. মাহবুবর রহমান (সম্পা.)। প্রীতিকুমার মিত্র স্মারকগ্রন্থ। রাজশাহী : ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ, ২০০৯।
মুস্তাফা নূরউল ইসলাম (সম্পা.)। সমকালে নজরুল ইসলাম, ১৯২০ ১৯৫০। ঢাকা : বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ১৯৮৩।
রফিকুল ইসলাম। কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সৃষ্টি। দ্বিতীয় সং.। কলকাতা : কে পি বাগচী অ্যান্ড কোম্পানী, ১৯৯৭।
রাজনারায়ণ বোস। আত্মস্মৃতি। ৪র্থ সং.। কলকাতা : ওরিয়েন্ট বুক কোং, ১৯৬১।
Priti K Mitra. The Dissent of Nazrul Islam : Poetry and History. New Delhi: Oxford University Press, 2007.
